বনহুরের সঙ্গে জীবটা পেরে উঠলো না। ছুরিখানা এসে তার কণ্ঠনালীতে বিদ্ধ হয়েছে, তারপর বনহুরের মত শক্তিশালীর কবলে জীবটা হিমসিম খেয়ে গেছে। শেষ পর্যন্ত জীবটা মুখ থুবড়ে পড়ে গেলো।
তরুণীরা আশ্চর্য দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়েছিলো বনহুরের দিকে।
জীবটা পড়ে যেতেই বনহুর সোজা হয়ে দাঁড়ালো। তারপর একটা হাত দিয়ে ছোরাখানা তুলে নিয়ে অপর হাতে ছোরার বাটে চাপ দিলো, সঙ্গে সঙ্গে ছোরাখানা বাটের মধ্যে প্রবেশ করলো।
এবার বনহুর ছোরাখানা পকেটে রেখে ফিরে তাকালো তরুণীদের দিকে।
বাম হাতের পিঠে কপালের ঘাম মুছে ফেললো সে।
তরুণীরা ভয়ভীতি আর বিস্ময় নিয়ে তাকাচ্ছে। এতবড় একটা ভয়ঙ্কর জীবকে পরাজিত করেছে যে সে কম নয়, হয়তো বা কোনো দেবদূত হবে মনে করে ওরা।
বনহুরের পোশাকও ওদের কাছে আশ্চর্যজনক মনে হচ্ছে। এমন পোশাক তারা দেখেনি কোনোদিন।
বনহুর এগুতেই ওরা দৌড়ে পালাতে গেলো।
বনহুর ডাকলো।
ওরা কেউ কেউ ফিরে তাকালো বটে কিন্তু আবার সোজা হয়ে দৌড়ে পালাতে লাগলো।
এবার বনহুর শুধু হাতের ইশারা করে ডাকলো।
ওরা থেমে পড়লো।
আর না এগিয়ে ভীত দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে দেখতে লাগলো।
বনহুর যেমন স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো তেমনি দাঁড়িয়ে থেকে হাতের ইশারায় কাছে ডাকলো। একবার দুবার তিনবার। তরুণীদের মধ্য হতে একজন এগিয়ে এলো। অবশ্য তার চোখেমুখে একটা ভীতিভার পরিলক্ষিত হচ্ছিলো।
বনহুর হেসে বললো–আমাকে তোমাদের কোনো ভয় নেই….মুখে কথা বললো এবং হাতের ইংগিতে বোঝাতে চেষ্টা করলো।
তরুণীটি বনহুরের কথা বুঝলো না।
সে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে কয়েক পা এগিয়ে এলো।
বনহুর হেসে বললো–এসো কোনো ভয় নেই। দুটি হাত বাড়িয়ে দিলো।
এবার তরুণী বিনা দ্বিধায় এগিয়ে এলো।
অন্যান্য তরুণীও এগুলো এবার।
তরুণীর মধ্য হতে একজন কিছু বললো।
অন্যান্য তরুণীর মুখেচোখে ফুটে উঠলো কৃতজ্ঞতাপূর্ণ ভাব।
বনহুর বুঝলো মেয়েটি সবার হয়ে তাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছে। এই বিপদ থেকে তাদেরকে উদ্ধার করার জন্য। বনহুর হাসলো একটু।
তরুণীরা কি যেন নিজেরা বলাবলি করলো।
একজন কিছু বললো।
বনহুর কথা না বুঝলেও এটুকু বুঝলো তারা তাকে সাদর অভ্যর্থনা জানাচ্ছে। বারবার আংগুল দিয়ে ঐ ভয়ংকর মৃত জীবটাকে দেখাচ্ছে।
একটু একটু করে অতি নিকটে এসে পড়লো ওরা। বনহুরের পাশে ঘনিষ্ঠ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রথমা তরুণীর মধ্যে তেমন কোনো দ্বিধা ছিলো না। সে স্বচ্ছ ভাবে বনহুরকে অভিনন্দন জানাচ্ছে। এবার বনহুরকে সঙ্গে করে নিয়ে চললো ওরা।
