আমজাদ মাথা দোলাইয়া সায় দিল।
রান্নার জন্য মা চাউল মাপতে আসিয়াছিল। হঠাৎ আমজাদকে আদর করিতে আরম্ভ করিল দরিয়াবিবি। যেন কত কথা আছে আরো, তা আজ বলিয়া শেষ করা যায় না। তাই স্নেহের ছোঁয়াচে সমাপ্তি-রেখা টানা হইতেছে। মার চুম্বনে বিব্রত হয় আমজাদ।
বাইরে বাঁশবনে মির্মির শব্দ শোনা যায়।
পরদিন দুপুরে আমজাদ স্তম্ভিত হইয়া গেল। সামান্য অন্যায়ে মা এমন শাস্তি দিতে পারেন। মক্তবের বেতন চাহিয়াছিল সে। হয়তো মার মেজাজ ভালো নয়, সেইজন্য চাওয়া উচিত হয় নাই; কিন্তু জননী এমন বেদেরেগ হাত চালাইতে পারে, তার জানা ছিল না।
মার খাইয়া দাওয়ায় বসিয়া সে নীরবে অশ্রুপাত করিল বহুক্ষণ। নঈমা পাশে দাঁড়াইয়াছিল। অনুতপ্ত জননীকে যদি একটিবার পাওয়া যায়। দরিয়াবিবি শত কাল্লাম জুড়িয়াছিল। আজহার ও তার চৌদ্দপুরুষের চল্লিশার আয়োজন হইতেছিল দরিয়াবিবির ঠোঁটে। আমজাদ আনমনা অলক্ষিতে ভিটা হইতে সরিয়া পড়িল।
মাঠে আসিয়া সে শান্তি পায়। আজহারও এই প্রান্তরের বুকেই দীর্ঘশ্বাসের মর্যাদা দিতে পারে। রক্তের শৃঙ্খলে বোধহয় আমজাদ বাঁধা পড়িয়াছিল।
সে অনেকক্ষণ ঘুরিয়া বেড়াইল মাঠে মাঠে। আকাশে মেঘ ছিল, বৃষ্টি ছিল না। ঘুরিয়া বেড়াইতে কোনো বাধা নাই।
বেলা ঢলিয়া পড়িতে তার ভয়ানক ক্ষুধা লাগিল। বর্ষাকালে ধান ছাড়া অন্য চাষ নাই মাঠে। গ্রীষ্মের দিন হইলে তরমুজ-শশা খাইয়া আমজাদ মার উপর প্রতিশোধ গ্রহণ করিত। অদৃশ্য হাতের টানেই সে চন্দ্র কোটালের কুঁড়ের দিকে অগ্রসর হইল।
নদীর মোহনার কাছে একটা পিঠুলি গাছের তলায় বসিয়া আমজাদ আবার আকাশ পাতাল ভাবিতে লাগিল। চন্দ্রাকার বাড়ি সোজাসুজি যাইতে আজ বাধে। মনের আবহাওয়া অতটুকু খোকাও সহজে মুছিয়া ফেলিতে পারে না। চন্দ্রমণি একবার কলস-কাঁখে খালের ধারে আসিয়াছিল। আমজাদকে দেখিয়া সে জিজ্ঞাসা করিল, এখানে বসে আছ যে–?
আমজাদ জবাব দেয় না। তার মুখ শুষ্ক। চোখের পাতার নিচে কান্নার শুষ্ক ছাপ।
রাগ করে এসেছ বুঝি বাড়ি থেকে?
চন্দ্রমণি ঠিকই আন্দাজ করিয়াছিল।
চলো, তোমার কাকা ঘরে আছে। কী হয়েছে?
আমজাদ শুধু মাথা হেঁট করিয়া থাকে। চন্দ্রমণির অনুরোধ সে রক্ষা করে না।
এই সময় চন্দ্র কোটালও আসিয়া উপস্থিত হইল।
কি রে চাঁদমণি। এই দ্যাখো না, দাদা। তোমার বন্ধুর ছেলেটা চুপচাপ বসে আছে।
চন্দ্র আমজাদের গতিবিধি লক্ষ্য করিল। সে নির্বাক নিশ্চল। তার কচি সুন্দর দুই চোখও দূরে উদাও।
হাসিয়া ফেলিল চন্দ্র।
আরে চাচা, গাছের তলায় শেষে তপ করতে বসেছ নাকি? তোমার বাবা বড় নামাজি-মুসল্লি। তার ছেলে।
আমজাদ কারো দিকে চায় না।
কোটালরা দুই ভাইবোনে খুব হাসিতে থাকে।
সিস দিয়া চন্দ্র গান ধরিল–
কথা কয় না।
আমার ময়না।
তবু আমজাদের ঠোঁটে কোনো আভাস নাই। চন্দ্র এইবার একটা সিস দিয়া সুৎ শব্দ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমজাদকে পাঁজাকোলা করিয়া একদম কাঁধে তুলিয়া লইল।
মৌনী বাবা এবার ফোঁপাইয়া ফোঁপাইয়া কান্না শুরু করিল।
কথা কয় না।
আমার ময়না,
হায়, হায় রে ….
