ধান কুটে ভাত জোটাতে হয়।
কথা সমাপ্ত করিয়া বড় লজ্জিত হয় খলিল। কুটুনীর ছেলে সে, এমন পরিচয় দিতে মাথা কাটা যায়। আবেগের স্রোতে ভাসিয়া গিয়াছিল খলিল।
আজহার আর কোনো জিজ্ঞাসাবাদে মত্ত হয় না। নিঝুম সেও বসিয়া থাকে। এতটুকু ছেলে মার দুঃখের সঙ্গী। তিন-চার বছর পরে আমজাদ কোথায় গিয়া দাঁড়াইবে কে জানে?
মাত্র এক পলকের জন্য আমজাদের মুখ মনে পড়িল আজহারের। চন্দ্র কোটাল তাকে স্বপ্ন দেখিতে শিখাইয়াছে। তার কুয়াশা-আবর্তিত ফেনিল পটে কারো মুখ আর স্থিতি পায় না। স্টেশনের নিকট বর্ধিষ্ণু এই গ্রামে ব্যবসা-পত্তনের অশেষ সুযোগ রহিয়াছে। খোদা কি মুখ তুলিয়া চাইবেন না একটিবার?
অজানিত ভীতির ফুকার আজহারের চিত্ত আরো অস্থির-উন্মত্ত করিয়া তোলে। তিনবার বুকে কুলহু আল্লা পড়িয়া ফুঁক দিল সে।
খলিলের ঘন ঘন হাই উঠিতে ছিল, আজহারের খেয়াল হয়। তার দিকে ফিরিয়া সে বলে : চাচা, আবার সকালে কাজে বেরোতে হবে। ঘুমিয়ে পড়ো।
তুমি ঘুমোবে না, চাচা?
অবোধ কণ্ঠের নিনাদ বড় লাগিল আজহারের কানে।
না, চাচা। আর এক ছিলিম খেয়ে শোব।
খলিল বাসার ভেতর প্রবেশ করিল। আজহার নূতন ছিলিম সাজে।
ঠাণ্ডা বাতাস বহিতে থাকে শেষরাত্রে। খণ্ড মেঘ ছড়াইয়া পড়ে গ্রাম-বনানীর উপর।
আকাশের মুখ কালো হইয়া গেল এক নিমিষে।
.
আজহার খাঁর সিদ্ধান্ত স্থির ছিল।
সপ্তা দুই পরে এই বাসার নিকটে বাসস্ট্যান্ডের নিকট সে তিন টাকা দিয়া একটি ছোট চালাঘর ভাড়া লইল। ঘরের বারান্দা দুইহাত মাত্র প্রস্থে। তারই একপাশে সঙ্গী ছুতারের সাহায্যে সে একটি শেল্ফ তৈয়ারি করিল। দোকানের ঘটা ছিল বেশি। অবশ্য মাল খুব পর্যাপ্ত নয়। আজহার কোনোরকমে গোটা পঁচিশেক টাকা জমাইয়াছিল। তিন টাকা লইল মিস্ত্রি। বাকি বাইশ টাকায় সঁচ-সুতো, মেয়েদের টিপ, স্কুলের ছেলেদের পেনসিল, লজেন্স– এই জাতীয় ছোটখাটো মনিহারী পণ্যসম্ভারে সে দোকান সাজাইল।
পানের দোকান সঙ্গে রাখিবারও ইচ্ছা ছিল আজহার খাঁর। আরো কয়েকটি পানওয়ালা পূর্বেই আসর জমাইয়া রাখিয়াছে। তবু লোভ আছে খার। ভবিষ্যতে যদি নসিবে জৌলুশ লাগে, আরো নতুন পণ্যের দোকানঘর চমকাইয়া দিবে সে।
কয়েকদিন ভয়ানক মেহনতে কাটিয়া গেল। স্টেশন হইতে চার মাইল দূরে গঞ্জের উপর গোলদারী দোকান। একজন মাড়োয়ারী খুব বড় ব্যবসা ফাদিয়াছে। তার নিকটে এইসব জিনিস পাওয়া যায়। চার-পাঁচ মাইল হাঁটার কসরৎ বাড়ে। সঙ্গী মিস্ত্রির ধরনা দিতে হয়। শত অনুরোধে সে রাত্রি-রাত্রি পরিশ্রম করিয়া শেলফ তৈয়ারি করিয়া দিয়াছে।
গহর মিস্ত্রি ব্যাপারটা সোজাভাবে গ্রহণ করিল না। আজহার চলিয়া যাইতেছে, বাসা ভাড়া বেশি লাগে। সে নিরুৎসাহ করিবার বাগ্অস্ত্র নিক্ষেপ করিল শত শত। একটু হিংসাও হইতেছিল বৈকি তার। গহর জানে না, পঁচিশটি টাকা জমাইতে আজহার কত নিপীড়ন সহ্য করিয়াছে। বাউণ্ডেলের মতো সংসারের কোনো খোঁজ নাই। তার উপর কায়িক জুলুম। এত সহ্যের ক্ষমতা কয়জনারই বা আছে?
