আমজাদ শীতে কাঁপিতেছিল। সেদিকে দরিয়াবিবির লক্ষ্য নাই। কাদার উপর দাঁড়াইয়া থাকিতে যেন কত ভালো লাগে।
বিষণ্ণ-মুখ পুত্র ও জননী।
বৃষ্টি একটু কমিয়াছিল। গাছে-পাতায় মৃদু নিনাদে অহর্নিশ বাজিতেছে। পাখির ভিজে পাখনা-ঝাড়ার শব্দ এবার শোনা যায়।
যদি না আসে। নীরবতা ভাঙিল দরিয়াবিবি।
না গো মা, আসবে। ঘরে চলো, আমার শীত পেয়েছে।
হুঁশ হয় যেন দরিয়াবিবির। আঁচলের একপাশ শুষ্ক ছিল, তা দিয়া সে আমজাদের মাথা মুছাইয়া দিল।
এখানে মুছে কি হবে মা, বিষ্টি পড়ছে যে!
গৃহকর্মে নিপুণ দরিয়াবিবির কোনো কাজে যেন সুডৌল নাই। বৃষ্টি পড়িতেছে, এখন চুল মুছাইয়া দেওয়া বৃথা, এই কথাটুকু সে যেন উপলব্ধি করিতে পারে না।
একটা অশথ গাছের গোড়ায় অনেক ব্যাঙ লাফাইতেছে। শীতে কাঁপিতেছে, তবু মজা লাগে বেশ আমজাদের। খপ খপ করিয়া একটি ব্যাঙ সড়কের উপর বসিয়া বাদল পোকা খাইতেছে নীরবে।
আমজাদ জোরে এক সুট দিয়া বলিল : মা, দ্যাখো ফুটবল খেলছি।
ধপাস শব্দে কয়েক হাত দূরে ব্যাঙটি আবার মাটির উপর পড়িল। চার হাত-পা ছাড়িয়া ফোক-ফোক শব্দ করে ব্যাঙের বাচ্চা।
দরিয়াবিবি এই সময় হাসি চাপিয়া রাখিতে পারে না।
আরে আমু, তোর ছেলেমি আর যায় না।
নিজের কৃতিত্বে আমজাদ গম্ভীর হইয়া যায়। মাথা দোলাইয়া সে বলে, ঘরে আমাকে কিন্তু গরম ভাত খেতে দিতে হবে। এত ভিজেছি, আমার বুঝি খিদে লাগে না।
দরিয়াবিবি চুপ করিয়া গেল। তার মুখের হাসি নিভিয়া যায় তখনই।
আরো আকাশে মেঘ জমিতেছে। আরো কতদিন বর্ষা লাগিয়া থাকিবে বাংলাদেশের গ্রামে?
নঈমা কোথাও যায় নাই, আসেকজানের সঙ্গে সে বাগ-বিতণ্ডা করিতেছিল। দুজনে মাঝে মাঝে কৃত্রিম বিবাদ চলে। গতকাল আলেঙ্কান কিছু চাল ভিক্ষা করিয়া আনিয়াছিল। তারই সঙ্গতি হইতেছে।
পান্তাভাত ছিল সকালের। দরিয়াবিবি রান্নার আয়োজন করে নাই। আমজাদ ঝাঁকিয়া বসিল, সে পান্তাভাত খাইবে না।
মেজাজ খারাপ, তবু দরিয়াবিবি আজ চুপ করিয়া গেল। অভিমানে আমজাদ কিছুই স্পর্শ করিল না। বিছানায় শুইয়া শুইয়া ক্ষুধার্ত জঠরেই ঘুমাইয়া পড়িল।
দরিয়াবিবি ভিজা কাপড় ছাড়িয়া বসিয়া রহিল। গোয়ালে গরুগুলি খড় চিবাইতেছে। আজ আর কোনো হাঙ্গামা নাই। কত নিশ্চিন্ত যেন দরিয়াবিবি। নঈমা আসেকজানের ঘরে খেলা করিতেছিল, তার আওয়াজ কানে পৌঁছায়।
বৃষ্টির কামাই নাই।
নিদ্রিত আমজাদের দিকে চাহিয়া দরিয়াবিবি বুকে শত তরঙ্গের আলোড়ন চলিতেছিল। বাহিরে তার প্রকাশ নাই। দরিয়াবিবি চুপচাপ বসিয়া। বহুদিনের যেন অবকাশ মিলিয়াছে। কর্মক্লান্ত জীবনে খুঁটিনাটি দিনগুলি তাই স্মরণে গাঁথা হইতেছে।
সামান্য পান্তা ভাত ছিল। দরিয়াবিবি খাওয়ার কথা সহজেই ভুলিয়া যায়। তারও ঘুমে চোখ বুজিয়া আসে। দেওয়ালে ঠেস দিয়া দরিয়াবিবি ঢুলিতে থাকে।
কোথা গো ভাবী, শব্দে চমকিয়া উঠিল দরিয়াবিবি।
সত্যই শৈরমী আসিয়াছে। ভিজে কাপড়। হাতে একটি ন্যাকড়া কাপড়ে বাঁধা শাকের পুঁটুলি।
দাওয়ার উপর বোঝা রাখিয়া শৈরমী বলিল : কেন ডেকেছিলে, ভাবী?
