লুসি চোখ মুছে ঘুমাবার চেষ্টা করে। ভাবতে চায় না কিছু তবুও ভাবনা এসে যায়। মা থামলে লুসিকে হয়তো ভাবতে হতো না, বাবার জন্য মাই থাকতো এবং তিনিই যথেষ্ট।
*
মাথুন দ্বীপে কয়েকদিন কেটে গেলো।
ক্যাপটেন আরফিন হুই যে কারণে এ দ্বীপে এসেছেন সে ব্যাপারে অনেকটা পিছিয়ে পড়লেন। কয়েকদিনে তিনি তিনজন সহকারী নাবিককে হারিয়েছেন। যারা আছেন তাদের মধ্যেও একটা ভীষণ আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। সবাই সোনার মায়া ত্যাগ করে জাহাজে ফিরে যাবার জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠেছে। জাভেদ চলে গেলেও আবার সে ফিরে এসেছে, মাঝে মধ্যেই কাউকে কিছু না জানিয়ে গভীর জঙ্গলে চলে যায়। হয়তো সমস্ত দিন তার কোনো সন্ধান মেলে না। সন্ধ্যার পর কিংবা গভীর রাতে ফিরে আসে জাভেদ এক কোচড় ফল নিয়ে। কোনো জীবজন্তুর সন্ধান পেলে হয়তো শিকার করে নিয়ে আসতো। আগুনে পুড়িয়ে খেতে। ওরা। তীর-ধনু ছাড়াও আজকাল জাভেদ রাইফেল সঙ্গে নিতো।
জাভেদ সেদিন ফিরে এলে আরফিন হুই ওর কাঁধে হাত রেখে বলেছিলেন–তুমি সেই নরখাদকটির পেছনে ধাওয়া করে চলে গেলে তারপর আর ফিরে এলে না। আমরা বড়ড় দুশ্চিন্তায় পড়েছিলাম, যদিও আমার দলের লোককে নরখাদক ধরে নিয়ে গেছে তবুও এত ভীত আতঙ্কিত হইনি। সত্যি জাভেদ, তুমি ফিরে না এলে আমি সম্পূর্ণ হতাশ হয়ে পড়তাম।
জাভেদ একটু হাসলো শুধু।
বলেছিলেন আরফিন হুই–জাভেদ, এমন করে গভীর জঙ্গলে চলে যেও না, হঠাৎ কোনো দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
জাভেদ এ কথাতেও কোনো জবাব দেয়নি।
তিনজন সহকারীকে হারিয়ে ভীষণ উদ্বিগ্ন আর উকুণ্ঠিত হয়ে পড়েছিলেন আরফিন। বহুবার তিনি বহু বিপদের সম্মুখীন হয়েছেন কিন্তু এমন অবস্থায় কখনও পড়েননি।
লুসি আর ফুল্লরাও ভীষণ ঘাবড়ে গেছে।
বিশেষ করে পিতার দুশ্চিন্তা আর উদ্বিগ্নতা লুসির মনকে ভীষণভাবে চিন্তাগ্রস্ত করে তুলেছে। বাবার ইচ্ছার বিরুদ্ধে লুসি কোনোদিন কোনো কথা বলেনি। সে জানে তার বাবা অহেতুক কিছু করেন না। বাবার মধ্যে লুসি কোনোদিন অন্যায় কিছু দেখেনি, আর দেখেনি বলেই তার বিশ্বাস বাবা কোনো মন্দ কাজ করতে পারে না। মাঝে মাঝে লুসির মনে হয় তার বাবা ছাড়া আর কেউ বুঝি এ পৃথিবীতে এমন সৎ-মহৎ ব্যক্তি নেই। এহেন বাবাকে লুসি কোনো সময় কষ্ট দিতে চায় না।
বাবা তার সহকারী প্রিয় নাবিকদের হারিয়ে ভীষণ মুষড়ে পড়েছেন। কত বিপদই না এসেছে তার বাবার ওপরে কিন্তু বাবাকে সে এমনভাবে বিচলিত হতে দেখেনি কোনোদিন।
সমস্ত দিন ধরে তবুও কাজ চলে।
