ফুল্লরা ও লুসি ক্যাপটেন আরফিন হুইয়ের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। তাদের চোখেমুখে ভয়, বিস্ময় আর ভীষণ আতঙ্কের ছাপ ফুটে উঠেছে।
জাভেদ গত সন্ধ্যায় গভীর জঙ্গলে প্রবেশ করেছে, আজও সে ফিরে আসেনি। ফুল্লরা আর ভাবতে পারে না, জাভেদের জন্য ভাবতে ভাবতে তার চোখের নিচে কালিমা পড়েছে। ম্লান মুখে তাকিয়ে আছে ফুল্লরার গভীর জঙ্গলটার দিকে। কত বার বারণ করেছিলো সে জাভেদকে কিন্তু কিছুতেই তারে ধরে রাখতে পারেনি। কারও কোনো কথা সে শোনে না, নিজের যা খেয়াল হয় তাই সে করে।
আরফিন হুই আর ডিরোমা গভীর জঙ্গলে প্রবেশ করতে চাইলেন কিন্তু লুসি ও তার দলবলের বারণ কিছুতেই উপেক্ষা করতে পারলেন না। লুসি তো এঁটে ধরলো তার বাবার হাত–বাবা, আমি কিছুতেই তোমাকে যেতে দেবো না ঐ জঙ্গলে!
মা, আমাদের কয়েকজনকে হারালাম কি হবে আমার বেঁচে! মরতে হয় মরবো তবু আমি দেখবো কে ঐ মানুষ আর কোথায় ওর সন্ধান। তা জেনে না নিয়ে আমি ফিরবো না।
লুসি জানে তার বাবা যা বলেন তা তিনি করেন, বড় জেদী মানুষ তিনি।
সেদিনের ঘটনার পর ক্যাপটেন আরফিন দুই ভীষণ কঠিন হয়ে উঠলেন। তিনি স্বর্ণসংগ্রহ ক্ষান্ত রেখে সেই বিস্ময়কর মানুষটির সন্ধানে হন্যে হয়ে ছুটে চললেন এখানে সেখানে। বাধ্য হলো তার দলবল তাকে অনুসরণ করতে।
জাভেদ ফিরে এলো। অকস্মাৎ যেমন সে চলে গিয়েছিলো তেমনি হঠাৎ এসে হাজির হলেন ক্যাপটেন আরফিন হুই যখন জঙ্গলে প্রবেশ করতে যাচ্ছিলেন ঠিক সেই মুহূর্তে।
ক্যাপটেন হুইয়ের চোখ দুটো আনন্দে জ্বলে উঠলো, কারণ জাভেদের ওপর তার অনেক ভরসা।
লুসি আর ফুল্লরা খুশি হলো অনেক।
ফুল্লরার মনে একটা বিষণ্ণতার ছাপ পরিলক্ষিত হচ্ছিলো এখন তা দূরীভূত হয়েছে।
লুসি এবার চুপ থাকতে পারলো না, সে জাভেদের হাতখানা মুঠায় চেপে ধরে বললো— তুমি বড দুষ্ট! কাউকে কিছু না বলে এমন করে কোথায় উধাও হও বলোত
জাভেদ বললো—-বলে যাবার সময় হলো কই? সেই অদ্ভুত লোকটাকে তাড়া করে গেলাম কিন্তু সমস্ত জঙ্গল চষে ফিরলাম কোথাও পেলাম না।
লুসি বললো—চরম আশ্চর্যকর ব্যাপার। বাবার কাছে শুনেছি দ্বীপে কোনো জীবজন্তু বা কোনো প্রাণী নেই অথচ…
হাঁ মা, যা শুনেছিলে তা সত্য কিন্তু……আর বিলম্ব করা উচিত হবে না জাভেদ চলো আমাদের সঙ্গে।
চলো বাবা, বলল লুসি।
সবাই মিলে জঙ্গলে প্রবেশ করলো।
প্রত্যেকের হাতে এক একটা রাইফেল এবং জ্বলন্ত মশাল।
মশালের আলো জঙ্গলের অন্ধকার দূরীভূত করলেও সব কিছু স্পষ্ট নজরে পড়ছিলো না। কারণ জঙ্গলের স্থানে স্থানে ঘন বৃক্ষলতাগুচ্ছ হওয়ায় জমাট অন্ধকারে আচ্ছন তাই মশালের আলোতেও সবদিকে নজর চলে না।
ক্যাপটেন হুইয়ের একহাতে রাইফেল অপর হাতে পাওয়ার ফুল টর্চটা। তিনি অসুস্থ অবস্থায় দীপ্ত পদক্ষেপে চলেছেন। দলবল তার পেছনে এমন কি লুসি আর ফুল্লরাও আজ পিতার সঙ্গে গহন জঙ্গলে প্রবেশ করেছে। ডিরোমা সবার পেছনে।