দরিয়াবিবি শৈরমীর কাছে যেন ছুটিয়া আসে। ঘুম উবিয়া গিয়াছে তার।
এই রাস্তায় যে ছায়া পড়ে না আর দিদির।
শৈরমীর রং কালো। বৃদ্ধ বয়সে চামড়া লাল হইয়া গিয়াছে।
রেখা-সংবলিত শরীরে আবার বৃষ্টিপাত শৈত্যের জুলুম। কুঁকড়াইয়া এতটুকু হইয়া গিয়াছে শৈরমী। বড় কুৎসিত দেখায় তার শরীর।
কিন্তু তার কণ্ঠে হৃদয়ের অপূর্ব আভাস বাজে : কত কাজে থাকতে হয়, তোমার কাছে কি অজানা ভাবী। বর্ষাকালে ছেলেটাকে নিয়ে কষ্টের সীমা নেই।
এইবার রীতিমতো হাঁপায় শৈরমী।
দরিয়াবিবি গণেশকে কোনোদিন দেখে নাই। তবু শৈরমীর দুর্দশা তার কাছে বাস্তব। কোনো কল্পনার প্রয়োজন হয় না তার।
নসিব, বোন। তোমার অমন রোজগারী পুতের এমন অসুখ দিলে, আল্লা।
শৈরমী বুকে দুই হাত রাখিয়া উত্তাপ খোঁজে। বেশিক্ষণ অপেক্ষা করিতে চায় না সে। দরিয়াবিবি সহজে কোনো কথা পাড়িতে দ্বিধাগ্রস্ত, কেবল দেরির বাহানা তার।
পুঁটলিতে কী আছে, দিদি?
শৈরমী জবাব দিল : ভাবী, কটা শাক আছে। একটু তেল আনন, একদম চান্ করে ঘরে ঢুকব।
দরিয়াবিবি ঘরের ভেতর হইতে সরিষার তেলের ভাঁড় আনিল।
শৈরমী তখন পুঁটলি খুলিতেছে। সে একরাশ শাক দাওয়ার উপর রাখিয়া দরিয়াবিবির মুখের দিকে দৃষ্টিপাত করিল।
আর দেব, ভাবী?
না, এত মেটে শাক কী খাওয়া যায়! আর কি আছে পুঁটলিতে?
কিছু নেই।
কৌতূহলের ছলে দরিয়াবিবি শাকে হাত দেওয়া মাত্র তার নিচে শামুক দেখিতে পাইল।
বেশিদূরে সে অগ্রসর হইল না। দরিয়াবিবি বুঝিতে পারে, শৈরমী তো খুব সুখে নাই। হাঁসের জন্য শামুক লইয়া গেলে এমন গোপনের কী আছে। আর বেশি কথা জিজ্ঞাসা করিল না দরিয়াবিবি।
ভাবী, এবার উঠি।
আর একটু বসো। বুড়ো হাড়ে কি এত শীত ঢুকেছে?
কৃত্রিম কোপনতার সঙ্গে বলে দরিয়াবিবি।
শৈরমী অনুনয় করে : ভাবী, আর একদিন এসে গল্প করে যাব। যাই, ছেলেটাকে বর্ষায় ঘরে একা রেখে মন মানে না। পাছে কিছু হয়।
দরিয়াবিবি কিয়ৎক্ষণ কোনো জবাব দিল না। সিঁড়ির উপর বসিয়াছিল মাথা নিচু করিয়া, তেমনই বসিয়া রহিল। মুখের উপর কালো ছায়া পায়চারি করে তার।
হঠাৎ এক দমকা নিশ্বাসে দরিয়াবিবি বলিয়া ফেলিল : দিদি, তোমার গুণধর ভাই তিন হপ্তা ঘর ছেড়ে বেরিয়েছে মুখ কালা করে। ঘরে বড্ড টানাটানি। একটা পুরাতন ঘড়া আছে– রেখে যদি কেউ পাঁচটা টাকা দেয়। আমি সুদ দেব মাসে মাসে।
