বিমানখানা তখনও আরাকান জঙ্গলের উপর দিয়ে উড়ে চলেছে। আরাকান বিমান বন্দরে অবতরণ করবার উদ্দেশ্যেই বিমানখানা এগুচ্ছে এবার।
বনহুর বুঝতে পারে এবং অতি সতর্কতার সঙ্গে লক্ষ্য করতে থাকে নিচের দিকে।
এবার বিমানখানা সমদ্রের উপর দিয়ে উড়ে চললো। বনহুর ছোট্ট একটা কাগজ বের করে কিছু লিখলো, তারপর আশার হাতে গুঁজে দিলো সকলের অলক্ষ্যে।
আশা পড়লো হাতের মুঠায় আড়াল করে।
বনহুর লিখেছে–আশা, তুমি ফিরে যাও। আমাকে এই সমুদ্রবক্ষে আশ্রয় নিতে হবে।
— বনহুর।
আশার চোখ দুটো ছলছল হয়ে উঠলো। সে নিজকে অতি কষ্টে সংযত রেখে তাকালো বনহুরের মুখের দিকে।
দৃষ্টি বিনিময়ে বিদায় সম্ভাষণ জানালো আশা তাকে।
বনহুর উঠে এগিয়ে গেলো প্লেনের সম্মুখ ভাগে।
পাইলটের আসনের পাশে এসে দাঁড়ালো বনহুর। রিভলভার চেপে ধরলো পাইলটের পাঁজরে, চাপাকণ্ঠে বললো–একটুও নড়বে না, তাহলে প্লেনসহ সমুদ্রবক্ষে নিক্ষিপ্ত হবে।
পাইলট হকচকিয়ে গেলেও সে একেবারে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হলো না, কারণ এমন ধরনের একটা অবস্থার জন্য প্রস্তুত ছিলো সে। তার সহকারী পাইলটগণ বেশ ঘাবড়ে গেলো, তারাও নির্বাক। বিমানচালক এখন রিভলভারের মুখে, কাজেই নিশ্চুপ থাকা ছাড়া কোনো উপায় নেই।
বনহুর একটানে একটা প্যারাসুট বের করে নিলো, তারপর মুহূর্ত বিলম্ব না করে লাফিয়ে পড়লো প্লেনের সামনের দরজা দিয়ে। এ দরজা দিয়ে বিমান চালকগণ বিমানে আরোহন এবং অবতরণ করে থাকেন।
এত দ্রুত কাজ করলো বনহুর যে বিমানের যাত্রীগণ মোটেই টের পেলো না।
বনহুর যখন নিজ আসন থেকে উঠে যাচ্ছিলো তখনও কারও মনে সন্দেহ জাগেনি যে, ঐ ব্যক্তিই দস্যু বনহুর। কারণ যাত্রীগণ বনহুকে এক ভীষণ চেহারার মানুষ বলে মনে করেছিলেন এবং সেজন্যই বিমান চালকের পাশে পৌঁছতে বনহুরের কোনো অসুবিধা হয়নি।
যে মুহূর্তে বনহুর পাইলটের পাশের থাক থেকে প্যারাসুট টেনে নিয়ে শূন্যে লাফিয়ে পড়েছিলো, ঐ মুহূর্তে প্লেনখানা হঠাৎ কাৎ হয়ে যায়। পাইলট কৌশলে সামলে নেয় এবং তখনই মাইক্রোফোনে জানিয়ে দেয় দস্যু বনহুর সমুদ্রবক্ষে লাফিয়ে পড়েছে, আপনারা এখন নিশ্চিন্ত…. বিপদ কেটে গেছে….আমরা অল্পক্ষণের মধ্যেই আরাকান বিমান বন্দরে অবতরণ করতে সক্ষম হবো।
বনহুর ততক্ষণে প্যারাসুট নিয়ে আকাশপথে শূন্যে নেমে আসছে। নিচে সমুদ্রের গর্জন, উপরে সীমাহীন আকাশ।
চেষ্টা করছে বনহুর তীরের দিকে নামতে।
ভাগ্য ভাল বলতে হবে প্যারাসুট বনহুরকে নিয়ে ভেসে চললো। সমুদ্রে তখন ভীষণ আলোড়ন ছিলো, কাজেই দমকা হাওয়া বইছিলো অত্যন্ত জোরে। প্যারাসুট হাওয়ায় ভেসে এগুতে লাগলো।
তারপর প্যারাসুটখানা বনহুরকে নিয়ে একেবারে সমুদ্রের কিনারায় নামিয়ে দিলো। ধূ ধূ বালুকারাশি আর থৈ থৈ জলোচ্ছাস।
