খাও। খেয়ে ফেলো ব্যাটা।
তোমার দোকান চলবে কী করে?
এতটুকু ছেলে, সংসারের মারপ্যাঁচ এত বোঝে। অবাক হইয়া যায় আজহার খাঁ।
হাসিমুখে মিষ্টি খায় খলিল।
তুমি একটু বসো, আমি মাগরেবের নামাজ পড়ে আসি।
খলিল হঠাৎ কর্তা বনিয়া যায়। গম্ভীরমুখে সে বসিয়া থাকে। খরিদ্দারের সঙ্গে। আলাপ করে। খুব হাসি পায় তার। এমন একটা দোকান যদি দিতে পারত সে।
আজহার ফিরিয়া আসিলে সে সড়কের পথ ধরিল।
ছোট ডিপা জ্বলে দোকানের এককোণে। দেখা যায় খলিল পথ হাঁটিতেছে। পার্শ্ববর্তী গাছপালার ছায়ায় ঢাকা সড়ক।
এতটুকু ছেলে।
আমজাদ কি অভিমান করিয়া মহেশডাঙায় ফিরিয়া যাইতেছে?
.
১০.
শৈরমী পাড়ায় কলমিশাক বিক্রয় করিয়া দরিয়াবৌর সঙ্গে গল্প জুড়িয়াছিল। গণেশের শরীর ভালো নয়। কয়েকদিন পূর্বে দাওয়া হইতে পড়িয়া গিয়াছিল। পঙ্গু বামহাত একদম অচল হইয়া গিয়াছে। শৈরমীর সামান্য অবসর পর্যন্ত নাই।
দরিয়াবিবি দরদের সঙ্গেই এই বিধবার করুণ প্রাত্যহিকতার কাহিনী শুনিতেছিল। আজকাল বারবার তারও মনে দোলা লাগে, এই জীবনের পরিণতি কোথায় পৌঁছিবে, কে জানে। আমজাদ ও নঈমার মুখের দিকে চাহিয়া দরিয়াবৌর মুখ শুকাইয়া যায়। আজহার খাঁ কোনো খবর দেয় না, কয়েক মাস হইয়া গেল।
সাকেরের মা আসিয়া জুটিল এই সময়। দরিয়াবৌ একটি পিঁড়া আগাইয়া দিল।
বৌ যে আমাদের দিকে পা বাড়াও না, মা।
দরিয়াবিবি এক সপ্তাহ সাকেরের বাড়ি যায় নাই। লজ্জিত হয় সে।
কত কাজ, দেখছেন না, মা। ফুরসৎ নেই, মা।
বৌ নিয়ে হাঁড়-মাংস পুড়ে ছাই হতে বসেছে।
শৈরমী এই প্রসঙ্গে যোগদান করিল : কী হয়েছে?
দিন মাস পার হয়ে গেল, এখনও খালাস হওয়ার নাম নাই। কবরেজ ডাকব, বৌর তাতেও দশ অছিলা।
দরিয়াবৌ সন্দেহ প্রকাশ করে : দশ মাস হয়ে গেছে! না মা, তোমাদের হিসেবে ভুল আছে।
সাকেরের মা জোর দিয়া বলিল : না, দশমাসের বেশি হবে তো কম নয়।
শৈরমী জবাব দিল : ভাবী, অনেকের এগারো মাস লেগে যায়।
দরিয়াবিবি মুখে আঁচল চাপা দিয়া হাসিতে লাগিল।
এগার মাস কেন, আঠার মা লাগে।
সাকেরের মার মুখ কালো হইয়া যায়।–কি হাসছো বৌ, আমার পেটে ভাত সেঁধোয় না। ছেলেটা দিনদিন বিগড়ে যাচ্ছে। দাঙ্গা করতে কোথায় চলে যায়। ছেলের মুখ দেখলে হয়ত ঠাণ্ডা হোত।
ও ব্যাটাছেলেদের দস্তুর। তোমার ভাসুরপোর কোনো খোঁজ নেই। একদিন ঝুপ করে এসে পড়বে। কী আর উপায় আছে, বলো।
শৈরমী ভরসা দিল : ঘাবড়ে যেও না, সাকেরের মা। ভগবান সুফল দিয়েছে নিশ্চয়।
তোমার মুখে সুবন (সুবর্ণ) বষুক, শৈরমী। আমার ঘুম হয় না চিন্তায়।
দরিয়াবিবি শৈরমীর দেওয়া কলমিশাক বাছিতে বাছিতে কথা বলিয়া যায়।
হাসুবৌকে বিকেলে দেখে আসব।
এসো একবার!
