মহিলা নিজ হাতের বস্তুটিকে মুখেরকাছে তুলে ধরে বনহুরকে লক্ষ্য করে ফুদিতে গেলো।
তরুণীদের মধ্য হতে প্রথম তরুণী ছুটে গিয়ে মহিলার পাদু খানা জড়িয়ে ধরলো। তারপর কি যেন বললো।
অন্যান্য তরুণীও একসঙ্গে নানাভাবে কিছু বর্ণনা দিতে লাগলো।
তরুণীদের কথাবার্তা শুনে মহিলার দৃষ্টিতে বিস্ময় ফুটে উঠলো। তার সঙ্গীর চোখেমুখেও পরিলক্ষিত হলো একটা ভয়ার্ত ভাব। ওরা দুজন তখন নিজেরা কিছু বলাবলি করে নিয়ে তাকালো। বনহুরের দিকে। কিছু পূর্বে যে দৃষ্টিতে ছিলো ক্রোধান্বিত ভাব সে দৃষ্টিতে এখন এমন একটা ভাব। পরিলক্ষিত হলো যে দৃষ্টি বনহুরকে করলো আশান্বিত।
মহিলা এবার এগিয়ে এসে বনহুরের দিকে হাত বাড়ালো এবং কিছু বললো।
বনহুর কথাগুলো বুঝতে না পারলেও হাত বাড়িয়ে মহিলার করমর্দন করলো। বিস্ময়ে মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হলো সে। মহিলার হাতখানা তুলোর মত নরম তুলতুলে। বনহুরের কঠিন হাতের উপর কে যেন একখণ্ড নরম মোম রাখলো।
বনহুর বুঝতে পারলে তারা তাকে মেনে নিলো। এবার মহিলা হাতের বস্তুটি অপর এক জনের হাতে দিলো।
এটা কোনো মারাত্মক অস্ত্র তাতে কোনো সন্দেহ নেই। অস্ত্রটি ফুঁ দিয়ে কার্যকরী করা হয়। মহিলাটি বনহুরকে শত্রু মনে করে মারাত্মক অস্ত্ৰদ্বারা হত্যা করতে চেয়েছিলো। যখন সে জানতে পারলো লোকটি শত্রু নয় মিত্র এবং সে একজন তেজোদ্দীপ্ত বীর পুরুষ, তখন মহিলা তার হাতের মারাত্মক অস্ত্র নামিয়ে নিয়ে হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলো বন্ধুত্ব স্থাপনের জন্য।
বনহুর মহিলার অভিনন্দন গ্রহণ করলো।
ওকে নিয়ে গেলো ওরা তাদের বাড়ি বা ঘরের মধ্যে। পাকার সুমিষ্ট ফল এনে খেতে দিলো। বনহুর এত ফল দেখে অবাক হলো।
মহিলাটি বসলো তার পাশে।
অন্যান্য সবাই দাঁড়িয়ে রইলো, এমনকি মহিলার সঙ্গী পুরুষটিও দাঁড়িয়ে রইলো, তাদের পাশে।
মহিলা কিছু বললো।
বনহুর ইংগিতে বোঝাতে চেষ্টা করলো সে কিছু বুঝতে পারছে না।
মহিলা এবং তার সঙ্গের পুরুষটি তরুণীদের লক্ষ্য করে কিছু বললো।
তারা ওদের কথা শুনে বেশ খুশি হয়েছে বলে মনে হলো বনহুরের।
বনহুর নিজে একটি ফল নিলো হাতে এবং সবাইকে ফল খেতে ইংগিতে অনুরোধ জানালো। ওরা সবাই একটি করে ফল তুলে নিলো বনহুরের অনুরোধ রক্ষার্থে।
সবাই মিলে ফল খাওয়ার পর্ব চললো।
এরপর বনহুরকে পানীয় পান করতে দেওয়া হলো। বনহুর ইশারায় বললো, ও সব সে পান করে না। ফলগুলো রাসালো ছিলো। কাজেই পানি পান করার কোনো আগ্রহ ছিল না বনহুরের মধ্যে।
বনহুর এবার ভাবছে কি করা এখন তার উচিত। পরিবেশটা তার কাছে বেশ লাগছে।