জাভেদ ক্যাপটেন আরফিন হুইয়ের পাশে পাশে চলেছে। তার পিঠে তীর-ধনু বাধা। প্রস্তুত হয়ে চললো জাভেদ, যে কোনো মুহূর্তে তীর-ধনু হাতে নিয়ে যেন শত্রুকে আক্রমণ করতে পারে। চোখমুখে ক্রুদ্ধ হিংস্র ভাব ফুটে উঠেছে তার।
সকলের হাতে মশাল থাকায় গভীর জঙ্গলেও পথ চলতে তাদের কোনো অসুবিধা হচ্ছিলো না। বন্য জীবজন্তুর ভয় নেই, ভয় শুধু ঐ একজনকে নরখাদক মানুষটির।
*
একসময় দিনের আলো নিভে গেলো, নেমে এলো রাতের অন্ধকার। আবার রাত ভোর হলো, সূর্যের আলোতে ঝলমল করে উঠলো মাথুন দ্বীপের বুক। ক্রমান্বয়ে ক্লান্ত অবসন্ন হয়ে পড়লো ক্যাপ্টেন আরফিন হুইয়ের দলবল। ভয়ংকর মানুষটির নখের ক্ষতগুলোও বেশ গম্ভীর হয়ে উঠেছে ক্যাপ্টেন হুইয়ের দেহে।
মিস্ লুসি পিতার জন্য চিন্তিত, হঠাৎ কিছু হয়ে না পড়ে।
জন্মাবার পর থেকেই লুসি তার বাবাকে দেখে আসছে একটি কঠিন মানুষ হিসেবে। কোনোদিন সে তার বাবাকে ক্লান্তি আর অবসাদে মুষড়ে পড়তে দেখেনি। এবার তার বাবার মুখে একটা বিষণ্ণতার ছাপ দেখতে পাচ্ছে। প্রথম যেদিন তার বাবা মাথুন দ্বীপে পা রাখলেন সেদিন তিনি ছোট্ট শিশুর মতই আনন্দে উচ্ছল হয়ে উঠেছিলেন। মাথুনের মাটি তার সমস্ত দেহমনে খুশির উদাস বয়ে এনেছিলো। মাথুনের মাটিতে সোনার কণিকা দেশে দু’হাতে মুঠো মুঠো তুলে নিয়ে মাথায়, চোখেমুখে মেখেছিলেন তিনি পাগলের মত।
সেদিন লুসির আনন্দ যেন ধরছিলো না। বাবাকে যেন সে প্রথম দেখলো নতুন এক মানুষ হিসেবে। বাবা বুঝি ছোট্ট শিশুটি বনে গিয়েছিলেন সেদিন। লুসি জানতো তার বাবা কি চান আর কেনই বা মাপুন দ্বীপে এসেছেন। মাথুনের সম্পদ বয়ে নিয়ে যাবেন তিনি তার দেশে। অগণিত মানুষ যারা ক্ষুধায় কাতর তাদের মুখে অন্ন তুলে দেবেন তার বাবা। দেশবাসীর দুঃখ-দুর্দশী তার বাবাকে ভীষণ ভাবিয়ে তোলে, শ্রমিকরা যখন তাদের দেহের বল হারিয়ে ফেলে, তখন তারা ঠিক পূর্বের মত পরিশ্রম করতে সক্ষম হয় না, তখন ওরা শিশুর মত অসহায় হয়ে পড়ে। এদের জন্য বাবাকে লুসি অনেক ভাবতে দেখেছে, এদের জন্য কিছু একটা করা দরকার। পুত্রকন্যা সবাই বেচে থাকলেও তারা পঙ্গু অসহায় বাবা-মার জন্য তেমন করে কিছু করতে পারে না কারণ তাদের কাঁধে তখন অনেক ঝামেলা এসে পড়ে। বাবা-মাকে নিয়ে ভাবা তাদের চরম কৰ্তব্য জেনেও কর্তব্য পালনে সক্ষম হয় না। তারপর নিজেরাও একদিন সেই পর্যায়ে এসে পড়ে, তখন উপলব্ধি করে হৃদয় মন দিয়ে যে, তাদের বাবা-মারাও এমনি এক সময় কুঁকড়ে গিয়েছিলো। এ ছাড়াও আছে আরও অনেক মানুষ যারা খেটে খাবার অযোগ্য। বাবা তাদের জন্যও ভাবছে। যদি মাথুন তার বাবাকে সম্পদ নিয়ে ফিরে যাবার সুযোগ দেয় তাহলে অনেক কিছু করবেন দেশের জনগণের জন্য কিন্তু বাবা এমন হয়ে গেলেন কেন।
