আমজাদ কোটালের সঙ্গে আলাপ জুড়িয়া দিল। একটু পরে দহলিজের আড়াল হইতে দরিয়াবিবি নিজেই কোটালকে ডাকিয়া বলে : কোটাল মশায়, আমজাদের একটা বন্দোবস্ত করে দিন।
চন্দ্র অবাক হইয়া যায়। আজ পর্দানশীনা দরিয়াবিবি নিজেই কথা বলিতেছে।
লজ্জায় চন্দ্র কোটালের কণ্ঠস্বরে তার স্বাভাবিক গমক থাকে না।
কেন, কী হল, ভাবী?
গরিবের ছেলে, খামাখা মখতবে মাইনা গুনে লাভ কী?
চন্দ্রের স্বাভাবিক রসিকতা-পটু কণ্ঠস্বর স্তব্ধ হইয়া গিয়াছে। কিছুক্ষণ চুপ করিয়া রহিল সে।
তা ঠিক। তবে দুই-এক বছর দেখা উচিত। ঐ তো কচি ছেলে।
না, যখন বেশিদূর টানতে পারব না। খামাখা টাকা খরচ করে লাভ নেই।
চন্দ্র আর কোনো আপত্তি উত্থাপন করিল না।
ভাবী, বরং আমার সঙ্গেই থাকুক। মাছ-ধরা নৌকা বাওয়া শিখুক।
দরিয়াবিবি রাজি হইয়া গেল। ঐটুকু ছেলে এখনও সাঁতার শেখে নাই! সে নৌকা বাইবে? চন্দ্রের উপর সব নির্ভর করা চলে।
পান খাইয়া আমজাদকে একটু আদর করিয়া চন্দ্র কোটাল গায়ের অভ্যন্তরে প্রবেশ করিল।
পরদিন সকালে আমজাদ অবাক হইয়া গেল। একটি ছোট লগী হাতে মা কোটালের নিকট পুত্রকে প্রেরণ করিতেছে। সত্যই নৌকার জীবন আরম্ভ হইবে নাকি!
মার দৃঢ় মুখাবয়ব দেখিয়া আর কোনো আপত্তি করিল না আমজাদ। সামান্য মুড়ি কোঁচড়ে সে নদীর পথ ধরিল।
দু-বছর আগেও দরিয়াবিবি এমন ঘটনাস্রোতের কল্পনা করে নাই। কত স্বপ্ন ছিল তাঁর চোখে শিশুপুত্র লইয়া!
তুমি কি আর স্বপ্ন দেখো না, দরিয়াবিবি?
.
০৯.
মৌন মহিমায় বর্ষার আকাশে জাগিয়াছিল তারা ক্ষত অন্তর লইয়া।
মফস্বল শহরের অন্তঃপাতী গণ্ডগ্রাম। সড়কের একটেরে আজহার ও কয়েকজন রাজমিস্ত্রি বাসা ভাড়া লইয়াছিল।
স্টেশনে যাত্রী পৌঁছাইয়া দেওয়ার জন্য এ অঞ্জলের শেষ বা বহুক্ষণ সড়কের উপর টায়ারের দাগ আঁকিয়া গিয়াছে।
আজহার একমনে তখনও নারিকেলি হুঁকা টানিতেছিল। কল্কের দমের সঙ্গে সঙ্গে আগুনের ফুলকি ওড়ে বাতাসে। কিয়ৎক্ষণের জন্য অন্ধকার সরিয়া যায়। বাসার দরজা চোখে পড়ে। আজহার চৌকাঠের উপর।
বাসার আয়তন সংকীর্ণ। একদিকে মাত্র ছোট জানালা। মাটির দেওয়ালে চুন-বালি ছোপানো কোথাও রঙ ধসিয়া গিয়াছে। মেঝে সুসমতল নয়। তারই উপর মাদুর পাতিয়া আজহারের সঙ্গী ঘুমাইতেছিল। সারাদিন বৃষ্টির পর ভ্যাপসা গরমে ঘরের ভেতর আজহারের দম বন্ধ হইয়া আসিতেছিল। কিছুক্ষণ পূর্বেই বিছানা ছাড়িয়া সে চৌকাঠে ধোঁয়ার আসর জমাইতে মগ্ন হইয়াছিল।
সড়কের পাশে একটি ডোবায় ব্যাঙ ডাকিতেছিল। এই অঞ্চলে ভয়ানক মশা। খালিগায় শোয়া-বসার উপায় নাই। নিস্তেজ ক্লান্তির ছায়ায় কল্কে টানিতে টানিতে তার চোখ বুজিয়া আসে। আশেপাশে মশা ভন্ভ করে। এক-একবার গামছার ঝটকা মারে আজহার, আবার ধোঁয়ার সঙ্গে মিতালি চলে।
