আজহার মৃদুকণ্ঠে ডাকে : কে?
আমি, চাচা।
একটি বালকের কণ্ঠস্বর অন্ধকারে ঢেউ তোলে।
খলিল, এত রাত্রে বাইরে এসেছ?
জিজ্ঞাসা করে আজহার।
ঘুম ধরে না, চাচা।
ফোঁপানির শব্দ আসে আজহার খাঁর কানে।
খোয়ারি ভাঙিয়া যায় তার। কার কণ্ঠনালী-দুমড়ানো এই শব্দ, প্রথমে আজহার স্থির করিতে পারে না।
নিবিড় অন্ধকার। চৌকাঠের অপরদিকে আজহার হাত বাড়াইয়া দিল। খলিলের নাগাল পায় সে। হাঁটুর ভেতর মাথা খুঁজিয়া সে বসিয়া আছে। এতক্ষণ এই অবস্থায় সে ধীরে ধীরে জবাব দিতে ছিল তবে।
আজহারের সঙ্গী মিস্ত্রির নাম ছিল ওদু। তারই ভাইপো খলিল। বয়স বারো হইবে কিনা সন্দেহ। বালক-বয়সেই চাচার সঙ্গে মিস্ত্রির কাজ শেখার জন্য এই প্রবাস-জীবনের গ্লানি বহন করিতেছে।
আজহার খলিলের নিকটে সরিয়া আসিল। তার গায়ে ঈষৎ নাড়া দিয়া সরস কণ্ঠে আজহার সম্বোধন করে : কী হয়েছে, চাচা? .
খলিল মাথা তুলিতে চায় না। হাঁটুর ভেতর মাথা খুঁজিয়া যেন বিশ্বের সমস্ত কলঙ্কের নিকট হইতে পরিত্রাণ চায় সে।
কিছু হয়নি তো, চাচা?
আবার আজহার নাড়া দিয়া বলিল : মাথা তুলে কথা বলো না, কী হয়েছে?
খুব মৃদুস্বরেই আলাপ বিনিময় চলিতেছে। ঘরের ভেতর সকলে দিনমজুর। কারো ঘুমের ব্যাঘাত না ঘটে।
খলিল নীরব।
আজহারের কৌতূহল মিটিল না। সে পুনরায় জিজ্ঞাসাবাদ আরম্ভ করিল।
খলিল এইবার কোনো জবাব দিল না। আদুল গায়েই সে বসিয়াছিল। আজহারের হাত নিজের পিঠের উপর ধীরে রাখিয়া আবার খলিল ফোঁপাইতে লাগিল।
আজহার আঙুলের ডগায় যেন বিছা দংশন করিয়াছে। সে তড়িৎগতি খলিলের পিঠ হইতে হাত তুলিয়া লইয়া সচিৎকার জিজ্ঞাসা করে : তোমার পিঠে এত দাগ?
খলিল আজহারের মুখে হাত চাপিয়া নিদ্রিত ব্যক্তিদের দিকে তাকায়। না, কারো কানে আজহারের চিৎকার পৌঁছায় নাই।
আজহার খলিলকে বুকের কাছে টানিয়া লইল।
বারবার হাত বুলায় সে খলিলের পিঠে।
কুয়াশানিদ্রিত প্রান্তর আবার জাগিয়া উঠিতেছে। মনে পড়িল বৈকি আজহারের আমজাদের কথা, নঈমার মুখ, মহেশডাঙার জলাজাঙ্গাল। আর দরিয়াবিবি? না, আজহারের মানসপটে পরিশ্রমপটু, সংসার-অভিজ্ঞ, সুঠাম-তনু দরিয়াবিবির কোনো ছায়া ভাসিয়া উঠে না। হয়তো ভাসিয়া উঠিয়াছিল ক্ষণিক আলোর মলিন রেখায়। নিবীর্য একরকমের অস্থিরতা আজহারকে ব্যথিত করে বলিয়া সে তখন ছায়ার অন্যান্য জনতায় চিন্তার প্রহরীদের অজ্ঞাতবাসে পাঠাইল।
কিছুক্ষণ মৌন থাকিয়া আজহার জিজ্ঞাসা করল : কেউ মেরেছে বুঝি?
হ্যাঁ চাচা।
হঠাৎ উত্তেজিত হইয়া উঠিল আজহার।
কচি গায়ে কার এমন আজারে হাত উঠল?
খলিল কোনো জবাব দিল না। নীরবে বসিয়া রহিল।
কে মেরেছে?