আবার সাকেরের মা বলিল : বৌটার মনের হদিশ পাওয়া মুশকিল। ছেলে-ছেলে করে গেল। আজকাল আর আমাকে ছাড়া কোথাও শোয় না। ছেলেটা এইজন্যেই বুঝি আরো বিগড়েছে। আমিও ভাবি অয়লা-পয়লা বার এবার। পাছে কোনো কষ্ট না হয়। বৌটা গোসল পর্যন্ত করে না, পাছে জ্বর হয়।
হাসুবৌর উদরস্ফীতির আয়তন সম্পর্কে দরিয়াবিবি প্রশ্ন উত্থাপন করিল।
দশ-মেসে পোয়াতির মতো, বৌমা। সদাই হাইফাই করছে। হাসুবৌ বলে, তার পেটে খুব ব্যথা। তাই হাত পর্যন্ত দিতে দেয় না। একবার দাইকে ডেকে পাঠালাম। পেটে আঙুল পর্যন্ত ছোঁয়াতে দিলে না।
সুফল দিয়েছে, চাচি। তুমি দেখো। হয়-নয় শৈরমী বাদিনী বলেছিল। গণেশের মা মন্তব্য করে। বৃদ্ধা বিশেষ আশ্বস্ত হয় না। বরং দরিয়াবিবি যেন একবার পাড়া-ভ্রমণে বাহির হয়, তার অনুরোধ জানাইল সে।
আজ হাতে অনেক কাজ আছে, মা। কাল বিকেলে ঠিক গিয়ে তোমার বৌর রোগ ধরে আসব।
শৈরমী আফসোস করিতে লাগিল : কলিকাল, দরিয়াভাবী মানুষের খারাবির শেষ নেই।
দরিয়াবিবি মুখ নিচু করিয়া শাক বাছিতে লাগিল। সে নিজের চিন্তায় মশগুল ছিল।
সাকের ভাই এলে একবার পাঠিয়ে দিয়ে। তার ভাইয়ের খোঁজখবর নিয়ে দেখুক। মনে করি চুপচাপ বসে থাকব। আর ওসব নিয়ে মাথা ঘামাব না।
এমনও লোক হয় সংসারে! ছেলেপুলের মায়া পর্যন্ত নেই।
শৈরমী তোপড়া গালে হাত রাখিয়া দরিয়াবিবির দিকে চাহিয়া রহিল। এই সহানুভূতি ভালো লাগে না দরিয়াবিবির। মেজাজ তার রুক্ষ হইয়া উঠিতেছে হঠাৎ।
একবার এসো, বৌমা।
সাকেরের মা চলিয়া গেল। শৈরমী এইবার ফিসফিস কণ্ঠে বলে : ভাবী, আধখান পচা সুপুরি দেবে, আজকাল গা মাটি-মাটি লাগে, ভাত খেয়ে কিছু মুখে দিতে পাইনে।
দরিয়াবিবি ঘরের ভিতর হইতে শুধু সুপুরি নয়, তেলের বোতলও বাহির করিয়া আনিল।
শৈরমী দিদি, মাথায় একটু তেল দিয়ে যাও।
শৈরমী তার রেখাঙ্কিত করতালু প্রসারিত করিল।
মাথায় তেল ঘষিতে ঘষিতে সে বলিয়া যায় : ভাবী, এই পাড়ায় এলে একটু মন ঠাণ্ডা হয়। কোঠা-বাড়িওয়ালা বামুনদের ওখানে গিয়ে দূর-ছি ছাড়া অন্য কথা শুনিনে। কপাল ধরিয়ে এসেছিলাম ভগবানের কাছে। ছেলেটার সুদ্ধ ভগবান হাত-পা ভেঙে ফেলে রাখলে।
দরিয়াবিবি জবাব দিল : সব জেতে (জাতিতে) ঐ এক ব্যাপার। রহিম বখশ জমিদার বলে সেবার তোমার দাদাকে কত অপমান করে গেল শুনেছিলে তো? গরিব হিদু আর মুসলমান নিজের জেতের কাছেই হোক আর অপরের জেতের কাছেই হোক, একই রকম মান-মজ্জিদে পায়।
