ডিলোমা ও দলবল জঙ্গল হতে বেরিয়ে আসতেই ক্যাপটেন আরফিন হুই বললেন–নরখাদকটিকে পেলে না?
না, তার কোন চিহ্নই আমরা খুঁজে পেলাম না। বললো ডিরোমা।
লুসি তাকালো জাভেদের মুখমন্ডলে, দেখতে পেলো সে মুখে একটা হিংস্র ক্রুদ্ধভাব। বলল লুসি–হিরো, তুমিও বিফল হলে সেই ভয়ংকর মানুষটার সন্ধানে?
অত্যন্ত দ্রুত চলতে পারে সে, তাই আমাদের দৃষ্টির আড়ালে ক্ষিপ্রগতিতে চলে গেছে। বললো জাভেদ।
ফুল্লরা জাভেদের মুখে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে কিছু বোঝার চেষ্টা করছিলো। সে সহজে কাবু হওয়ার লোক নয়, কে সেই বিস্ময়কর মানুষ যার কাছে জাভেদ হার মেনে ফিরে এসেছে।
এই ঘটনার পর কেউ স্বস্তি পাচ্ছিলো না।
তাদের দলের একজন হারিয়ে গেলো, নিশ্চয়ই তার মৃত্যু ঘটেছে। আর সে ফিরে আসবে না।
তবুও ক্যাপটেন আরফিন অসুস্থ শরীর নিয়ে দলবলসহ বহু খোঁজ করলেন কিন্তু কোথাও পাওয়া গেলো না নাবিক সহকারীটিকে।
পরদিন কারও চোখে ঘুম নেই।
সবাই জেগে জেগে পাহারা দিচ্ছে।
এমনি ফুল্লরা আর লুসিও ঘুমোত পারেনি।
সবার চোখ যদিও ঘুমে জড়িয়ে আসছে তবুও কেউ শয্যা গ্রহণ করছে না। না জানি কোন্ মুহূর্তে আবার সেই নরখাদক এসে আর একজনকে তুলে নিয়ে যাবে!
জাভেদ কিন্তু কারো নিষেধ শোনেনি, সে গভীর জঙ্গলে সন্ধান করে ফিরছে, হাতে তার তীর-ধনু।
*
অনেক রাত।
তবুও ফিরে আসেনি জাভেদ।
ফুল্লরাই শুধু ব্যস্ত চিন্তিত হয়নি, ক্যাপ্টেন আরফিন হুইও ভীষণ চিন্তিত হয়ে পড়েছেন জাভেদ জঙ্গল থেকে ফিরে আসছে না বলে। ডিরোমাকে এত বিপদেও খুশি খুশি মনে হচ্ছিলো। মাঝে মাঝে সে লুসির সঙ্গে ভাব জমিয়ে তোলার চেষ্টা করছিলো।
লুসি যদিও তাকে পাত্তাই দিচ্ছিলো না তবুও ডিরোমা সব সময় লুসির কাছাকাছি থাকার জন্য একান্ত আগ্রহ দেখাচ্ছিলো। কারণে অকারণে এটা সেটা নিয়ে আলাপ জমানোর সুযোগ করে নিতে চায় সে। অবশ্য এমন মনোভাব তার পূর্বে ছিলো না, লুসিকে নিয়ে ডিরোমা ভাববার সাহস পায়নি। যখনই সে দেখলো লুসি জাভেদের দিকে ঝুঁকে পড়েছে তখনই এটা চিন্তা তার সমস্ত মনকে আচ্ছন্ন করলো। লুসির সৌন্দর্য তাকে নতুন করে মুগ্ধ অভিভূত করলো। হাত বাড়ালেই যদি তাকে পাওয়া যায় মন্দ কি! তাছাড়া লুসিকে জয় করতে পারলে জাহাজ এলুনের মালিক হওয়ার সাধ পূর্ণ হবে একদিন। কারণ ক্যাপটেন আরফিন হুইয়ের পর তার একমাত্র কন্যা লুসিই পিতার যথাসর্বম্বের মালিক হবে। কাজেই লুসির জন্য রয়েছে যা কিছু তা লুসিকে পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আসবে তার হাতের মুঠোয়। তা ছাড়া লুসি সুন্দরী বটে। মাথায় রেশমী সোনালী চুল, মায়াময় হরিণীর মত দুটি চোখ। গোলাপের পাপড়ির চেয়ে কম নয় তার দেহের বর্ণ। অবশ্য ক্যাপটেন হুইয়ের মত তার কথা বলার ভঙ্গী হলেও মা এলুনের চেহারার সঙ্গে লুসির চেহারার মিল আছে যথেষ্ট।
