খাঁ, চলো, জমির ধানগুলো দেখে আসি। তুমিও বাড়ি যাবে।
দুজনেই সড়ক ধরিয়া অগ্রসর হয়। চন্দ্রের হাতে দুটি লালগোঁফ তপসে মাছ। আজহার আনমনা, কোনো দিকে তার দৃষ্টি নাই। কোটালের কোনো সাহায্য করিতে পারিল না, এই চিন্তা তার মনে কোথায় যেন বিধিতে থাকে।
চন্দ্র বেপরোয়া। সে তার স্বকীয় পদক্ষেপের ভঙ্গি বিস্মৃত হয় না।
বৃষ্টির পর দিগন্তের আবিলতা মুছিয়া গিয়াছে। শাদা বকের দল বিলের ধারে কোলাহলরত। খালের তীরে নলখাগড়ার ঝোঁপের পাশে একটি মাছরাঙা বাসা হইতে গলা বাড়াইয়া আবার সন্ত্রস্ত নীল আকাশে মিশিয়া গেল নিমেষে। চন্দ্র কোটালের চটুল চাহনি এক জায়গায় স্থির থাকে না।
আজহার পেছনে-পেছনে হাঁটিতেছিল। হঠাৎ চন্দ্র পাশ ফিরিয়া চাওয়ামাত্র আজহার ধরা-গলায় বলে : চন্দর, মনে করিসনে কিছু, ভাই। আমারও বরাত। কপাল তো খুলল না। ব্যবসা করে একবার দেখা যেত।
চন্দ্র কোটাল অবাক।
নিশ্চয় রাগ করব। তপসে মাছদুটো যদি ছেলেপুলে নিয়ে ভেজে না খাও, রাগ করব না?
হাসিমুখে চন্দ্র আজহারের হাতে মাছদুটি খুঁজিয়া দিল।
চন্দ্র কোটালের মনে চন্দ্রমণি, সংসার, যোগীন, পোপাল সকলে এক-একবার উঁকি দিয়া যায়। দুঃখের পশরা যেন হালকা হইয়া গিয়াছে। আজহারের সঙ্গ তার আরো ভালো লাগে।
আজহার ভাই, তোমার সঙ্গে একবার বিদেশে যাব। রাজমিস্ত্রির কাজ শিখিয়ে দাও সামান্য।
আজহারের নিকট হইতে কোনো জবাব আসিল না। চন্দ্র তার বিষণ্ণ মুখের দিকে একবার মাত্র চাহিয়া নীরবে হাঁটিতে লাগিল।
একটা শাদা গাঙচিলের তীক্ষ্ণ স্বর প্রান্তরে মূছীহত স্বপ্নিল আবেশের মতো বিলীন হইয়া যায়।
.
০৭.
কয়েক কাঠায় আউশ ধান দিয়াছিল আজহার।
বর্ষার মাঝামাঝি পাকা রঙ ধরিয়াছে আউশের ধানে। হঠাৎ সে রাজমিস্ত্রির কাজে কনিক ইত্যাদি লইয়া ভিনগায়ে চলিয়া গেল। সমস্ত সংসার রহিল দরিয়াবিবির উপর। পূর্বে বিদেশে যাওয়ার আগে আজহার খাঁ শলাপরামর্শ করিত স্ত্রীর সহিত। এবার কোনো কথা সে উচ্চারণ করে নাই। দরিয়াবিবি আজহারকে যন্ত্রপাতি লইতে দেখিয়াছিল। কোনো ভিনগাঁয়ে যাইতেছে সে, এমন ধারণা দরিয়াবিবির মনে ঘুণাক্ষরে উদিত হয় নাই। পরে আমজাদ আসিয়া খবর দিয়াছিল। পিতার বিদেশযাত্রার সংবাদ শুধু সে-ই প্রথমে অবগত হয়।
তুই ঝুট বলছিস, আমু।
না মা। আব্বা বললে, কোথায় নিয়ামতপুর আছে, সেখানে কাজে যাচ্ছে।
অবেলা সঙ্গীদের সঙ্গে আমজাদ তেপান্তর-জরিপে বাহির হইয়াছিল। আকস্মিক সাক্ষাৎ পিতা-পুত্রে। নিতান্ত দৈবাতের যোগসাজশ মাত্র।
