আচ্ছা ভাবী, আমার মাথার কিরে–দাদার কোনো খবর পাওনি? তবে চুপচাপ বসে আছ?
আর খবরের কোনো দরকার নেই।
ক্ষুব্ধ কণ্ঠে দরিয়াবিবি জবাব দিতেছিল।
শৈরমী চুপ করিয়া গেল। আঁচলে আধখানা সুপুরি বাঁধিয়া উঠিয়া পড়িল।
জাওলা পাঁকাল মাছ পেলে নিয়ে এসো, শৈরমী দিদি, ছেলেটার পেট গরম রেখেছে।
শৈরমী এইবার হাসিয়া উঠিল।
আমাকে পাগলী ঠাওরালে, ভাবী!
দরিয়াবিবি লজ্জায় মুখ নিচু করে। ঘড়া প্রসঙ্গে তার মর্যাদা কোথায় যেন আহত হইয়াছে।
না। তবে এমনি বলে রাখা ভালো।
শৈরমী আড়াল হইলে দরিয়াবিবি ঝরঝর কাঁদিয়া ফেলিল। চোখের পানি স্বতই রোধ মানে না। প্রাঙ্গণের দিকে দৃষ্টিপাত করিয়া আবার তাড়াতাড়ি চোখ মুছিয়া ফেলিল দরিয়াবিবি। আসেকজান পাড়ায় বাহির হইয়া গিয়াছে। কথাবলার কোনো লোক আর নাই। দরিয়াবিবি শাক বাছিতে লাগিল।
আমজাদের ডাক কানে না গেলে হয়তো দরিয়াবিবি সারাদিন শাক লইয়া বসিয়া থাকিত। আনমনা ঘোর তার কাটিয়া যায়।
মা, এই দ্যাখো, আব্বা চিঠি আর কুড়ি টাকা পাঠিয়েছে।
আনন্দে যেন নৃত্য করিতে পাইলে আমজাদ সন্তুষ্ট হইত। বগলে মতবের দপ্তর, একহাতে টাকা আর মনিঅর্ডারের কুপনের অংশ। দশদিন মাত্র আমজাদ চন্দ্র কোটালের সহযোগীরূপে কাজ করিয়াছিল। দরিয়াবিবির আদেশেই আমজাদ এখন মvতবের পড়ুয়া।
দরিয়াবিবির দুই চোখ বিস্ময়ে ভরিয়া যায়।
সত্যি টাকা পাঠিয়েছে, কে দিল তোকে টাকা?
পিয়ন এসেছিল। আমার নামে আব্ব টাকা পাঠিয়েছে। আমার টিপসই নিল পিয়ন।
দরিয়াবিবি উঠিয়া দাঁড়াইয়াছিল। নোট দুটি পুত্রের হাত হইতে লইয়া সে নাড়াচাড়া করে।
ঠিকানা দিয়েছে?
হ্যাঁ গো মা, এই তো লেখা রয়েছে।
আমজাদ জননীকে কুপনের অংশ দেখাইল, যেন মার অক্ষরজ্ঞান কত গভীর। দরিয়াবিবি কুপন হাতে লইয়া চক্ষুর দৃষ্টি সহজ করিল। অক্ষর-পরিচয়ের মূল্য তার নিকট এই প্রথম কঠিন সত্যরূপে ধরা দিল।
নঈমা কখন চুপিসারে দুইজনের কথাবার্তা শুনিতেছিল, সে ফুট কাটিল, মা, টাকা দিয়েছে, চিঠি দিয়েছে।
দরিয়াবিবি নঈমাকে কোলে তুলিয়া চুম্বন করিতে লাগিল।
হ্যাঁ। তোমাকে ময়রার দোকান থেকে মিঠাই কিনে দেব।
আমজাদ মুরুব্বির মতো মন্তব্য করিল : এই তো কমাস পরে মোটে কুড়িটা টাকা। তার চেয়ে গায়ে থেকে জন খাটলে লাভ। জানো মা, আমাদের জমি ছাড়িয়ে নিতে পারে। আব্বা এসে চাষ না দিলে লোকে জমি রাখে?