সড়কের গাছপালায় অন্ধকার জমিয়া রহিয়াছে। শীতল রাত্রির ডাকে জোনাকিদের চোখ নিদ্রাহীন। পানা-পুকুরের ধারে এই নিরীহ পতঙ্গের দেয়ালি উৎসবে কোনো ছেদ পড়ে না।
ধোঁয়া ছাড়িতে ছাড়িতে আজহার নীরবে চারিদিক অবলোকন করে। পঙ্গু মন তার নিঃসাড় হইয়া গিয়াছে। চিন্তার এলোমেলো জটাজাল অন্ধকারে হামাগুড়ি দেওয়া পর্যন্ত বিস্মৃত। কোনো কিছু মনে পড়ে না আজহার খাঁর।
নিয়ামতপুরে দুদিন ছিল সে মাত্র। কাজ জুটিয়াছিল ভালো। কয়েক সপ্তাহ কাজ চলিত স্বচ্ছন্দে। জায়গাটা খুব পছন্দসই নয়। ইতর মাতালদের আড্ডা তার ভালো লাগে নাই। এখানের অন্যান্য রাজমিস্ত্রি বড় বদ-চরিত্রের। সামান্য দুদিনের রোজগার তাঁকে খুঁজিয়া আজহার পথে পাড়ি দিয়াছিল। কাজ কোথা-ও-না কোথাও জুটিবেই, সে ভরসা ছিল তার। সড়কের পথেই নতুন ইমারতের কাঠামো দেখিয়া সে আশান্বিত বুকেই এখানে গৃহস্বামীর উমেদার হইয়াছিল। সঙ্গী মিস্ত্রিরা লোক মন্দ নয়। রোজ কম। তবু আজহার কোনো প্রতিবাদ করে নাই, সহজেই সে কাজে লাগিয়াছিল।
গ্রামের নাম শাহানপুর। দু-মাইল দূরে স্টেশন। তারই আবহাওয়ায় গ্রাম ও শহরের যৌথ লীলাভূমিরূপে জায়গা মন্দ নয়। আজহারও আকর্ষিত হইয়াছিল।
রেলস্টেশন মাত্র বছর-দুই আগে ভোলা হয়। এখনও বহু ব্যবসার ভবিষ্যৎ এই গ্রামে উঁকি মারিতেছে। কয়েকদিন অবস্থানের পর আজহার তাহা নীরবেই উপলব্ধি করিয়াছিল। যদি কোনো পুঁজি জমানো যায়! আজহার তাই কায়ক্লেশে রীতিমতো কৃচ্ছসাধন আরম্ভ করিয়াছিল।
সারাদিন খাটুনির পর আজ শরীর ভালো না, তার উপর বাসার ভেতর ভ্যাপসা গরম। সব মিলিয়া বড় অসোয়াস্তি বোধ করিতেছিল আজহার। তার কোনো স্পষ্ট চেতনা কিন্তু দাগ কাটে না কোথাও। নীরবে তাই হুঁকা পানই করিতেছিল। কয়েকবার হাই উঠিল।
আজহার খাঁ নিশ্চিন্তে বসিয়া থাকে। তামাক প্রায় নিঃশেষ। অন্যদিকে কার আওয়াজের কামাই নাই।
স্মরণের প্রান্তর নিঃশেষে মুছিয়া দিয়াছে কালো অন্ধকারের প্রলেপ। শিরার দ্রুত কম্পন রাত্রির তরঙ্গশীর্ষে ঈষৎ ঝিলিকের রেখা টানিয়া আবার শান্ত হইয়া আসে।
প্রাগৈতিহাসিক বর্বরের আলস্যমুখর অদ্ভুত বিরাম আকাক্ষা আজহার খাঁর মেরুদণ্ডে ঘা দিয়া গেল।
এইবার জোরে কল্কে ফোঁকে আজহার। তামাক-না-দারাৎ। অসন্তুষ্ট চিত্তে সে কল্কে চৌকাঠের কোণে রাখিয়া দিল।
আর এক ছিলিম পাইলে মন্দ হইত না। সে হাই তুলিল। হঠাৎ আজহার তার পাশেই আর একজনের উপস্থিতি অনুভব করে। অন্ধকারে অপরিচিত মানুষটি।
