বনহুরকে নিয়ে মহিলা একদিন রাজদরবারে হাজির হলো।
মহারাজ এক অদ্ভুত মানুষ।
পুরুষ না নারী বোঝা মুস্কিল।
বনহুর তার সঙ্গীদের লক্ষ্য করলো কিভাবে তারা মহারাজকে অভিবাদন জানায়, সেভাবে সেও জানালো।
মহারাজ তাকে সিংহাসনের পাশের আসনে বসালো এবং নিজে আসন ত্যাগ করে নতজানু হয়ে অভিবাদন জানালো। এক তরুণী থালার উপর সুন্দর মহামূল্যবান একটা হীরার হার এনে রাজার সামনে ধরলো।
মহারাজ হীরার হারটি তুলে নিয়ে পরিয়ে দিলো বনহুরের গলায়।
রাজদরবারের কোন ছাদ ছিলোনা।
উজ্জ্বল দ্বীপ্ত আলোতে দরবারকক্ষ ঝলমল করছে।
সেই আলোতে বনহুরের গলার মালা বা হীরার হারটি থেকে এক আলোর ছটা বিচ্ছুরিত হচ্ছিলো।
একপাশে বাদ্যকরগণ অদ্ভুত ড্রেসে সজ্জিত হয়ে সঙ্গীতে ঝংকার তুলেছে। এ সুর যেন স্বপ্নপুরীর এক মোহময় সুরের ঝংকার।
হীরক খচিত থালায় ফুল নিয়ে একদল তরুণী প্রবেশ করলো। ফুলগুলো ফিকে বেগুনী অথচ বড় সুন্দর।
সমস্ত দরবারকক্ষে একটি সুমিষ্ট গন্ধ ছড়িয়ে পড়লো।
আর থালা থেকে ফুলগুলো নিয়ে ছড়িয়ে দিতে লাগলো বনহুরের মাথার উপর।
বনহুর ভাবেনি এখানে এমন অভ্যর্থনা পাবে সে। সত্যি সে ভাগ্যবান, অতি ভাগ্যবান যাকে বলে। হাসে বনহুর আপন মনে।
নাইবা বুঝলো ভাষা ওদের, তবু তো ওরা তাকে বন্ধু বলে মেনে নিয়েছে। বনহুর ভাবছিলো অনেক কিছু, হঠাৎ তার কানে এলো অতি পরিচিত এক কণ্ঠের প্রতিধ্বনি–রাজকুমার আপনি….
বনহুর চমকে চোখ তুললো।
[পরবর্তী বই রূপালী সূর্য]
থমথমে গভীর রাত।
অগ্নিকুন্ডটা জ্বলে জ্বলে এখন প্রায় নিতে এসেছে।
তারাবিহীন আকাশ জমাট অন্ধকারে ভরা। সমুদ্রের গর্জন আর ঝাপটা হাওয়া মিলে অদ্ভুত একটা শব্দের সৃষ্টি করে চলেছে।
ক্যাপ্টেন আরফিন হুইয়ের দলবল সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। শুধু জেগে আছে জাভেদ। সে অগ্নিকুন্ডটার পাশে বসে মাঝে মাঝে শুকনো কাঠ দিয়ে নাড়া দিচ্ছিলো আগুনটাকে। পাশে তার প্রিয় তীর-ধনু।
পদশব্দে ফিরে তাকালো জাভেদ।
ফুল্লরা তার পাশে বসে কাঁধে হাত রেখে বলে–জাভেদ, তুমি না অসুস্থ! রাত জাগলে তোমার শরীর আরো খারাপ হবে।
জাভেদ একটু হেসে বললো সবাই ঘুমালে ফের ঐ লোকটা আসবে। উঃ! কি ভয়ংকর লোকটা!
এমনি করে বসে থাকবে তুমি?
হাঁ, আমার কোনো কষ্ট হচ্ছে না।
কিন্তু আমার চোখেও যে ঘুম আসছে না জাভেদ!