হঠাৎ তরুণীগণ চলে গেল তারপর নিজ হাতে একটি অদ্ভুত ধরনের বীণা নিয়ে হাজির হলো। বীণাহাতে সুন্দর করে দাঁড়ালো ওরা।
মহিলা কিছু বললো তরুণীদের লক্ষ্য করে।
এবার তরুণীদল বীণায় ঝংকার তুললো। বড় সুন্দর, বনহুর যেন মোহমুগ্ধ হয়ে পড়লো। এক সময় বীণার ঝংকার থেমে গেলো।
বনহুর সবাইকে মাথা নত করে অভিনন্দন জানালো। জানালো ধন্যবাদ।
মহিলা বনহুর ও তার সঙ্গীকে নিয়ে ঐ পথে এগুলো যে পথ দিয়ে কিছু পূর্বে নদীতীর হতে তরুণীগণসহ বনহুর এসেছিলো।
বনহুর বুঝতে পারলো সেই জীবটাকে তারা দেখতে যাচ্ছে।
মহিলা একটি উঁচু স্থানে দাঁড়ালো।
তারপর মুখের কাছে হাত রেখে একটা অদ্ভুত শব্দ করলো, সঙ্গে সঙ্গে আশেপাশের বাড়িলো হতে বেরিয়ে এলো নারী–পুরুষ, তবে নারীর সংখ্যাই বেশি, পুরুষ নিতান্ত কম।
মহিলাটি এদের লক্ষ্য করে কিছু বললো। বেশ কিছুক্ষণ বর্ণনা দিলো জীবটার এবং বনহুরকে পাশে নিয়ে দেখলো।
যে জনগণ নারী–পুরুষ এসে ভিড় জমিয়েছিলো তারা সবাই বনহুরকে লক্ষ্য করে অভিবাদন জানালো।
বনহুর নিজেও হাত নেড়ে তাদের অভিবাদন গ্রহণ করলো।
এরপর তারা বনহুর সহ নদীতীরে এসে জীবটাকে দেখে অবাক হলো।
মৃত জীবটার পাশে যাওয়ার সাহস তাদের হচ্ছিলো না। ওরা নিজেরা কিছু বলাবলি করছিলো, চোখেমুখে বিস্ময় এবং ভায়ার্ত ভাব ফুটে উঠেছে। বারবার কৃতজ্ঞাতপূর্ণ দৃষ্টি নিয়ে তাকাচ্ছে ওরা বনহুরের দিকে।
বনহুর এবার মৃত জন্তুটার কাছে গেলো এবং হাত দিয়ে স্পর্শ করে দেখালো সে আর আক্রমণ চালাতে পারবে না।
এবার মহিলা এবং তার সঙ্গী এসে জীবটার দেহ স্পর্শ করলো।
সঙ্গে সঙ্গে ওরা দুজন আনন্দসূচক প্রতিধ্বনি করলো। এবার অন্যান্য সবাই এসে মৃত জীবটাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে স্পর্শ করে দেখতে লাগলো এবং নানা ধরনের আলোচনা করতে লাগলো।
সবাই এরপর বনহুরকে ঘিরে এক অদ্ভুত ধরনের অভিনন্দন বুঝি পৃথিবীর মানুষ করতে জানে না। এরা বড় সরল সহজ, এদের কণ্ঠস্বর মধুর। দেহের গঠন অত্যন্ত সুঠাম, অপূর্ব।
বনহুরকে এরা সমাদরে আপ্যায়ন করলো।
ফলমূল ছাড়া এরা অন্য কোনো খাদ্য খায় না। পানীয় পান করে এরা সর্বক্ষণ। জমিতে ফলমূল জন্মে, ফল খায়। রান্নার কোনো হাঙ্গামা আছে বলে মনে হলো না বনহুরের।
ওরা নারী–পুরুষ সবাই বনহুরকে দেবদূত বলে মনে করছে। পূজা করছে ওরা ফুল দিয়ে, দেবতাকে যেমন করে ওরা পূজা করে। নতুন পরিচ্ছেদে বনহুরকে ওরা সজ্জিত করেছে।
অবাক হয় না বনহুর, কারণ ওরা পৃথিবীর মানুষ নয়, ওরা অস্বাভাবিক মানুষ। ওদের মধ্যেও শিক্ষা আছে কিন্তু আমাদের মত বই খাতা কলম নিয়ে নয়, ওরা শিক্ষা লাভ করে হাতে নাতে।
