কিন্তু…. হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে মিঃ আরমান বললেন–বিমান তো সাতটা দশে বিমান বন্দর ত্যাগ করবে এখন সাড়ে ছটা বাজে। আশা মানে আপনার বান্ধবী রয়েছেন হোটেলে, তাকে আনতে হবে।
না, তাকে আনতে হবে না, সে বিমান বন্দরে চলে গেছে। আমিই তাকে বলেছিলাম ঠিক সময়মত বিমান বন্দরে উপস্থিত থাকার জন্য।
আশ্চর্য মানুষ আপনি। সত্যি আপনাকে যত দেখছি ততই বিস্মিত হচ্ছি। আপনি বিমানের টিকেট করবার পূর্বে কি বুঝতে পেরেছিলেন এই সময়ের মধ্যে কাজ সমাধা করতে সক্ষম হবেন।
হাঁ, আমি জানতাম এবং আমার ভরসা ছিলো এই সময়ের মধ্যেই আমি কাজ শেষ করতে পারবো। অবশ্য আমাকে সময়ের দিকে লক্ষ্য রেখে কাজ করতে হয়েছে।
আশ্চর্য! ড্রাইভ করতে করতে শব্দটা উচ্চারণ করলেন মিঃ আরমান।
আলী বললো–আশ্চর্য হবার কোনো কারণ নেই। মানুষের যা করণীয় আমি তাই করেছি বা করছি। আশাকে বলেছি মিঃ আরমানের সঙ্গে দেখা হবে বিমান বন্দরে, কাজেই আশাকে আপনি বিদায় সম্ভাষণ জানাতেও পারছেন।
আর আমার বলবার কিছু নেই। বন্ধু বলে আমার কক্ষে আশ্রয় নিয়েছিলেন। প্রথমে আমি আপনাকে মানে আপনার প্রতি দুর্ব্যবহার করেছি এ জন্য আমি লজ্জিত।
আমি কৃতজ্ঞ মিঃ আরমান, আপনি আমার আসল পরিচয় জানার পরও নিশ্চুপ ছিলেন এবং আমাকে সবকাজে সর্বতোভাবে সহায়তা করে এসেছেন। ইচ্ছা করলে আপনি আমাকে পুলিশের হাতে সোপর্দ করে লক্ষ টাকার অধিকারী হতে পারতেন এবং লাভ করতেন এক সম্মানসূচক পদবী।
আমি আজ যে সম্মানে ভূষিত হলাম তার কোনো পরিসীমা নেই। স্বয়ং দস্যু বনহুর আমার বন্ধু, একথা আমি ভাবতে যে আনন্দবোধ করছি তা লক্ষ টাকার চেয়ে অনেক বড়, অনেক বেশি।
অনেক ধন্যবাদ মিঃ আরমান। এই নিন একটি চিহ্ন আমি আপনাকে দিয়ে গেলাম। আলীবেশী বনহুর নিজ আংগুল থেকে একটা আংটি খুলে মিঃ আরমানের আংগুলে পরিয়ে দিলো।
যখন বনহুর মিঃ আরমানের আংগুলে আংটি পরিয়ে দিলো তখন আরমান দক্ষিণ হাতে হ্যাঁণ্ডেল চেপে ধরে রাখলো, মনে তার একটা উচ্ছল আনন্দ আর ব্যথা একসঙ্গে আলোড়ন সৃষ্টি করছিলো–স্বয়ং দস্যু বনহুর তার আংগুলে আংটি পরিয়ে দিলো।
এ যে তার জীবনে এক পরম স্বপ্নলগ্ন।
ঠিক সময় প্লেন বিমান বন্দর ত্যাগ করলো।
মিঃ আরমান আশা ও বনহুরকে বিদায় সম্ভাষণ জানালেন।
একটা গভীর ব্যথা হৃদয়ে অনুভব করলেন মিঃ আরমান।
এক সময় একা ছিলেন, তখন এত খারাপ লাগতো না তার। আজ নতুন করে নিঃসঙ্গ লাগছে, বড় একা মনে হচ্ছে নিজেকে।
মিঃ আরমান হোটেলের কামরায় বসে নিজ হাতের আংগুলে পরা আংটির দিকে তাকালেন। ইলেকট্রিক আলোতে উজ্জ্বল একটা ছটা বেরিয়ে আসছে আংটিটা হতে। উজ্জ্বল এক হীরকখণ্ড, মহামূল্যবান তাতে কোনো সন্দেহ নেই। মিঃ আরমান একটা দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করলেন।
