অনেক কথাই ফুল্লরার স্মরণ হচ্ছিলো, হঠাৎ চমকে উঠলো একটা অদ্ভুত শব্দে। ফিরে তাকাতেই দেখলো একটা লোককে কাঁধে তুলে নিয়ে বিস্ময়কর একটি ছায়ামূর্তি দ্রুত জঙ্গলে প্রবেশ করলো।
ভয়ার্তকণ্ঠে চিৎকার করে উঠলো ফুল্লরা।
সঙ্গে সঙ্গে জাভেদ এবং অন্যান্য সবাই জেগে উঠলো।
ফুল্লরার পাশে ছুটে এলো লুসি–কি হয়েছে ফুল্লরা।
সেই ভীষণ মানুষটা আমাদের দলের একজন লোককে কাঁধে তুলে নিয়ে ছুটে চলে গেলো ঐ জঙ্গলটার মধ্যে। ভীতকণ্ঠে বললো ফুল্লরা।
ততক্ষণে আরফিন হুই তার অসুস্থ দেহ নিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছে।
লুসি পাশে যেয়ে দাঁড়াতেই বললেন তিনি কি হয়েছে মা লুসি?
লুসি বুঝতে পারলো তার বাবা ফুল্লরার কথা শুনতে পায়নি। তবু তিনি আন্দাজ করে নিয়েছেন, বললেন পুনরায় ঐ অদ্ভুত মানুষটা এসেছিলো বুঝি?
হাঁ বাবা, একজন নাবিককে কাঁধে তুলে নিয়ে গেছে।
বলো কি মা!
হাঁ বাবা।
দাও আমার রাইফেলটা দাও,
না বাবা, তোমাকে যেতে দেবো না। বরং আমি নিজে যাচ্ছি সবাইকে নিয়ে……
জাভেদ তীর-ধনু হাতে নিয়ে পা বাড়াতেই ফুল্লরা বললো—জাভেদ তুমি যেও না! যেও না জাভেদ। তোমাকেও সে হত্যা করে ফেলবে।
ফুল্লরার কথায় কর্ণপাত না করে জাভেদ তীর-ধনু হাতে প্রবেশ করলো জঙ্গলের মধ্যে।
অন্যান্য নাবিকের মধ্যে অনেকেই পিছিয়ে রইলো আর কয়েকজন জাভেদের পেছনে পেছনে রাইফেল নিয়ে ছুটলো।
ক্যাপ্টেন আরফিন হুই বললেন–মা লুসি, আমাকে যেতে দাও। আমার দল থেকে একজনকে এভাবে ধরে নিয়ে যাবে আর আমি চুপ করে থাকবো? যেতে দাও মা!
না বাবা, তা হবে না। তুমি ভীষণ অসুস্থ। জাভেদ ফুল্লরার বারণ শুনলো না, সে তীর ধনু নিয়ে চলে গেছে। তার সঙ্গে গেছে আরও কয়েকজন নাবিক। ডিরোমাও না গিয়ে পারেনি, সেও অস্ত্র নিয়ে গেছে বাবা। এবার অদ্ভুত মানুষটাকে ওরা খতম না করে ছাড়বে না।
পারবে না মা, পারবে না……এমন ভীষণ হিংস্র মানুষ আমি কোনোদিন দেখিনি। শরীরে অসুরের শক্তি, যার শক্তির কাছে আমার আগ্নেয় অস্ত্র হার মেনেছে। উঃ! তোমাকে কি বলবো মা লুসি, আমি যখনই ভাবি তখন অবাক হই–এই মানুষটি কে আর কোথায় পেলো সে এতো শক্তি! জানো লুসি, আমি যখন দলবল নিয়ে ঐ অদ্ভুত মানুষটার পেছনে ধাওয়া করে চললাম তখন সে কোনো বনজঙ্গল টিলা কিছু মানছিলো না। কোন বাধাই তার পথরোধ করতে পারেনি। বহুদূর পর্যন্ত গিয়েও তাকে নাগালের মধ্যে না পেয়ে গুলি ছুঁড়তে পারছিলাম না। শুধু আমি কেন, আমার সহকারীদের মধ্যেও কেউ তাদের অস্ত্রের লক্ষ্যের মধ্যে তাকে পাচ্ছিলো না। সে যেন হিংস্র গন্ডারের মত তীরবেগে ছুটছে। তারপর কোথায় হারিয়ে গেলো