এ কারণে ক্যাপটেন হুই কন্যার মধ্যে তার হারানো প্রিয়াকে খুঁজে পান যেন নিজের অলক্ষ্যে। নির্বাক হয়ে তাকিয়ে থাকেন আরফিন দুই কন্যার মুখের দিকে। ভুলে যান তিনি নিজের অস্তিত্ব, সহসা দৃষ্টি ফিরিয়ে নিতে পারেন না।
লুসি কোনো কোনো সময় হেসে বলে বাবা, তুমি অমন হা করে আমার মধ্যে কি খোজো বলো দেখি।
কিছু না মা লুসি! বললেন আরফিন হুই।
লুসিকে না বললেও সে ঠিকই বুঝতে বাবার মনে মায়ের স্মৃতি ভেসে উঠছে। মাকে যখন তার স্মরণ হয় তখন তিনি তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকেন নির্বাক দৃষ্টি মেলে। লুসি বলতোবাবা, তুমি যাই বলো আমি জানি কি খোজো তুমি আমার মধ্যে।
সত্যি জানিস মা?
হাঁ বাবা, তুমি মায়ের স্মৃতি আমার মধ্যে খুঁজে ফেরো। তুমি না বললেও আমি ঠিক বুঝতে পারি, কারণ আমি আগের সেই ছোট্ট লুসিটি এখন আর নই। বাবা, তুমি মাকে এতো ভালবাসতে?
বাসতাম, তবু তো ধরে রাখতে পারিনি। আমার ভালবাসা, ছোট্টো মা মনির……
লুসি বাবার মুখে হাতচাপা দিয়ে বলতো–তা বাবা, তুমি মায়ের কথা মনে করে মনে কষ্ট পাও এ আমি চাই না। যে যাবার চলে গেছে তাকে নিয়ে এতো ভাবতে হবে কেন? লুসির মনেও মায়ের কথা স্মরণ হলে একটা দারুণ ব্যথা খচ খচ করে ওঠে তবুও সে নিজের মনের ব্যথা চেপে চাপা রেখে পিতার ব্যথাকে লাঘব করার জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠে। এ পৃথিবীতে একমাত্র তার বাবা ছাড়া আর কেই বা আছে। লুসি বাবার মধ্যে বাবা-মার স্নেহ খুঁজে পায় তাই বাবাকে সে হারাতে চায় না। লুসি যে মাকে নিয়ে ভাবতো না তা নয়, কিন্তু বাবা যেন বুঝতে না পারে তার মনের কথা তাই নির্জন ক্যাবিনে শুয়ে শুয়ে আনমনা হয়ে যেতো। পৃথিবীটা তখন তার কাছে একটা যন্ত্রণাময় স্থান বলে মনে হতো। কেনইবা জন্ম হয় আবার কেনোইবা মৃত্যু ঘটে। সব কিছু নিয়েই ভাবতে লুসি, সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টি নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করতো। জন্ম এবং মৃত্যু এ দুটো থেকে কারও রক্ষা নেই। পৃথিবীর মায়ার বন্ধন কাউকে ধরে রাখতে সক্ষম হবে না। সবাইকে একদিন যেতে হবে সবকিছু ত্যাগ করে। তার মা গেছেন, বাবাকেও যেতে হবে, তাকেও ধরে রাখতে পারবে না লুসি তবুও ভাবতে পারে না লুসি বাবার মৃত্যুর কথা! না না, বাবাকে মরতে দেবে না সে, তার মৃত্যু হবার পূর্বে লুসি যেন পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে পারে। কিন্তু মৃত্যু কাউকে রেহাই দেয় না, সবই বোঝে লুসি তবুও যেন কেমন এলোমেলো চিন্তা তাকে গ্রাস করে।