পুত্রের সংসার-অভিজ্ঞ সিদ্ধান্ত দরিয়াবিবির কাছে ভালো লাগে না, যদিও সে মায়ের কথার প্রতিধ্বনি করিতেছিল।
তুমি আর অত ফফর-দালালি করো না। যা করার আমি দেখে নেব।
আমার মাইনে দু-মাসের বাকি আছে। গম্ভীর হইয়া আমজাদ জবাব দিল।
নূতন নোটের গন্ধ শুকিতে লাগিল দরিয়াবিবি। বাইরে দুপুরের সূর্য টলমল করিতেছিল। বাস্তুর নিচে তেঁতুলের বন অলস সমীরে উল্লসিত।
নোট আঁচলে বাধিয়া দুটি খুচরা পয়সা দরিয়াবিবি আমজাদের হাতে দিয়া বলিল, দোকান থেকে দুজনে বিস্কুট কিনে খা।
নঈমা মার কোল হইতে নামিয়া পড়িল।
আসেকজান পাড়া হইতে ফিরিয়া আসিল। চৌধুরীপাড়ার কার যেন ফাতেহা ছিল আজ। আসেকজান খালিহাতে ফিরিয়া আসে নাই, তার আঁচলের নিচে অবস্থিত পুঁটুলি দেখিয়া তা বোঝা যায়।
বৌমা, তোমাদের রান্নার আগেই এসেছি। ছেলেরা আমার সঙ্গে খাবে। অনেক গোস্ত আর ভাত আছে।
না, আমাদের রান্না হবে এখনি।
খামাখা চাল নষ্ট করবে, মা।
নঈমা তখন চিৎকার করে বুড়ির আঁচল ধরিয়া।
ও দাদি, বাবাজি টাকা পাঠিয়েছে।
বৃদ্ধার চোখ আনন্দে সজল হইয়া ওঠে।
সত্যি বৌমা, খবর পাওয়া গেছে ছেলের?
হ্যাঁ, খালা। টাকাও দিয়েছে।
আমজাদ বৃদ্ধাকে আশ্বাস দিয়া বলিল, ঠিকানা পাওয়া গেছে। আমি একদিন যাব বাপজির কাছে।
দরিয়াবিবি কথা-কাটাকাটি পছন্দ করে না, আসেকজান আনন্দবিহ্বলতায় বিস্মৃত হইয়াছিল।
বৌমা, ছেলেরা আমার সঙ্গে খাবে দুপুরে।
না। দোকানে যা আমজাদ। নঈমা, তুইও সঙ্গে যা।
বৃদ্ধা ক্ষুণ্ণমনে নিজের ঝুপড়ির দিকে অগ্রসর হইল। মনে মনে রাগিয়াছিল। আজ টাকার লোক, সাকার, খাবারে এত ঘৃণা, ইশ। বৌমার রোখৃ সে জানে। সহজেই নীরব হইয়া গেল বৃদ্ধা।
দরিয়াবিবি আসেকজানের গমনপথের দিকে চাহিয়া বারবার ভ্রকুটি নিক্ষেপ করিল।
.
কয়েক মাস পূর্বে নঈমার একটি ফালি কাপড় হারাইয়া গিয়াছিল। দরিয়াবিবি বেদম প্রহার করিয়াছিল সেদিন নঈমাকে।
সেদিন সন্ধ্যায় আবার সে একটি কাপড় হারাইয়া বাড়ি ফিরিল। দরিয়াবিবি আজ কিছুই উচ্চবাচ্য করিল না। একে সংসারে হাজার রকমের টানাটানি, তার উপর এইসব ঝামেলা পোহাইতে দরিয়াবিবি হিমসিম খাইয়া যায়। মাঝে মাঝে অগত্যা ললাটলিপির উপর সমস্ত ক্রোধ খারিজ করিতে হয়।
সাকেরের মার অনুরোধে পরদিন বিকালবেলা দরিয়াবিবি অবসরের ফাঁকে পাড়া বেড়াইতে গিয়াছিল। সাকের কয়েকদিন হইতে বাড়িতেই আছে। রোহিনী চৌধুরী বোধহয় প্রজা ঢিট করিয়া ক্ষান্ত হইয়াছেন।
পাড়ার প্রবেশপথেই তার সঙ্গে দরিয়াবিবির সাক্ষাৎ হইল।
এই যে ভাবী সাহেব, হঠাৎ।
সাকের গোঁয়ার ও চোয়াড় বলিয়া খ্যাত। দরিয়াবিবির সঙ্গে তার ব্যবহার ভারি মধুর। চোখাচোখি দরিয়াবিবির দিকে চাহিয়া সে কথা বলে না পর্যন্ত। কণ্ঠস্বর তার সম্মুখে নরম হইয়া আসে। অথচ বিনয় সাকেরের স্বভাববিরুদ্ধ বিশ্লেষণ।