আর খুঁজে পেলাম না। একদিকে রাতের অন্ধকার তারপর গভীর জঙ্গল। ওকে লক্ষ্য করে গুলি করেছিলাম বেশ কয়েক বার। আমার সঙ্গী-সাথিগণ তারাও গুলি ছুড়ছিলো কিন্তু সেই অদ্ভুত মানুষটার দেহ গুলি স্পর্শ করতে পারেনি। কোথায় যে সেই অদ্ভুত মানুষটা উধাও হলো ঠিক ঠাওর করতে পারলাম না। বিফল মন নিয়ে ফিরে আসবো ঠিক সেই মুহূর্তে অন্ধকার জঙ্গলের মধ্য হতে অদ্ভুত লোকটা ঝাঁপিয়ে পড়লো আমার ওপর। আমাকে ভীষণভাবে আক্রমণ করলো। দূরে ছিটকে পড়লো আমার হাতের রাইফেল, আমি ধরাশায়ী হলাম। অন্ধকারে দেখলাম লোকটার চোখ দুটো আগুনের গোলার মত জ্বলছে। সে আমাকে আক্রমণ করার সময় আমার দলবল অনেকটা এগিয়ে গিয়েছিলো, তারা আমার এ অবস্থা দেখতে পায়নি। এ ছাড়াও অনেকে পূর্বেই ভীত আতঙ্কিত হয়ে আমার কাছে অনুমতি নিয়ে তারা জঙ্গলের বাইরে চলে এসেছিলো। লোকটার আক্রমণে আমি জীবনের মায়া ত্যাগ করলাম। তার নখের আঁচড়ে আমার দেহের মাংস ছিঁড়ে আসছিলো, আমি মরিয়া হয়ে নিজকে রক্ষার চেষ্টা করছিলাম কিন্তু এত বেশি শক্তি লোকটার দেহে যে একচুলও নড়তে পারছিলাম না। লোকটা আমার বুকের কাছে দাঁত বসিয়ে দেবে বলে যেমন উবু হয়েছে ঠিক সেই মুহূর্তে জাভেদ কোথা হতে লাফিয়ে পড়লে তার ঘাড়ে।
বাবা!
হাঁ মা, জাভেদ ওর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লো, তারপর শুরু হলো তুমুল লড়াই।
আর তুমি?
আমি ক্ষতবিক্ষত শরীর নিয়ে উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করলাম কিন্তু পারলাম না। দুচোখে আমার বিস্ময়, আমি তাকিয়ে আছি অন্ধকারে। আকাশে অসংখ্য তারকা ছিলো তাই আবছা দেখতে পারছিলাম। গভীর জঙ্গল হলেও তারকারাজির আলোর ছটা গাছের ফাঁকে ফাঁকে এসে প্রবেশ করেছিলো। প্রথমে তো জাভেদকে চিনতে পারিনি, পরে চিনলাম। বড় খুশি লাগছিলো জাভেদকে দেখে কিন্তু শরীরের যন্ত্রণা আমাকে কাহিল করে ফেলেছিলো। জাভেদ আর নরখাদকে তুমল যুদ্ধ হচ্ছে। কিছু সময়ের মধ্যেই লোকটা জাভেদের কাছে পরাজয় বরণ করলো। তাকিয়ে দেখি সেই ভয়ংকর মানুষটা ছুটে পালিয়ে যাচ্ছে। আমাকে জাভেদ কাঁধে তুলে নিলো, তারপর আর কিছু স্মরণ নেই আমার….
বাবা, জাভেদ ছিলো তাই তুমি জীবনে বেঁচে গেছে, নইলে তোমাকে আর কোনোদিন ফিরে পেতাম না। লুসি কথাগুলো বলে বাবার কাঁধে মাথা রাখলো।
ক্যাপ্টেন আরফিন দুই কন্যার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন-ঠিক বলেছিস্ মা জাভেদের জন্যই পর পর কয়েক বার আমরা বিপদমুক্ত হয়েছি কিন্তু……
এমন সময় ফিরে এলো ডিরোমা এবং তার সঙ্গীরা।
জাভেদও ফিরে এলো। তার হাতে তীর-ধনু রয়েছে।
