শৈরমী বিশ্বাস করে না। মিছামিছি বলছ, ভাবী।
দরিয়াবিবি হৃদ্যতার জন্যই শৈরমীকে কোনোদিন কোনো দুঃখের কথাই বলে নাই, বরং শৈরমীকে এক-আধটা পয়সা দিয়া সাহায্যের চেষ্টা করিয়াছে, আধ পয়সার শাক এক পয়সায় কিনিয়াছে।
হৃদ্যতার এই আর এক সোপান।
আজহারের উপর দরিয়াবিবির ক্রোধের অন্ত থাকে না।
দ্যাখো না, দিদি। ঘর ছেড়ে পালাল। আমিও বয়েস থাকলে কাউকে নিয়ে বেরিয়ে যেতাম। এমন লোক ভূ-ভারতে না জন্মায়। এমন–
শৈরমী ধমক দিয়া বলিল, কী-সব অনাছিষ্টির কথা মুখে আনছ অবেলায়, ছিছি! তুমিও দিদি, সামান্য বাতাসেই হেলে পড়ো?
দরিয়াবিবি স্তব্ধ হইয়া যায় হঠাৎ।
আচ্ছা, ঘড়াটা দাও। অধর সাঁতের মার কাছে রেখে পাঁচটা টাকা আন্ব। বুড়ি দু পয়সা সুদ চায় মাসে।
তাকেই দিও।
ধীরে কথা বলে দরিয়াবিবি। দুই চোখ ছলছল করে তার।
বাবাজি বিয়ের সময় যৌতুক দিয়েছিল। আগে কপাল ভেঙেছিল। সেখান থেকে অতিকষ্টে ঘড়া আর পেতল-কাঁসার কটা জিনিস এনেছিলাম।
সজল ডাগর দুইচক্ষু দরিয়াবিবির বাম্পায়িত। থমথমে আকাশের মতো মুখাবয়ব বড় সুন্দর দেখায়। পরিশ্রম-মলিন গৌর রঙ বিদ্যুতের আভাসের মতো খেলিয়া গেল।
শৈরমী দুঃখ প্রকাশ করে : দাদার এমন উচিত হয়নি। ভালো ঘরের বউড়ী বাইরে বেরোয় না, সংসার দেখবে কে?
তুমি-ই বলল দেখি, দিদি।
দরিয়াবিবি কয়েক মিনিটের জন্য ঘরে ঢুকিল। যখন বাহির হইল তার হাতে একটি পুরাতন পিতলের ঘড়া।
মাটির উপর রাখামাত্র ঠুন শব্দ হয়।
শৈরমী বারবার ঘড়াটি পরীক্ষা করিতে লাগিল।
দেখব ভাবী, যদি দুএক টাকা বেশি দেয়। যে মজবুত জিনিস।
বৃষ্টি থামিয়াছিল কিয়ৎক্ষণের জন্য।
দরিয়াবিবি একটি পান শৈরমীর হাতে দিয়া বলিল : দিদি, আঁচলের আড়ালে নিয়ে যাও। কেউ জিজ্ঞেস করলে যেন বলল না, আমাদের ঘড়াটা। দিব্যি রইল, দিদি।
ভাবী, এতদিনে আমাকে এমন কাল কেউটে ঠাওরালে। অদেষ্ট খারাপ না হলে ঘরের লক্ষ্মী পরের ঘরে কেউ রেখে আসে?