শুভ্র বসনে দেবীমূর্তির মতই মনে হচ্ছিলো তরুণীগণকে। পৃথিবীর নারীদের চেয়ে এরা অনেক বেশি সুন্দরী। রেশমের মত রাশিকৃত সোনালী চুল, ডাগর ডাগর দুটি চোখ কালো কালো ভ্রুজোড়া, দেহের রং ফিকে গোলাপী। অপূর্ব বলা যায়।
সূর্যের প্রখরতা নেই বলেই মঙ্গল গ্রহের বৃক্ষলতাগুলো এবং মানুষের রঙের মধ্যে নেই কোনো উগ্রতা। স্নিগ্ধ এবং লাবণ্যভরা সব কিছু।
বনহুরের বড় ভাল লাগে সবকিছু।
এগিয়ে চলেছে বনহুর।
পাশে পাশে এগিয়ে যাচ্ছে ওরা।
সবাই ওরা বনহুরকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিলো। ওদের কাছেও বনহুর এক বিস্ময়, কারণ মঙ্গল গ্রহের পুরুষগণও কতকটা মহিলাদের মতই নরম সরম, আরও একটি অদ্ভুত ব্যাপার লক্ষ্য করেছে বনহুর, মঙ্গল গ্রহের পুরুষদের দাড়িগোফ সব হাল্কা রেশমের মত, কতকটা মেয়েলি ধরণ বলা যায়।
বনহুরকে ওরা অবাক চোখে দেখছে। কিন্তু বলতে চেষ্টা করছে ওরা, বনহুরও বলতে চাইছে কিন্তু কেউ কারও ভাষা বোঝে না, কাজেই মহামুস্কিল হলো।
বনহুর বলতে চাইছে আমাকে তোমরা নিয়ে যাচ্ছে কিন্তু কোনো বিপদে পড়বে না তোর তোমাদের অভিভাবকগণ আমাকে সাদরে গ্রহণ করতে পারবেন তো? কিন্তু হায়রে ভাগ্য, একটি বর্ণও যদি ওরা বুঝতো। শেষ পর্যন্ত অনেকদূর এগুনোর পর বেশ কিছু অদ্ভুত ধরনের বাড়ি নজরে পড়লো।
শুধু পাথরের খণ্ড জোড়া লাগিয়ে অট্টালিকা তৈরি করা হয়েছে। বনহুর বেশ বুঝলো পূর্বে যে স্থানে সে পৌঁছেছিলো, এ স্থান সে স্থান নয়। পূর্বের স্থান ছিলো বিরাট একটি প্রাসাদ। সে রাজপ্রাসাদেই আছে দিপালী, বনহুরের সব কথা আজ নতুন করে মনে পড়ছে। পথে আজ যে পাথরগুলো ছড়িয়ে আছে, সে পাথরগুলোর মতই বহু পাথর দিপালী আঁচলে কুড়িয়ে সংগ্রহ করেছিলো।
সত্যই পাথরগুলো মূল্যবান তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
পৃথিবীর বুকে এমন ধরনের পাথর কোনোদিন দৃষ্টিগোচর হয় না, বিশেষ করে পথে–ঘাটে তো নয়ই।
বনহুর নানা ধরনের চিন্তায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলো। হঠাৎ তার চিন্তাজাল ছিন্ন হয়ে গেলো।
তরুণীরা এসে হাজির হলো একটি বাড়ির উঠানে। একজন তাকে ডাকলো একটা শব্দ করে।
তখনই ভিতর থেকে বেরিয়ে এলো এক মহিলা। তার সমস্ত শরীরে শুভ্র ড্রেস। তার পেছনে একটি পুরুষ।
মহিলার মাথায় অদ্ভুত ধরনের মুকুট।
দক্ষিণ হাতে একটি বিস্ময়কর বস্তু।
তরুণীগণ মহিলাকে লক্ষ্য করে নত হয়ে কুর্ণিশ জানালো তার হাত দুখানা তারা দুপাশে ঝুলিয়ে রাখলো, শুধু মাথাটাই নত করলো মাত্র।
মহিলা তরুণীদের সঙ্গে অদ্ভুত একটি লোককে দেখে অবাক হলো এবং রাগান্বিত হলো। সে এবং তার সঙ্গী পুরুষটি রাগান্বিত দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো।
বনহুর কুর্ণিশ জানালো তরুণীদের মত করে।