নাবিকদের নিয়ে ক্যাপেটেন আরফিন দুই নিজে কোদাল চালান এবং স্বর্ণ মেশানো মাটি নিয়ে বস্তা বোঝাই করেন। আর বেশি দিন এ দ্বীপে থাকার ইচ্ছা তার নেই। যত শীঘ্র এ দ্বীপ ত্যাগ কর যায় ততই মঙ্গল কিন্তু যে উদ্দেশ্য নিয়ে তার এ অভিযান সেই উদ্দেশ্য সফল না হলে সব যে তার ব্যর্থ হয়ে যাবে।
নাবিকগণ যদিও ভীত-আতঙ্কিত তবুও তারা মালিকের নির্দেশমত কাজ করে চললো। সবাই শাবল-কোদাল চালিয়ে চলছে, মাথার উপরে সূর্য অগ্নিবর্ষণ করছে। আকাশ মেঘশূন্য।
শ্রমিক নাবিকদের দেহ ঘামে ভিজে উঠেছে।
কেউ কেউ হাতের পিঠে কপালের ঘাম মুছে আবার কোদাল চালাচ্ছে। কারও কারও জামাটা ঘামে ভিজে চুপসে উঠেছে, জামাটা খুলে রেখেছে কাঁধে। কেউ বা পাশের বড় গাছটার নিচে বসে জিরিয়ে নিচ্ছে।
আরফিন হুই নিজেও মাটি কাটছেন সবার সঙ্গে।
লুসি এ দৃশ্য লক্ষ্য করছিলো, সে এগিয়ে এলো পিতার পাশে, ব্যথিত কণ্ঠে বললো বাবা, তুমি নিজের হাতে কোদাল চালাও এটা আমি চাই না। আমাকে দাও কোদালটা, তোমার চেয়ে আমি ভাল কোদাল চালাতে জানি।
হেসে বললেন ক্যাপটেন হুইমা লুসি, তুই কচি মেয়ে। আমি পুরুষ মানুষ, আমার হাত দু’খানা এখনও সবল আছে।
সব সময় তুমি এই ধরনের কথা বলে আমাকে কচি খুকি বানিয়ে রেখেছে। ওসব আমি শুনব না, তোমার কোদালখানা আমাকে দেবে কিনা বলো?
ক্যাপটেন আরফিন হুই জানতেন তার মা-মরা মেয়েটা বড্ড জেদী আর একগুয়ে। যদি সে রাগ বা অভিমান করে তাহলে বড় মুশকিল! কিছুতেই তাকে সোজা করা যাবে না। তাই আরফিন হুই নিজের কোদালখানা এগিয়ে দিলেন কন্যার দিকে-লুসি, তুমি মাটি কাটো এ আমি চাই না, তবে তুমি যাতে খুশি তাই আমার কাম্য।
এমন সময় হঠাৎ একটা আর্তচীৎকার শোনা গেলো।
যারা মাটি কাটছিলো তারা ভীত আতঙ্কিত হয়ে তাকালো যে দিক থেকে আর্তনাদ ভেসে এসেছে সেই দিকে। সবাই দেখলো গাছের তলায় বিশ্রামরত ব্যক্তিটাকে কাঁধে তুলে নিয়ে জঙ্গলের মধ্যে উধাও হলো সেই ভয়ংকর মানুষটা।
সঙ্গে সঙ্গে আরফিন হুই রাইফেল তুলে গুলি ছুঁড়লেন সেই মানুষটাকে লক্ষ্য করে। পর পর কয়েকবার গুলি ছুঁড়লেন তিনি।
ডিরোমা অদুরে কোদাল নিয়ে মাটি কোপাচ্ছিলো।
সে ছুটে গেলো তার রাইফেলটা হাতে নিয়ে কিন্তু কাউকে দেখতে পেলো না। তবু সে ফাঁকা গুলি করে চললো কিছুক্ষণ ধরে। সবাই বিস্ময় বিস্ফারিত আতঙ্কিত চোখে থ’ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হাতের কোদাল-শাবল ফেলে দিয়েছে তারা। জীবনের বিনিময়ে তারা সোনা চায় না।
আরফিন হুই কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেলেন, তার মুখমন্ডল ফ্যাকাশে লাগছে। হাতের রাইফেলখানা তার হাতেই রয়ে গেলো। স্থবিরের মত দাঁড়িয়ে রইলো তিনি।