শৈরমী উঠিয়া পড়িল। আবার বৃষ্টি শুরু হইয়াছে। দরিয়াবিবি তখনও ঘড়াটা নাড়াচাড়া করে। কত অনিচ্ছার প্রতিরোধ মনে, তবু ধীরে ধীরে পিতলের সামগ্রী শৈরমীর হস্তে তুলিয়া দিতে হইল।
কাউকে বলো না কিন্তু, দিদি। আমার মাথার দিব্যি।
শৈরমী চলিয়া গেল।
সামান্য চাল আছে, আমজাদের জন্য ভাজা হইবে। রাত্রে আর কিছুর ঝঞ্ঝাট নাই দরিয়াবিবির।
দূরে মেঘ-গর্জন প্রান্তর হইয়া ভাসিয়া আসে। সবুজের বন্যায় তরুলতা লুটোপুটি খায়। অবেলার মৌন আকাশ দরিয়াবিবির মুখের উপর বার বার ছায়া ফেলে।
***
এই দুর্দিনে চন্দ্র কোটাল অনেক সাহায্য করিল। একটা কানাকড়ি সে দেয় নাই। গতরে মেহনত আর সহানুভূতির কোনো মূল্য নিরূপণ করা যায় কী? আরো দুই হপ্তাহ কাটিয়া। গেল। আজহারের কোনো পাত্তা নাই। বর্ষায় গোবর হইয়া যাইত এতদিন পাকা আউশ ধান। চন্দ্র কোটাল মুনিশ করিয়া নিজে সব খড় আজহার খাঁর ঘরে পৌঁছাইয়া দিয়া গেল। এবার ভালো ধান ফলে নাই। তবু বর্ষার পর দুমাস কোনো রকমে কাটিয়া যাইবে। দরিয়াবিবি দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া বুক বাঁধে। চন্দ্র কোটালের উপদেশেই সে কোনো দেনা শোধ করিল না। দুমাসে যদি আজহারের সংবাদ না আসে– যদি আর কোনো দিনই না আসে। কুটিল হতাশার চক্ররেখায় নিষ্পিষ্ট হইতে থাকে দরিয়াবিবি।
আমজাদ একদিন মতব হইতে ফিরিয়া বলিল : মা, মৌলবী সাহেব মাইনে চেয়েছে। দরিয়াবিবি বিরক্ত হয় : থাক্ রোজ রোজ তাগাদা করতে হবে না মৌলবী সাহেবকে। কাল থেকে আর মতবে যাসনে।
আমজাদের মুখ শুকাইয়া যায়।
দরিয়াবিবি একরাশ খুদের কাঁকর চয়ন করিতেছিল। আমজাদের দিকে চাহিয়া তার বিরক্তির ছায়া অদৃশ্য হয়। মুখ গম্ভীর করিয়া দরিয়াবিবি বলে : মৌলবী সাহেবকে বল, আমার বাপ এলে সব চুকিয়ে দেব।
আমজাদ তবু নড়িল না। সে জানে, মা ঐ এক বাক্যে বহুদিন মৌলবী সাহেবকে স্তোক দিয়াছে।
সাহসের উপর দিয়া আমজাদ মার কথার প্রতিবাদ করিল : তুমি তো রোজ ঐ কথা বলো।
দরিয়াবিবি অবনত মুখে কাঁকর বাছিতে থাকে, আমজাদের দিকে আর চাহিয়াও দেখে না।
আমজাদ গুটিসুটি মারিয়া গতিবিধি লক্ষ্য করে শুধু।
বহুক্ষণের নিস্তব্ধতা জগদ্দল ঠেকে আমজাদের নিকট। উশখুশ করে সে।
দরিয়াবিবি তার পুত্রের অস্তিত্ব যেন বিস্মৃত হইয়াছে।
মা হঠাৎ ডাকিয়া ফেলে; আমজাদ। আড়ষ্ট ঠোঁট হইতে কোনোরকমে নিঃসৃত।
গম্ভীর দুই নেত্র প্রসারিত করিয়া দরিয়াবিবি একবার পুত্রের দিকে চাহিল মাত্র।
মা।
আমজাদের সম্বোধন আরো বাড়িয়া যায়।
এবার তীক্ষ্ণস্বরে জবাব আসে, কী?
না। কাল থেকে আর মখৃতবে গিয়ে কাজ নেই। ঢের হয়েছে লেখাপড়া।
আমজাদ মনে মনে উল্লসিত হয়। মতবের ছেলেদের ভালো লাগে। মতব তার আদৌ ভালো লাগে না।
তবে কী করব, মা?
ব্যঙ্গস্বরে জবাব দিল দরিয়াবিবি : কী করবি আবার! চাষার ছেলে জাতব্যবসা ধরবি।
আমজাদ এইবার মাথা হেঁট করে। কৃষির মতো কঠোর পরিশ্রমে কোনো সম্মান নেই।
মুখের হাসি অম্লান রাখিয়া সে জবাব দিল : আমি এই আট বছর বয়সে লাঙল ঠেলতে পারব?
তোর ঘাড় পারবে।
আমজাদ ভয় পায়, মা রীতিমতো ক্রুদ্ধ।
এমন সময় হঠাৎ চন্দ্র কোটালের ডাক শোনা গেল দহলিজে।
আমজাদ হাঁফ ফেলিয়া বাঁচিল।
এমনি আসিয়াছে কোটাল। আজহারের কোনো সংবাদ পাওয়া গেল কিনা। নিয়ামতপুরে ধানব্যবসায়ীরা প্রায়ই যায়। তারা কোনো খোঁজ দিতে পারে নাই। অতবড় গঞ্জে আজহার খাঁর মতো নগণ্য মানুষের তালিকা কোথাও লেখা থাকে না।