দরিয়াবিবি কিছুক্ষণ গুম হইয়া দাঁড়াইয়া রহিল। এমনও লোক সংসারে আছে! বিদেশে যাইতেছে, তা-ও বাড়ির লোকদের একটু খবরমাত্র দেওয়া প্রয়োজন মনে করিল না।
হুই ইস্টিশনের দিকে গেল। মা, আব্বাকে দেখলে একটা পাগল মনে হয়। মুখে কথা নেই। মাথা গুঁজে চলেছে তো চলেছেই। হুঁসগুস নেই।
দরিয়াবিবির ঠোঁটে এতটুকু দাগ পড়িল না।
মা, কী হাসি লাগে আব্বার ছিরি দেখলে। লুঙিটা পর্যন্ত ভালো করে পরতে জানে না। কোনোরকমে কোমরে গুঁজলেই বুঝি কাপড় পরা হয়? তার উপর ছেঁড়া পিরহান।
দপ করিয়া জ্বলিয়া উঠিল দরিয়াবিবি।
যা, আর কথার খৈ ফোঁটাতে হবে না।
আমজাদ কেঁচো বনিয়া গেল।
দরিয়াবিবি লক্ষ্য করে, সন্ধ্যা নামিয়া আসিতেছে। ঘন কৃষ্ণপক্ষ। আজ আর চাঁদ উঠিবে না সড়কের উপর। ইস্টিশনের পথ অনেক দূর।
তোকে আর কিছু বলেনি, তোর আব্বা?
আমজাদের ত্রস্ত-সঙ্কুচিত চিবুক ছুঁইয়া দরিয়াবিবি জিজ্ঞাসা করিল। পিতৃহীন কোনো অনাথের চিবুক যেন স্পর্শ করিতেছে দরিয়াবিবি। কণ্ঠ তার নুইয়া পড়ে ভাবাবেগের আতিশয্যে। হঠাৎ এমন দীনতার প্রলেপ তার মনে ও শরীরে! অসোয়াস্তি অনুভব করে জননী। বালকপুত্রের জবাব আসন্ন সন্ধ্যার অন্ধকারে মিশিয়া যায়।
খলিল বলিল, আমু, কাজে যাচ্ছি নিয়ামতপুর।
নিয়ামতপুর কোথা মা?
দরিয়াবিবি কোনো উত্তর দিল না। আজ ক্ষোভ হয় তার। হিংসা-উদ্ভূত ক্ষোভ। সমস্ত সংসারকে এমনই নির্বিকার চিত্তে সে দেখিতে পারিত! রাত পোহাইলে শত কাজ, মনের চারিদিকে আরো সহস্র বেড়ির সর্পিলতা।
আমজাদ সম্মুখে না থাকিলে অবোধ বালিকার মতো কাঁদিয়া ফেলিত দরিয়াবিবি। দৃষ্টি নেপথ্যে মিলাইয়া, বালকপুত্রের উপর ঈষৎ ভর দিয়া দাঁড়াইয়া রহিল সে স্থাণু প্রতিমার মতো।
নঈমা পিতার ন্যাওটা। পাড়ার কোনো বালকের মুখে সে বাবার বিদেশযাত্রার ৭০
কথা শুনিয়াছিল। তার কান্না আর থামে না। রোদন-আতুর কন্যার কণ্ঠস্বরে চমক ভাঙিল দরিয়াবিবির।
মা, আমাকে আব্বা নিয়া গেল না। নঈমা চিৎকার করে।
চুপ। না হলে মার খাবি।
মার ধমকে নঈমা শান্ত হয়।
দরিয়াবিবি বলে, আমু, ওকে তোমার মতবের বইয়ের ছবি দেখাও।
তখনও সন্ধ্যা দেওয়া হয় নাই, দরিয়াবিবির খেয়াল ছিল না। তাই আবার বলিল, আমি ডিপে জ্বেলে দিচ্ছি, একটু সবুর কর বাবা।
নাচ-দুয়ারে প্রদীপ দেখাইতে আসিয়া দরিয়াবিবি গরুগুলির চেহারাও একবার দেখিয়া লইল। যদি বৃষ্টি না হয়, কিছুক্ষণ চরাটের জন্য ছাড়িয়া দেওয়া হইবে। আমু ছেলেমানুষ। অপরের ফসলে না পড়ে, সে ভয়ও আছে। খোয়াড়ের পয়সা যোগানের ক্ষমতা যাদের আছে তাদের গরু-বাছুর ছাড়া থাকে ফসলের দিনেও।
