নিমগাছের নিচে পোয়াল-খড়ের গাদাটি বড় অদ্ভুত ঠেকিল আজ দরিয়াবিবির। নিঃসঙ্গ মনে হয় ভিটের আশপাশ। প্রদীপ দেখাইয়া তাই তাড়াতাড়ি সে পুত্র-কন্যার নিকট ফিরিয়া আসিল।
একজোড়া পেঁচা উড়িয়া গেল। অমঙ্গলের আশঙ্কায় দরিয়াবিবির বুক দুরুদুরু করে। ছেলেদের কাপড় চুরি গেল কয়েকটি। হাত-ছাচড়ের উপদ্রবে রাত্রির ঘুম ব্যাহত হয়। পুরুষমানুষ ছিল ঘরে, তবু ভরসা। নিঃসঙ্গতা আর একবার হানা দিয়া গেল। বেলাবেলি গেরস্থালির কাজ শেষ হইয়া গিয়াছিল। দরিয়াবিবি আমজাদের পাশে বসিয়া তার পড়া শোনে : একদা দিল্লী নগরীর পথে।
নঈমা হি হি শব্দে হাসে : দিল্লী-বিলী হি-হি।
চুপ করে শোন্। গোলমাল করিসনে, নঈমা। বড় সজাগ আজ দরিয়াবিবির কান।
আমু পড়াশোনা করিতেছে, তার গোলমাল নেহাত কম নয়। তবু বেড়ার ধারে কি পৈঠার কাছে সামান্য শব্দ হইলে দরিয়াবিবি উৎকর্ণ হইয়া পড়ে।
ধূসর ভবিষ্যৎ যোজন-বিসারী প্রান্তরে ছড়াইয়া পড়িতেছে। তার চারিদিকে শুধু রুক্ষতা; সবুজ রঙের ফিকে আভাস পর্যন্ত নাই। দৃষ্টি মেলিয়া দিলে চাচর বালুর অকরুণ হাসিই একমাত্র সত্যরূপে প্রতিভাত হয়।
দরিয়াবিবি কোনোদিন বাস্তবের সম্মুখে ভাঙিয়া পড়িতে শিখে নাই। আজ সামান্য ব্যাপারটুকু কেন্দ্র করিয়া এতকিছু ঘটিয়া গেল।
সপ্তাহ কবে শেষ হইয়া যায়, আজহার খর কোনো খবর নাই। পিয়নকে আমজাদ অনর্থক বিরক্ত করে। দরিয়াবিবিও চিন্তিত হয়। অবশ্য আউশ ধান কাটা বাকি আছে। তার পূর্বে আজহার খাঁ নিশ্চয় বাড়ি ফিরিয়া আসিবে, দরিয়াবিবির মনে দৃঢ় বিশ্বাস ছিল।
ধীরে ধীরে আরো দুই সপ্তাহ কাটিয়া গেল। সাকেরকে ডাকিয়া দরিয়াবিবি বহু খেদোক্তি করিল। জওয়ান মরদ বিদেশে গিয়াছে, তার জন্য এত ভাবনাচিন্তা ভালো নয়। এই উপদেশ দিয়া সে সরিয়া পড়িল।
দরিয়াবিবি চারিদিকে অন্ধকার দেখে। হাত-খরচ শেষ হইয়া গিয়াছে। ছোট ছেলে আর মেয়ের মুখে দৈনন্দিন আহাৰ্যটুকু কি শেষে যোগাইতে পারিবে না, ধার-কর্জ করিয়া কতদিনই চলিবে?
দরিয়াবিবি উপায়ের খোঁজে অন্ধকারে হামাগুড়ি দিতে থাকে। ছাগলছানা দুটি থাকিলে দুর্দিনে কাউকে বিক্রয় করা যাইত। সে পথেও আল্লা বাধ সাধিয়াছেন। পুরুষমানুষ ঘরে থাকলে কোনো-না-কোনো পথের হদিশ মিলিত। বর্ষাকাল, পাড়া-প্রতিবেশীরা। কোনোরকমে দিন গুজরান করে। বীজধান খাইয়া অনেকে শেষ করিয়া ফেলিয়াছে। এই সময় জন-মুনিশ লোকে কম খাটায়। চারিদিকে বিপদের বেড়াজাল। প্রত্যেকে আত্মবিব্রত। গরিব কৃষক-পল্লীর ভেতর সহানুভূতি বুক-ফাটা নিঃশ্বাসের রূপ ধরিয়া বাতাসে ধ্বনিত হয়। আর তিন-চার দিনের খোরাক আছে। তারপর?