বনহুর আর আশাকে নিয়ে বিমানখানা যখন লণ্ডনের আকাশ পেরিয়ে ইথুরিয়ার আকাশে এসে পৌঁছেছে, ঐ মুহূর্তে পুলিশপ্রধান তার অফিসে এসে বসতেই টেবিলে নজর পড়লো একটি সবুজ রঙের ইনভেলাপ, ঠিকানায় তারই নাম। পুলিশপ্রধান চিঠিখানা হাতে তুলে নিয়ে খুলে ফেললেন। মাত্র কয়েক লাইন লেখা আছে চিঠিখানায়
আপনার অনুরোধ রাখতে পারলাম না, কারণ যাকে আপনি খুঁজে ফিরছেন আমিই সেই ব্যক্তি। —- দস্যু বনহুর
পুলিশপ্রধানের মাথায় কে যেন বজ্রাঘাত করলো। কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলেন তিনি তার অফিসকক্ষের টেবিলের শূন্য এ্যাসট্রেটার দিকে। যে দস্যু বনহুরকে লণ্ডন পুলিশবাহিনী হন্তদন্ত হয়ে খুঁজে ফিরছেন সেই ব্যক্তিই হলো কিনা ডিটেকটিভবেশী আলী…. যে এমন একটা গভীর রহস্য উদঘাটন করে দিয়েছে। কোথায়, কোথায় সেই আলী….. সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ প্রধান রিসিভার তুলে নিলেন হাতে। মিঃ আরমানকে টেলিফোন করলেন, জানালেন তিনি ব্যাপারটা।
মিঃ আরমান বললেন–যখন আমরা তার আসল পরিচয় জানতে পেলাম তখন সে লণ্ডন ত্যাগ করে চলে গেছে। সকালের বিমানে সে লণ্ডন ত্যাগ করেছে।
পুলিশপ্রধান কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়লেন, তিনি টেলিফোনে বিমান বন্দরে জানিয়ে দিলেন সংবাদটা এবং ওয়্যারলেসে সেই বিমান চালককে জানাতে নির্দেশ দিলেন, যেন আরাকান বিমান বন্দরে পুলিশবাহিনী মোতায়েন রাখেন, স্বয়ং দস্যু বনহুর ঐ বিমানে যাচ্ছে।
বনহুর ও আশা পাশাপাশি বসেছিলো।
প্লেনের সাউণ্ড বক্সে প্রতিধ্বনিত হলো কথাগুলো। বনহুর এবং আশা মুখ চাওয়া চাওয়ি করে নিলো একবার। তারা বুঝতে পারলো লণ্ডন পুলিশ অফিস থেকে সব জানানো হয়েছে।
বিমানযাত্রীদের মুখে একটা কালো ছায়া পড়লো।
তারা আতঙ্কগ্রস্তভাবে এ ওর দিকে তাকাতে লাগলো, সবার চোখেমুখে ভীতি ভাব ছড়িয়ে পড়েছে।
মহিলাগণ পুরুষদের মুখে সন্দিহান দৃষ্টি নিয়ে তাকাতে লাগলো। নিজ নিজ মূল্যবান অলংকার গোপনে সরিয়ে রাখার চেষ্টা করছে সবাই।
বিমান চালকের বুকটা ধক করে উঠলো। যে দস্যু বনহুরকে গ্রেপ্তারের জন্য লণ্ডনবাসী হন্তদন্ত হয়ে ছুটোছুটি করে বেড়াচ্ছে, যে দস্যু বনহুরকে একনজর দেখার জন্য লণ্ডনবাসী উন্মুখ, যে দস্যু বনহুরের ভয়ে লণ্ডনবাসী আতঙ্কিত সেই দস্যু বনহুর রয়েছে এই প্লেনে কম কথা নয়।
মহিলা যাত্রীগণ নিজ নিজ স্বামী বা আত্মীয় স্বজনের পাশে সরে এলো। না জানি দস্যু বনহুর তাদের কি ক্ষতি সাধন করে বসে।
