কখন যে বনহুর গভীর ন্দ্রিায় অচেতন হয়ে পড়েছে খেয়াল নেই তার।
হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলো।
বনহুর চোখ মেলতেই একটা দীপ্ত উজ্জ্বল আলো তার নজরে পড়লো।
চোখ রগড়ে উঠে বসলো বনহুর।
ভাল করে তাকালো সে।
দেখলো পাহাড়গুলোর অদূরে জঙ্গলের পাশে একটা আলোকরশি ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। একটা অদ্ভুত শব্দও হচ্ছে শো শো করে। ভালভাবে লক্ষ্য করতেই বুঝতে পারলো, এ ধরনের যান সে মঙ্গল গ্রহে দেখেছিলো।
বিস্ময় আরও বাড়লো বনহুরের।
তবে কি মঙ্গল গ্রহ থেকে যানটা নেমে এসেছে। আরও আশ্চর্য হলো বনহুর যানের দরজা খুলে গেলো। একটা সিঁড়ি আকার বস্তু নেমে এলো যানের মধ্যে হতে। সেই সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলো তিনজন লোক।
চিনতে বাকি রইলো না বনহুরের। সেই অদ্ভুত পোশাক। এই পোশাকে মঙ্গল গ্রহে সে বহু লোক দেখেছিলো। একটা অভূতপূর্ব নেশা বনহুরকে উত্তেজিত করে তোলে। তার চোখের নিদ্রা ছুটে যায়, আলগোছে লুকিয়ে পড়ে।
তিনজন লোক ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে। ওদের চলার ভঙ্গী কেমন যেন অদ্ভুত ধরনের।
বনহুর আড়ালে আত্মগোপন করে দেখতে লাগলো।
ওরা তিনজন অনেক এগিয়ে আসছে।
কেমন যেন শূন্যে ভেসে ভেসে এগুচ্ছে ওরা।
প্রায় বনের কাছাকাছি এসে পড়লো। ওরা নিকটবর্তী হতেই বনহুর শুনতে পেলো কথা বলছে তিনজন। অদ্ভুত ওদের ভাষা। বনহুর কিছু বুঝতে পারছে না।
ওরা তিনজন কি উদ্দেশ্য নিয়ে বনের দিকে এগুচ্ছে ঠিক বুঝতে পারছে না বনহুর। সে ভালভাবে শুধু লক্ষ্য করে চলেছে। তিনজনের হাতেই ধারালো অস্ত্র বা ঐ ধরনের কিছু হবে।
আলোকরশ্মিতে বনভূমির বেশ কিছু অংশ আলোকিত হয়ে উঠেছে। সব স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। বনহুর ভাল করে লক্ষ্য করছে ওরা একেবারে বনের ভিতরে প্রবেশ করলো।
এবার বনহুর মুহূর্তে চিন্তা করে নিলো, তার চোখের সামনে ভেসে উঠলো একখানা করুণ। অসহায় মুখ, সে মুখ অন্য কারও নয়–দিপালীর…
না জানি দিপালী মঙ্গল গ্রহে কেমন আছে।
জীবিত আছে না মৃত্যু ঘটেছে কে জানে।
বনহুর তাকিয়ে দেখলো, ওদের মোটেই দেখা যাচ্ছে না। এবার বনহুর দ্রুত আড়াল থেকে বেরিয়ে ঐ আলোক–স্তম্ভটির দিকে দৌড়ে গেলো।
আলোকরশ্মির উজ্জ্বল নীলাভো আলোকচ্ছটায় চারিদিক টলমল করছে।
আলোকস্তম্ভ বা যানটা থেকে যে সিঁড়ি ঝুলছিলো বনহুর সেই সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেলো উপরে।
অদ্ভূত সে যানটা।
বনহুর তাড়াতাড়ি একটা তাকের পেছনে লুকিয়ে পড়লো! বসবার মত বেশ একটু ফাঁকা ছিলো, তাই ফাঁকটাকে বনহুর তার অবলম্বন হিসেবে গ্রহণ করলো।
