বনহুর স্পষ্ট দেখতে না পেলেও আবছা আবছা নজরে পড়ছে। যানটি সেই গোলাকার বস্তুটি লক্ষ্য করে এগুচ্ছে। মাত্র কয়েক সেকেণ্ড, গোলাকার বস্তুটি ক্রমেই দৃষ্টির অগোচরে মিশে যাচ্ছে।
বনহুর বুঝতে পারলো গোলাকার বস্তুটি আসলে কোনো বস্তু নয় একটি গ্রহ। তবে কি এটাই মঙ্গল গ্রহ।
পৃথিবীর মানুষ এখনও সন্দিহান, অন্য কোনো গ্রহে মানুষ বসবাস করে কিনা। কিন্তু বনহুর জানে মঙ্গল গ্রহে পৃথিবীর মতই নদী–নালা–পাহাড়–পর্বত–বন-জঙ্গল এবং জীব–জন্তু আছে, তবে পৃথিবীর বস্তুর রূপ আলাদা মঙ্গল গ্রহের বস্তু সমূহের রূপ আলাদা।
বনহুর নিজে এসব পরিদর্শন করেছে, কাজেই সে জানে মঙ্গল গ্রহেও এদের মত মানুষ বাস করে।
পৃথিবীর মানুষ চাঁদে গিয়েছে, এখনও অন্য কোনো গ্রহে তারা যেতে পারেনি, হয়তো একদিন পারবে, তখন জানবে পৃথিবীর মানুষের চেয়ে তারা কোনো অংশে কম নয়। যে যানটিতে এ মূহুর্তে বনহুর অবস্থান করছে তা অতি বুদ্ধিদীপ্ত ব্যক্তির চিন্তাধারার ফসল। তা হলে মঙ্গল গ্রহে বৈজ্ঞানিক, ইঞ্জিনীয়ার, ডাক্তার সব আছে।
বনহুরের চিন্তাধারা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। যানটি সেই গোলাকার রৌপ্য বস্তুটার মধ্যে প্রবেশ করেছে। এখন যানটি অতি ধীরে ধীরে এগুচ্ছে বলে মনে হলো বনহুরের। যানটি যেন হাওয়ায় ভেসে ভেসে এগুচ্ছে।
বনহুর এবার দেখলো যানটি অতি লঘুভাবে এসে নেমে পড়লো। ওরা তিনজন দরজা খুলে নেমে পড়লো আলগোছে।
বনহুর এবার বেরিয়ে পড়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে নিলো।
ওরা তিনজন যানটি থেকে নেমে যেতেই বনহুর যানের ভিতর থেকে লক্ষ্য করলো আশেপাশে কেউ নেই।
কি ভাবে ওরা যানের দরজা খুলে বেরিয়ে গেলো লক্ষ্য করেছিলো বনহুর। এবার ওরা তিনজন নেমে যেতেই সে নেমে পড়লো দ্রুতগতিতে।
এ সেই দেশ যে দেশে সে একবার এসেছিলো।
মঙ্গল গ্রহ।
সেই বেগুনী রঙের সমারোহ। সেই গাছপালা ফল লতা সব বেগুনী রং। সোনালী আবছা আলো। চারদিকে মূল্যবান পাথরের স্তূপ। ঝোঁপঝাড়ও আছে, টিলাও আছে।
বনহুর তাড়াতাড়ি একটা উঁচু অদ্ভুত পোশাক পরা টিলার পাশে আত্মগোপন করলো। কারণ ঐ তিন ব্যক্তির সঙ্গে আরও দুজন নারী এগিয়ে এলো যানটির দিকে।
ওরা যানটার দরজা খুলে ভিতরে প্রবেশ করলো এবং বের করে আনলো পৃথিবী থেকে আনা ডালপালাগুলো। মঙ্গল গ্রহের গাছপালার রং আর পৃথিবীর গাছপালার রং সম্পূর্ণ আলাদা। বেগুনী রঙের গাছপালার সঙ্গে সবুজ রঙের ডালগুলো বিষয় নিয়ে গভীরভাবে ওদের আলোচনা চললো, তারপর ওরা যানটির পাশ থেকে চলে গেলো সবাই মিলে।
এবার বনহুর আড়াল থেকে বেরিয়ে পড়লো। বারবার মনে পড়ছে দিপালীর কথা। সে কেমন আছে কোথায় আছে কে জানে। দিপালীর মুখখানাই মনের পর্দায় ভেসে উঠছে কিন্তু কোথায় আছে দিপালী কে জাণে।