চন্দ্র খালের সড়কে হাঁটে।
চন্দ্রমণি ডাকে, ও দাদা, ছেলেটাকে দুটো মুড়ি খাইয়ে নিয়ে যাও।
মাথা দোলায়।
হ্যাঁ, বড় কথা মনে করেছিস, মণি।
কোটাল আবার ঘরের দিকে মুখ ফিরাইল।
.
০৮.
বৃষ্টি ঝরিতেছিল অঝোরে। মাঠের খোলা জায়গায় জমাট টুইটম্বুর পানির উপর আকাশের ছায়া পড়ে। বর্ষা থামিলেই শালিখ-চড়াই আসিবে স্নানের লোভে ছুটিয়া।
দরিয়াবিবি সদর ছাড়িয়া সড়কের ঘুলি-পথে আসিয়া দাঁড়াইয়াছিল। জীবনে আর কোনোদিন সে এতদূর আসে নাই, মাথায় চটের থলি টোকার মতো করিয়া দেওয়া। পায়ের তলায় বৃষ্টিস্রোত বহিয়া যাইতেছে। চটের থলি পানি রোধ করিতে পারে না। ইতিমধ্যে উপরদিক ভিজিয়া গিয়াছে।
দরিয়াবিবি নির্বিকার দাঁড়াইয়াছিল। বেশ ঠাণ্ডা লাগিতেছে, তবু খেয়াল নাই। কার প্রতীক্ষায় সে দাঁড়াইয়া আছে?
সড়কের একপাশে গাছপালার নৈরাজ্য অল্প, তাই দূরে মাঠ দেখা যায়। অন্যান্য দিকে আকাট লতা আর গাছপালার জঙ্গল। মেঘমেদুর আকাশের আচ্ছাদনে নীরব নিবিড় পল্লীর এই বিজন কোলটুকু ভয়াবহ, প্রেতায়িত– সামান্য শব্দে চমক লাগে।
সড়কে দরিয়াবিবি দাঁড়াইয়া থাকে। চঞ্চল চোখ বারবার সড়কের দূরতম রেখায়। তার গম্ভীর মুখাবয়ব আকাশের বাদল যেন।
হঠাৎ দরিয়াবিবির দুই চোখ উজ্জ্বল হইয়া উঠে। দূরে একটি বালকমূর্তি দেখা গেল। আমজাদ দ্রুত পা ফেলিয়া অগ্রসর হইতেছে। একটিমাত্র লাল গামছা তার মাথায়।
বৃষ্টির পতন-রেখার ভেতর দিয়া তার বালকমূর্তি অপরূপ দেখায়। একটি পুতুল লাফাইয়া চলাফেরা করিতেছে।
দরিয়াবিবি আকস্মিক উৎফুল্ল হইয়া উঠে। আমজাদ তার নিকটে পৌঁছিবার পূর্বেই জিজ্ঞাসা করে, শৈরমীর সঙ্গে দেখা হয়েছিল?
বৃষ্টিস্নাত তার সমগ্র শরীর। শীতে আমজাদ কাঁপিতেছিল। সহজে জবাব দিতে পারে না।
মার কাছে ঘেঁসিয়া সে হাঁফ ফেলে কিছুক্ষণ, তারপর বিষণ্ণমুখেই জবাব দেয় : না গো মা। তবে শৈরমী-ফুফুর জা বললে, সে মাঠ থেকে তোদের বাড়ি যাবে।
শৈরমী জাতে বাগদী। কৈবর্তপাড়ার ঠেস ছাড়াইয়া গেলে জনপদের একটেরে বাগ্দীদের বাস। শৈরমীর সংসারে একমাত্র পঙ্গু পুত্র জীবিত। বহুদিন পূর্বে তার স্বামী পরলোকে। গণেশ দীর্ঘকাল রোগে ভুগে পরে হঠাৎ অকেজো হইয়া পড়ে। সোজা হইয়া দাঁড়াইতে পারে না, এক হাত বাঁকিয়া গিয়াছে। বৃদ্ধ বয়সেও শৈরমীকে এই পুত্রের ভরণ-পোষণের ভার গ্রহণ করিতে হইয়াছে। পাড়ায় সে ঘঁটে দেয়, মাঠের শাক তুলিয়া বেচে, কারো বাজার-সওদা কিনিয়া আনে। ফাঁইফরমাশেই তার জীবিকা সংগ্রহ হয়। জওয়ান পুত্রের এই দুরবস্থা। কায়িক পরিশ্রমের চাপেই শৈরমী তা সহ্য করিতে শিখিয়াছিল। দরিয়াবিবির সঙ্গে কয়েক বছরের পরিচয়। শৈরমী এই বাড়ি ঘুঁটে দিয়া যায়। সেই সূত্রেই হৃদ্যতা গড়িয়া উঠিয়াছিল। শৈরমী গ্রামেরই ঝিউড়ি বলিয়া সে দরিয়াবিবিকে ভাবী সম্বোধন করিত।