ফুল্লরা জাভেদের পাশে ঘনিষ্ঠ হয়ে বসলো, ব্যথাভরা কণ্ঠে বললো—জাভেদ, তুমি বারবার আমাকে দুশ্চিন্তায় ফেলছে। এমনি করে চলে যাও, আমি কি যে মনকষ্টে কাটাই তুমি তা বুঝবে না।
বললো জাভেদ–আমি তো ইচ্ছা করে যাইনি ফুল্লরা। আমি নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছিলাম। হঠাৎ আমাকে কেউ যেন কাঁধে তুলে নিয়ে দ্রুত ছুটতে শুরু করলো। আমি চেষ্টা করলাম নিজকে মুক্ত করার জন্য কিন্তু পারলাম না। শক্ত দুটো হাত আমার দেহটাকে কঠিনভাবে আঁকড়ে ধরে আছে।
কি সর্বনাশ! বললো ফুল্লরা দুচোখে বিস্ময় নিয়ে।
জাভেদ বলছে–একবার ভাবলাম আমি বুঝি স্বপ্ন দেখছি কিন্তু পরক্ষণেই আমার হুশ হলো। লোকটা আমার চুলগুলো ধরে একটা সমতল জায়গায় শুইয়ে দিলো, তারপর সে তার বিরাট বিরাট নখ দিয়ে আমার দেহের মাংস তুলে নেবার চেষ্টা করলো।
তারপর, তারপর কি হলোর উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বললো ফুল্লরা।
জাভেদ পূর্বের ন্যায় শান্ত গম্ভীর কণ্ঠে বললো আমার বুকের কাছে মুখ নিয়ে মাংস তুলে নেবার উপক্রম করতেই আমি তার পেটে প্রচন্ডভাবে লাথি মারলাম। লোকটা প্রস্তুত ছিলো না, তাই সে ছিটকে পড়লো দূরে। ঐ মুহূর্তে আমি উঠে পড়লাম এবং দ্রুত সরে গেলাম।
একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো ফুল্লরা, বললো সে–তুমি কি তাকে দেখতে পাচ্ছিলে জাভেদ
অন্ধকারে তাকে স্পষ্ট দেখতে পাইনি তবে তার চোখ দুটো ভাটার মত জ্বলছিলো। ঠিক যেন হিংস্র বাঘের চোখ।
তারপর?
ছুটলে ও আবার আমাকে ধরে ফেলতে পারে তাই একটা ঝোঁপের মধ্যে শুয়ে পড়লাম উবু হয়ে। আমি অন্ধকারে কান পেতে আছি,. লোকটার পায়ের শব্দ আমার কানে ভেসে আসছে। শুকনো পাতার উপর খসখস্ আওয়াজ হচ্ছে। বেশ বুঝতে পারলাম লোকটা আমার সন্ধানে অন্যদিকে চলে যাচ্ছে। আমি তখন ঝোঁপটার মধ্য হতে উঠে ছুটতে শুরু করলাম, কারণ লোকটা আবার এখানে ফিরে আসতে পারে। নিরস্ত্র না হলে আমি ওকে পাল্টা আক্রমণ করতাম কিন্তু তার ধারালো নখ আর দাঁত…উঃ! কি সাংঘাতিক, কি ভয়ংকর! সমস্ত রাত ধরে ছুটেছি, একসময় ভোর হয়ে এলো, তখন দেখলাম আমি সাগরতীর হতে বহু দূরে চলে এসেছি। শুধু পর্বতমালা আর জঙ্গল। মাটিতে চাপ চাপ্ সোনা। এখানে যেমন মাটির সঙ্গে সোনা মিশে আছে ওখানে তা নয়। বড় সোনার চাপূ…
সত্যি বলছো জাভেদ!
হা সত্যি।
ফুল্লরা নিভু নিভু অগ্নিকুন্ডটার স্বল্প আলোতে জাভেদের দীপ্ত সুন্দর বলিষ্ঠ মুখমন্ডলের দিকে নির্নিমেষ নয়নে তাকিয়ে মাঝে-মধ্যে প্রশ্ন করছিলো। তার অবচেতন মনে আজ নতুন একটা ভাবের সঞ্চার হয়। এমন করে জাভেদকে সে কোনোদিন কথা বলতে শোনেনি। তাকে সব সময় চঞ্চল আর খেয়ালীই দেখেছে ফুল্লরা। সে যে এতো সুন্দর গুছিয়ে কথা বলতে পারে তা সে জানতো না। জাভেদকে নতুন করে যেন আবিষ্কার করে সে আজ।
ফুল্লরা তাকালো আরফিন হুই এবং তার দলবলের দিকে।
সবাই সেই বন্য মানুষটার পেছনে ছুটাছুটি করে বড় ক্লান্ত অবসন্ন হয়ে পড়েছে। এতে আতংক কষ্টের মধ্যেও অঘোরে ঘুমাচ্ছে সকলে। তারা কম্বলের তলায় কুঁকড়ে আছে শীতের রাতে ডাস্টবীনের পাশে কুকুরগুলোর মত।