বনহুর ঝোঁপঝাড় আর টিলার আড়ালে আত্মগোপন করে এগিয়ে চললো।
বিরাট প্রান্তর।
শুধু ছোটবড় পাথুরিয়া টিলা।
মাঝে মাঝে ঝকঝকে পাথর স্তূপ। ঝাপসা আলো স্নিগ্ধতায় ভরপুর। সূর্যের প্রখরতা এখানে নেই। যেন স্বপ্নপুরী বা স্বপ্নের দেশ।
বনহুর অবাক হয়ে দেখছে।
একটি ফলের গাছ হতে কয়েকটি ফল পেড়ে নিয়ে খেলো সে।
মুগ্ধ নয়নে বনহুর সব দেখছিলো।
তার শরীরে কোট প্যান্ট–টাই পায়ে বুট। পৃথিবীর স্বাভাবিক পোশাকে সজ্জিত রয়েছে এখনও সে। প্যারাসুট নিয়ে লাফিয়ে পড়লেও তার পোশাকের কোনো ক্ষতি সাধিত হয়নি। তবে কিছুটা ধূলোবালি লেগে গিয়েছিলো তার পোশাকে।
বনহুরকে অজানা দেশে দেবদূত বলে মনে হচ্ছিলো। তার মুখমণ্ডলে অপূর্ব এক ভাবের উন্মেষ।
অপূর্ব স্বাদ ফলগুলোর।
তৃপ্তি সহকারে বনহুর খেয়ে নিলো।
এবার বড় প্রফুল্ল লাগছে নিজেকে।
বনহুর এগুলো।
নিজকে সে হাল্কা মনে করছে। একটুও কষ্ট লাগছে না। সীমাহীন শক্তি তার শরীরটাকে সতেজ করে তুললো। বনহুর খুঁজে ফিরছে দিপালীকে। প্রান্তর পেরিয়ে একটা পাহাড়, বনহুর পাহাড়টার তলদেশে এসে দাঁড়ালো।
পাহাড়ের গায়ে ছোটবড় বেগুনী রঙের গাছপালা, বড় সুন্দর বড় মনোরম অপূর্ব এক জগৎ যেন এটা।
বনহুর এগিয়ে চলেছে।
হঠাৎ তার কানে এলো অদ্ভুত কণ্ঠস্বরের প্রতিধ্বনি।
একটি নারীকণ্ঠের ভায়ার্ত আর্তনাদ।
বনহুর দ্রুত পাহাড় বেয়ে উপরে উঠে গেলো। উপরে উঠে তাকালো সে নিচের দিকে দেখলো একটা নদী তার পাশে বেগুনী ফসলের ক্ষেত। কয়েকজন তরুণী শুভ্র বসনে সজ্জিত হয়ে ঐ ক্ষেতের পাশে ঘুরে বেড়াচ্ছিলো। ঠিক ঐ মুহূর্তে একটা অদ্ভুত ধরনের ভয়ংকর জীব নদীবক্ষ থেকে উঠে এসেছে এবং আক্রমণ করেছে আচম্বিতে।
জীবটা ভীষণ আকার।
কতটা জলহস্তীর মত দেখতে।
তরুণীদল যতই এলোেমলোভাবে দৌড়াচ্ছে ততই জীবটা তেড়ে আসছে তাদের আক্রমণ করতে। এই ধরে ফেলে আর কি।
বনহুর এক মুহূর্ত বিলম্ব না করে পাহাড় থেকে দ্রুত নেমে এলো এবং ক্ষিপ্রহস্তে জীবটাকে ধরে ফেললো। বনহুরের পকেটে ছিলো একটা সূতীক্ষ্ণধার ছোরা। বনহুর ওকে জাপটে ধরবার পূর্বে ছোরাখানা বের করে বাটে চাপ দিলো, সঙ্গে সঙ্গে ছোরাখানা বের হয়ে এলো বাটের ভিতর থেকে।
জীবটাকে ধরে ফেলার সঙ্গে সঙ্গে বনহুর ছোরাখানা সমূলে বিদ্ধ করে দিলো জীবটার কণ্ঠনালীতে। শুরু হলো বনহুরের সঙ্গে জীবটার ভীষণ ধ্বস্তাধ্বস্তি।
তরুণীদল হতবুদ্ধি হয়ে তাকিয়ে রয়েছে। তারা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েছে। দুচোখে তাদের বিস্ময়, কে এই মহাপুরুষ হয়তো ভাবছে ওরা মনে মনে।