গহর বলিল, মিস্ত্রি তাহলে শেষে এইখানে দোকান ফাঁদলে। দেখো, যদি পাকা বাড়ি ওঠে।
আজহার নিরীহ বেচারা। কোনো জবাব দিল না। কিন্তু কথাটা সোজাসুজি তার মর্মে বিধিতে থাকে।
কিছু করে-কষ্মে খেতে হবে তো ভাই। তাই মন গেল, একটা দোকান করলাম।
গহরের রঙ ফরসা দীর্ঘতায় তালগাছ। কিন্তু ভয়ানক পাতলা শরীর। অবশ্য বাঁধন মজবুত। দাঁতগুলি খুব পরিষ্কার। সে পান খায় না।
না, তাতে আর কী। আচ্ছা, একটা বিড়ি দাও।
আজহার সহজে রাগে না। কিন্তু গহরের কথার ঝাল সে-ও আজ অনুভব করিল।
বিড়ি নেই, ফুরিয়ে গেছে।
মিথ্যা কথা বলিতে বাধে না আজহারের।
উঠিয়া পড়িল গহর।
চালাও দোকান, যদি পাকা বাড়ি ওঠে। একসঙ্গে কাজ করেছি বলে একদিন এসে থাকা যাবে।
গহরের পদক্ষেপের দিকে চোখ ফেলিয়া স্তব্ধ হইয়া যায় আজহার। মনে মনে বলিল, আমার মতো হাভাতে গরিবকেও হিংসা করার লোক আছে পৃথিবীতে।
লজেঞ্চুসের বোতলের পাশে পিঁপড়া উঠিতেছিল, আজহার সেদিকে মনোনিবেশ করিল।
একটু পরে আসিল খলিল। ভারি উৎফুল্ল সে।
চাচা, আপনার দোকাটা বেশ সুন্দর হয়েছে। যখন তোক রাখবে, আমাকে মনে করো।
আজহার স্তিমিত হাসি হাসে।
দোয়া করো, বাবা। আল্লার দোয়া লাগতে কতক্ষণ।
অনেক সামগ্রী খলিল কোনোদিন গাঁয়ে দেখে নাই। সে বিস্মিত-চোখে চারদিকে তাকায়।
চাচা, একা লোক আমি। গোসল করতে গেলে দোকান বন্ধ করতে হয়। তুমি মাঝে মাঝে এসে বসো।
হ্যাঁ, বসব চাচা। বাড়ি থেকে ঘুরে আসি। ওদু চাচা এবার নিয়ে যাবে বলেছে।
বেশ, বেশ।
দাওয়ার একপাশে খলিল উপবেশন করিল।
পাশাপাশি সাজানো শিশি-বোতলের দিকে সে সাগ্রহে দৃষ্টিপাত করিতে থাকে।
আনমনা লজেঞ্চুসের বোতল হাতে তুলিয়া খলিল নাড়াচাড়া করে।
এতে কী আছে, চাচা?
লজেঞ্চুস।
খেতে কেমন লাগে?
খুব মিষ্টি। একটার দাম দুপয়সা।
আজহারের কথা শেষ হওয়ামাত্র খলিল বোতল শেফের কোণে রাখিয়া দিল। তার হাতে শতরাজ্যের আড়ষ্টতা।
আজহার তার মুখের দিকে কিছুক্ষণ চাহিয়া রহিল। দোকানদার সে। দোকান খুলিয়াছে। একটু ইতস্তত করিয়া সে বলে : একটা খাও না, চাচা।
লজ্জিত খলিল জবাব দিল : না।
আজহার আর বিলম্ব করে না। নিজেই দুটি মিষ্টান্ন বাহির করিয়া খলিলের হাতে দিল। আড়ষ্টতা কাটে না খলিলের : না চাচা, আমি মিষ্টি খাই না। আমার কাছে পয়সা নেই।