মাত্র কয়েক মিনিট, ফিরে এলো ওরা তিনজন। বনহুর লক্ষ্য করলো ওদের হাতে কিছু গাছের ডাল রয়েছে। সে বুঝতে পারলো ওরা কোনো গবেষণার জন্য পৃথিবীর বুকে নেমে এসেছে। সবুজ ডালপালা নিয়ে হয়তো কোনো পরীক্ষা নিরীক্ষা চালাবে।
যে স্থানে বনহুর বসেছিলো ঐ স্থানেই ওরা ডালগুলো রেখে দিলো।
ভাগ্য বলতে হবে তারা কেউ বনহুরকে লক্ষ্য করলো না। আর লক্ষ্যই বা করবে কেন তাদের মতে তো কোনো সন্দেহ নেই, যে এই নির্জন স্থানে কেউ আসতে পারে।
একজন চালকের আসনে বসলো।
একটি খোলসে আবৃত করলো নিজের দেহটা।
একটা সুইচ টিপলো লোকটা।
তার পূর্বে কিছু কথাবার্তা হলো ওদের মধ্যে।
তার একবর্ণও বুঝতে পারলো না বনহুর, কারণ সে ভাষা ইংরেজি, ফার্সি, উর্দু, জাপানী বা বাংলা এসব কোনো ভাষার একটিও নয় নতুন এক ভাষা।
বনহুর অবশ্য এ ভাষার সঙ্গে পরিচিত কিছুটা রয়েছে, কারণ মঙ্গল গ্রহে সে একবার ভাগ্যক্রমে গিয়েছিলো এবং সেখানে সে বেশ কিছু দিন অবস্থান করেছিলো। কথাবার্তা কিছুটা অনুধাবন করলো কিন্তু বুঝতে পারলো না।
এরা মঙ্গল গ্রহ থেকে না অন্য কোনো গ্রহ থেকে এসেছে তারও কোনো হদিস নেই তবে এ ধরনের যান সে মঙ্গল গ্রহে দেখেছিলো।
বনহুরের স্মৃতির আকাশে সব ভেসে বেড়াচ্ছে, তবে কি এই যানটি মঙ্গল গ্রহ থেকে অবতরণ করেছে? হয়তো আবার বনহুর দেখা পাবে দিপালীর। না জানি সে এতদিনে কেমন অবস্থায় আছে।
একটি ঝাঁকুনি লাগতেই বনহুরের চিন্তাজাল বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলো। যানটির আলো নিভে গেছে, শুধু পেছনে একটি আলোর রেখা ছুটে চলেছে। উল্কাবেগে ছুটে চলেছে যানটি।
এক নিমেষে পৃথিবী ছেড়ে হাজার হাজার মাইল অতিক্রম করে যানটি উপরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সব অস্পষ্ট লাগছে ভিতর থেকে।
বনহুর তার হাতঘড়িটার দিকে তাকিয়ে দেখে নিলো।
রাত তখন বারোটা বেজে গেছে।
অন্ধকারেও বনহুরের ঘড়িটা সময় সংকেত জানালো। একটা আশার আলো বনহুরের মনে বিপুল নাড়া দিচ্ছে। সত্যিই সে নতুন এক জগৎ আবিস্কারে চলেছে। এর পরিণতি কি দাঁড়াবে, কি তার ভাগ্যে ঘটবে সেদিকে বনহুরের খেয়াল নেই, কোনোদিন ছিলোও না। নির্ভীক বনহুর, সব সময় বিপদকে আলিঙ্গন করাই তার নেশা।
কত কি ভাবছে বনহুর।
আর যদি ফিরতে না পারে তাহলে তার আস্তানা, তার অনুচরগণ, মনিরা, নূর….জাভেদ, নূরী সব মুখ ছাপিয়ে একটি মুখ স্পষ্ট হয়ে মনে পড়লো–তার আম্মা, তার স্নেহময়ী জননীর মুখ….
ঝাপসা হয়ে এলো বনহুরের চোখ দুটো।
কিন্তু সব চিন্তা মুহূর্তের জন্য।
তখনই সেসব চিন্তা ঝেড়ে ফেলে সজাগ হয়ে উঠলো।
চারদিকে নক্ষত্রের মেলা।
অপূর্ব এক রাজ্যে যেন তারা এসে পড়েছে।
নীল শুধু নীল এ রাজ্য।
যানটি এতক্ষণ সোজা খাড়াভাবে সা সা করে এগুচ্ছিলো, আবার ধীরে ধীরে কাত হয়ে গেলো। সামনে একটি গোলাকার রৌপ্য বস্তু পরিলক্ষিত হলো।