পরদিন সাকেরের মার সঙ্গে দরিয়াবিবি দেখা করিতে গেল। বৃদ্ধার গণ্ডস্থল আনন্দে স্বচ্ছ হইয়া উঠে। হাসুবৌর নিয়ত আল্লা পুরা করিয়াছে এতদিনে। আনন্দে সাকেরের মা এই বয়সেও অস্থির হয়। দরিয়াবিবি ঠাট্টাচ্ছলেই দাওয়াতের কথা পাড়িয়াছিল। বৃদ্ধা শুধু রাজি হইয়া গেল না, রীতিমতো পীড়াপীড়ি শুরু করিল। দরিয়াবিবি আজ সরলচিত্তে নিমন্ত্রণ গ্রহণ করিতে পারে না। কোথায় যেন মনে ব্যাপারটা বেঁধে। ঘরে ভাত নাই, এমনদিনে দাওয়াত স্বীকার করিলে পাড়াপড়শীরা হীনচোখে দেখিবে। তবু রাজি হইয়াছিল দরিয়াবিবি। এক বেলার খোরাক অন্তত বাঁচিয়া গেল। আসেকজানও সেইসঙ্গে নিমন্ত্রিত হইয়াছিল।
এতদিন আসেকজানের প্রতি দরিয়াবিবির একরূপ করুণা-মিশ্রিত অবজ্ঞার ভাব ছিল। ইদানীং অন্য চোখে দেখে এই বৃদ্ধাকে। সংসারে নিজেদের অসহায়তার সঙ্গে আসেকজানের দশা সমান পাল্লায় ওজন করা চলে, দরিয়াবিবি তা গভীরে উপলব্ধি করিতে শিখিয়াছে। পূর্বে তার কোনো খোঁজখবরই সে লইত না। কখন খায়, ঘুমোয় বা অভুক্ত থাকে তার হিসাবের প্রয়োজন ছিল না দরিয়াবিবির। বর্তমানে মনের এই বোঝাবাহী প্রবৃত্তির তাড়না সে নিজেই অনুভব করে।
বর্ষায় আসেকজান বাহির হইয়া যায়। দাপাদাপি বৃষ্টি তোড় চলিতেছে, সে কিন্তু থামে না। হয়তো তার দাওয়াত থাকে অথবা থাকে না কিন্তু দাওয়াতের বাহানা সে যোলো আনা করে।
ঘরে চাল শেষ হইয়া আসিতেছে। আসেকজান সব খবরই রাখে। এই বিষয়ে আমজাদ তার সহায়। রাত্রিবেলা ঘুমাইতে গেলে আসেকজান খুঁটাইয়া খুঁটাইয়া সব জিজ্ঞাসা করে।
জালায় আর বেশি চাল নেই, দাদি। মা কত রাগ করছিলেন আব্বার উপর।
আসেকজান প্রশ্নের জবাবে চুপ করে কিছুক্ষণ, আবার বলে : আজ পেটপুরে ভাত খেয়েছ?
হ্যাঁ, দাদি। মা কিন্তু ভালো করে খায় না।
আসেকজান স্তব্ধ হইয়া গেল আবার।
এমন সংলাপের বিনিময় চলে।
পরদিন জালার ভেতর হঠাৎ বেশি চাউল দেখিয়া দরিয়াবিবি আমজাদকে ডাকাইল।
দরিয়াবিবি : জালায় চাল এল কোথা থেকে?
আমজাদ : আমি কী জানি, মা।
দরিয়াবিবি ব্যাপারটা সহজে আন্দাজ করে। অন্যদিন হইলে এতক্ষণে কুরুক্ষেত্র বাধিয়া যাইত। সকা-জাকাতের চালে তার শিশুদের জঠর-সেবা চলিতে পারে না। আজ দরিয়াবিবি নিজেই অন্যদিকে কথার স্রোত ফিরাইল।
তুই পিয়নকে জিজ্ঞেস করেছিলি, টাকা বা চিঠি কিছু নেই?
আমি রোজ জিজ্ঞেস করি, মা।
কাল আর একবার যাস।
মার কণ্ঠ এত মোলায়েম হইতে পারে, আমজাদের বিশ্বাস হয় না।
বড় মিষ্টি মনে হয় মার গলা : আমু, ধান পেকেছে নাকি দেখে আসবি কাল। মুনিশ করে কাটাতে হবে আর কী।
