লুসিও ঘুমাচ্ছে তার পিতার পাশে।
ফুল্লরার প্রথমে কিছুটা তন্দ্রা এসেছিলো কিন্তু তন্দ্রা ছুটে গেলো যখন সে তাকিয়ে দেখলো জাভেদ বসে আছে অগ্নিকুন্ডটার পাশে। কম্বলটা সজোরে উঠে বসলো, ভালভাবে লক্ষ্য করলো সবাইকে। কেউ জেগে নেই এমন কি ডিরোমাও ঘুমাচ্ছে।
লুসির দিকে তাকিয়ে আশ্বস্ত হলো ফুল্লরা, দেখলো অঘোরে ঘুমাচ্ছে সেও। চুলগুলো তার বাতাসে উড়ছে।
ফুল্লরা পা টিপে টিপে জাভেদের পাশে এসে দাঁড়ালো।
জাভেদ কিছু ভাবছে।
পদশব্দে ফিরে তাকাতেই ফুল্লরা তার পাশে বসে পড়েছিলো, প্রথমে ভেবেছিলো জাভেদ তার সঙ্গে কথাই বলবে না হয়তো। কারণ বহুদিন ফুল্লরা বিমুখ হয়ে ওর কাছে গিয়ে, একটি কথাও জাভেদ বলেনি, আর আজ এতোগুলো কথা বললো জাভেদ, সত্যি বড় আনন্দ লাগছে ফুল্লরার।
জাভেদ বলো, তারপর?
আমি দিনের আলোতে সব দেখছিলাম। বেশ ভাল লাগছিলো যদিও তবুও দেহের ক্ষতগুলো ব্যথায় টনটন করছিলো। নিকটেই একটা ঝর্ণা ছিলো। আমি ঝর্ণার স্বচ্ছ শীতল পানি প্রাণভরে পান করলাম। অনেকটা সুস্থ বোধ করলাম, তারপর সন্ধান করে চললাম সেই বন্য মানুষটির……
ফিরে আসার কথা ভুলে গেলে তুমি?
হাঁ, আমার তখন শুধু ঐ লোকটার কথা মনে পড়ছিলো। জনহীন নির্জন দ্বীপে মানুষ এলো কোথা হতে।
জাভেদ, তুমি ভাবতে শিখেছো? তোমার মনে চিন্তাবোধ জন্মেছে! কি যে খুশি লাগছে আমার! জাভেদ…কিন্তু তোমার শরীরের ক্ষতগুলো আমাকে ভীষণ ব্যথা দিচ্ছে। ভালোয় ভালোয় সেরে ওঠো এই আমি চাই জাভেদ। আচ্ছা, তুমি দুটো দিন শুধু জঙ্গলে জঙ্গলে ঘুরে বেড়িয়েছো?
এতোদূর চলে গেছি যেখান থেকে সহজে ফেরা যায়নি।
কি খেয়েছে দুদিন?
গাছের ফল আর ঝর্ণার পানি।
সত্যি আমি একদম ভেঙে পড়েছিলাম। সব সময় মনে হতো ডিরোমা তোমায় হত্যা করেছে। ওর কথাবার্তা কেমন সন্দেহজনক লেগেছে আমার কাছে।
ডিরোমা!
হাঁ, ঐ যে ওখানে যে ঘুমিয়ে আছে। লোকটাকে আমার মোটেই ভাল লাগে না।
জাভেদ বলে উঠলো—তোমার ভাল না লাগলে ওর কিছু যায় আসে না। ও খুব ভাল আর সাহসী।
তোমাকে সুন্দর করে কথা বলতে দেখে আমি মুগ্ধ হচ্ছি জাভেদ। এখানে তুমি ছাড়া আর আমার কে আছে বলো? এবার আমি জেগে থাকি, তুমি ঘুমাও জাভেদ।
যদি সেই মানুষখেকো লোকটা আবার আসে?
ঐ তো তোমার পাশে তীর-ধনু রয়েছে, ওটা নিক্ষেপ করে হত্যা করবো।
পারবে তুমি তীর ছুঁড়তে?