আজহার অস্থিরচিত্তে জিজ্ঞাসা করিল।
খলিল অন্ধকারে চারিদিকে দৃষ্টি মেলে। তারপর আজহারের কানে কানে সে বলিল: ওদু চাচা চেলাকাঠ দিয়ে
ঢোক গিলিয়া খলিল আবার ফোঁপাইতে থাকে।
এ্যাঁ, ওদু এমন কড়া-জান?
খলিলের গায়ে হাত বুলাইতে বুলাইতে আজহার বলিয়া যায় : কী করেছিলে তুমি যে, এমন করে হাত চালায়?
গহর মিস্ত্রির সুর্মী ভেঙে ফেলেছি। ইটের উপর পড়ে গেল কিনা।
গহর রাজমিস্ত্রি। সে-ও বাসার ভেতর নিদ্রিতের দলে। পাছে তার কানে কোনো শব্দ যায়, ধরা-গলায় খলিল জবাব দিয়া চুপ করিল।
ছোট একটা সুর্মী ভেঙেছ, তার জন্য এত মার মারলে?
ফোঁপাইয়া কান্না আরম্ভ করিল খলিল।
আড়ষ্ট উচ্চারণের মধ্যদিয়া বোঝা যায় তার আবেদন : আমি চাচার সঙ্গে বাড়ি যেতে চেয়েছিলাম কিনা।
ওদু আজ বাড়ি গেছে?
হ্যাঁ, চাচা!
আজহার সান্ত্বনা দিতে চায় ওই অবোধ বালককে।
ওদু যাক না বাড়ি। আমরা রয়েছি, তোমার কোনো ভয় নেই।
চৌকাঠের একপাশে কখন সরিয়া গিয়াছে খলিল। আবার হাঁটুর মধ্যে তার মাথা গোঁজা। বিভীষিকাময়ী পৃথিবীর অবলোকনের সাহস তার নাই।
একটু পরে ঘাড় গুঁজিয়াই খলিল জবাব দিল : আমার মন টেকে না চাচা।
ব্যাটাছেলে, কাজ-কাম না শিখলে চলবে কেন? বিদেশ তো ব্যাটাছেলেদের জন্যই। তা মন অমন এক-আধটু খারাপ করে।
নিঃসাড় হইয়া গেল খলিল। কোনো জবাব আসে না তার নিকট হইতে।
তোমার বাপ বেঁচে আছে, চাচা?
জিজ্ঞাসা করিল আজহার।
খলিল অন্ধকারে মাথা তোলে না। ক্লান্ত স্বর তার বাইরে আর্তনাদের মতো শোনায় না!
আবার মাথা গুঁজে বসে আছ? ভাবনা কিসের? আমরা তো রয়েছি। ওদু কাল-পরশু ফিরে আসবে।
আজহার খলিলের দিকে হাত প্রসারিত করে। খলিল ধীরে ধীরে খার পাশে সরিয়া আসিল। ক্লান্ত দুইচোখ তার সড়কের দিকে।
পরে আজহারের মুখোমুখি দৃষ্টিপাত করিয়া সে বলিল : আজ দুমাস এসেছি, চাচা। মার জন্যে মন কেমন করে-যে। ওদু-চাচা এইবার নিয়ে চারবার ঘরে গেল।
বিদেশে থাকতে শেখো। কাজ শিখলে তবে তো বড় মিস্ত্রি হবে। দুঃখ ঘুচবে। এই দ্যাখো না, আমরা দেশে চাষবাস করতাম, শহরে আসিনি। কুকুরের হাল।
কোনো আশ্বাস পায় না খলিল।
পেট-ভাতায় ছমাস কাজ শিখলে তবে নাস্তার পয়সা বেরোবে। মাকে এক পয়সাও দিতে পারিনি। নাস্তার পয়সা বেরোলে তা বাঁচিয়েও কিছু পাঠাতে পারতাম।
আজহার খাঁ বিগলিত হৃদয়ে ওই দুগ্ধপোষ্য বালকের দিকে চাহিয়া থাকে। এত অল্প বয়সে পৃথিবীর রঙ চিনিতে শিখিয়াছে সে। এমন ছেলের উন্নতি আল্লা নিশ্চয় দেবেন। নসিব খুলবে বৈকি।
পুনরায় সরব হয় আজহার : আর কটা মাস, চাচা। তারপর নাস্তার পয়সা বেরোলে তোমার মাকে টাকা পাঠিয়ো। কেন, তোমার মা কিছু করেন না?