সমুদ্রের গর্জন আর ঝড়ো হাওয়া।
প্যারাসুট বনহুরকে বেশ কিছুটা টেনে নিয়ে চললো বালুর মধ্য দিয়ে।
হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো বনহুর।
সমুদ্রের ভীষণ উত্তাল ঢেউগুলোর দিকে তাকিয়ে বনহুর আল্লাহর নিকট শুকরিয়া করলো। ঐ ঢেউগুলো তাকে গ্রাস করতো।
প্যারাসুটখানা একস্থানে গুটিয়ে রেখে সে অগ্রসর হলো।
মাথার উপর সুর্যের প্রচণ্ড তাপ আগুন ছড়াচ্ছে। বনহুরের সুন্দর মুখমণ্ডল রক্তাভ হয়ে উঠলো। আশেপাশে কোনো বৃক্ষ বা তরুছায়া নেই।
বনহুর লক্ষ্য করলো দূরে বহু দূরে কালো রেখার মত লাগছে। হয়তো বা বনজঙ্গল অথবা গ্রামাঞ্চল হবে। যেমন করেই হোক, ঐ কালো রেখার মত স্থানে পৌঁছতে হবে।
এখন যদিও ক্ষুধা-পিপাসা নেই কিন্তু এক সময় এমন অবস্থা হবে তখন ক্ষুধা-পিপাসায় কাতর হয়ে পড়বে সে। সীমাহীন বালুকারাশি ছাড়া আর কিছুই নজরে পড়ছে না, কাজেই সে এগিয়ে চললো ঐ কালো রেখা লক্ষ্য করে।
পথ যেন শেষ হতে চায় না।
বনহুর চলেছে তো চলেছেই। ক্লান্ত অবসন্ন হয়ে আসে তার পা দুখানা।
বেলা পড়ে যায়।
সন্ধ্যার হিমেল হাওয়া বইতে শুরু করে।
সমুদ্রের গর্জন ক্ষীণ হয়ে এসেছে, কারণ সমুদ্র ছেড়ে বহুদূর এসে গেছে বনহুর।
কালো রেখাটা আরও স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
এবার বনহুর বুঝতে পারে কালো রেখাটা কোনো শহর বন্দর নগর বা গ্রামাঞ্চল নয়, বন জঙ্গলে ভরা ছোট ছোট পাহাড় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।
বনহুর যতটুকু জোরে সম্ভব পা চালালো।
সন্ধ্যার পূর্বে তাকে ঐ বনজঙ্গলে ঢাকা জায়গায় গিয়ে আশ্রয় নিতে হবে। নইলে দারুন শীতে তার দেহটা জমে বরফ হয়ে যাবে।
ভাবে বনহুর, এতক্ষণ আশা কান্দাই না পৌঁছলেও ঝাম বিমান বন্দরে পৌঁছে গেছে। নিশ্চয়ই সে তার নিজের বাসস্থানে ফিরে যেতে পারবে। আশা আজ দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেয়েছে। তাকে আর কোনো অসুবিধা পোহাতে হবে না। দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে বনহুরের বুক চিরে। আশার ব্যাপারে বনহুর নিশ্চিন্ত।
প্রায় এসে গেছে বনহুর।
কারো রেখা এখন ছোট বড় পাহাড়ে রূপ নিয়েছে। অনেক ঘন বন জঙ্গল ভরা পাহাড়গুলো।
বনহুর যখন পাহাড়ের কোলে এসে পৌঁছলো তখন সন্ধ্যার অন্ধকার জমাট বেঁধে উঠেছে।
ক্ষুধা-পিপাসাও বোধ করছে বনহুর ভালভাবে। কিন্তু কোনো উপায় নেই। একটা পাহাড়ের কোল ঘেষে বনহুর বসলো।
রাত বাড়ছে।
ক্লান্তি আর অবসাদে চোখ দুটো বন্ধ হয়ে আসছে তার। কিন্তু প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় হাত পা কুকড়ে আসছে যেন। বনহুরের শরীরে কোট প্যান্ট টাই পরা থাকায় একটু রক্ষা। হাতখানা মাথার তলায় দিয়ে শুয়ে রইলো বনহুর চোখ বন্ধ করে।