পারবো জাভেদ, পারবো। তুমি ঘুমাও……আমার কোলে মাথা রেখে ঘুমাও।
জাভেদের সত্যিই খুব খারাপ লাগছিলো। ঐ মানুষখেকো মানুষটার নখের আঁচড়ের ক্ষতগুলো ব্যথায় টনটন করছিলো। ফুল্লরার কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়লো জাভেদ।
ফুল্লরার আনন্দ ধরে না, বুকটা ভরে ওঠে খুশিতে। জাভেদ স্বেচ্ছায় তার কোলে এই প্রথম মাথা রেখে শুয়েছে। অগ্নিশিখার স্বল্প আলোতে নির্নিমেষ নয়নে জাভেদের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে ফুল্লরা।
কিছুক্ষণ মাত্র।
অঘোরে ঘুমিয়ে পড়ে জাভেদ।
ফুল্লরা ওর চুলে আংগুল বুলিয়ে চলে। ছোটবেলার দৃশ্যগুলো তার মানসপটে ভেসে উঠতে থাকে। একসঙ্গে খেলাধূলা, ছুটাছুটি এমনকি মারামারিও ওরা করেছে। একবার একটি হরিণশিশু ধরে এনেছিলো তাদের এক অনুচর। সুন্দর হরিণশিশুটা নিয়ে জাভেদ আর ফুল্লরার মধ্যে শুরু হয় তুমুল মারামারি। ও বলে হরিণশিটা আমার, সে বলে না ওটা আমার। চুল ধরে টানাটানি তারপর দাঁত দিয়ে কামড়াকামড়ি। জাভেদের হাতে খুব জোরে কামড়ে দিয়েছিলো ফুল্লরা, রক্ত বের করে দিয়েছিলো। কিন্তু জয়ী হতে পারেনি সেদিন ফুল্লরা, জাভেদ হরিণশিশুটা অধিকার করে নিয়েছিলো। সেদিন এমন রাগ হয়েছিলো, আজও সে কথা মনে করলে ফুল্লরার হাসি পায়। ওর মাংস চিবিয়ে খেতে ইচ্ছা করছিলো তার। তারপর আবার আর একদিনের কথা মনে পড়ে ফুল্লরা, সেদিন একটা পাথরের নুড়ি নিয়ে ঝগড়া, শেষ পর্যন্ত লড়াই। এ ওর চুল ধরেছে, তারপর কিল-চড় শেষ পর্যন্ত কামড়াকামড়ি। ভাগ্যিস আম্মু দেখে ফেলেছিলো তাই ছুটে এসে দু’জনকে সামলে নিয়েছিলো, সরিয়ে নিয়েছিলো দুজনকে দু’পাশে। সেদিনও জয়ী হয়েছিলো জাভেদ, পাথরের নুড়িটা জাভেদই অধিকার করে নিয়েছিলো।
সেদিনের বিগত কথাগুলো ভাবতেও বেশ ভাল লাগে ফুল্লরার। খেলার সাথী জাভেদ আজ তার বড় সাধনার কামনার জন। জাভেদকে ছাড়া ফুল্লরা যেন কিছু ভাবতেই পারে না। ও পাশে আছে বলেই বাবা-মা সবার কথা সে ভুলে গেছে, বিস্মৃত হয়েছে সবকিছু।
গভীর জঙ্গল ছাড়া সভ্য সমাজে ফুল্লরা কমই গেছে।
শহর, নগর, বন্দর এসব সে কমই দেখেছে তাই ফুল্লরা শহর, নগর-বন্দরে এলে খুব আশ্চর্য হয়। বিস্ময় নিয়ে দেখে সবকিছু। সভ্য সমাজের লোকজনের সঙ্গে তার তেমন কোনো পরিচয় নেই, বাবা-মা আর নিজেদের লোক ছাড়া কাউকে চিনতে না ফুল্লরা। আজ সে অনেককেই চেনে বা পরিচয় হয়েছে। ভাগ্য তাকে কোথায় টেনে এনেছে! ক্যাপ্টেন আরফিন হুই সত্যি মহৎ ব্যক্তি। তার স্নেহ-আদর-যত্ন ফুল্লরার মনকে আচ্ছন্ন করেছে, পরিতৃপ্ত ফুল্লরা তার অপরিসীম মধুর ব্যবহারে।
জীবন নিয়ে ফুল্লরার কোনোদিন ভাববার সময় হয়নি, শুধু একজনের কথাই তার ভাবতে ভাল লাগে–সে হলো জাভেদ। কত বারই না ফুল্লরা জাভেদকে হারিয়েছে। তার সন্ধানে কতদিন কত জায়গায় হন্যে হয়ে ঘুরেছে ফুল্লরা তার বাবার অশ্ব দুর্কীকে নিয়ে।
