তারপর?
মিসেস জ্যাসিলিন এবং ডাক্তার লোমানের মধ্যে একটা প্রীতিভাব গড়ে উঠলো। হসপিটালে তাদের সম্বন্ধ ছিলো ডাক্তার এবং নার্সের আর লোকচক্ষুর আড়ালে নিবিড় সম্বন্ধ ছিলো। ডাক্তার লোমান মিসেস জ্যাসিলিনকে বিয়ে করবেন বলে কথা দিয়েছিলেন।
পুলিশ প্রধান ও তার সহকারিগণের চোখেমুখে বিস্ময়।
মিঃ আরমান তো একেবারে স্তব্ধ হয়ে গেছেন। সব শুনছেন তিনি মনোযোগ সহকারে। মিসেস জ্যাসিলিনকে তিনি জানতেন যতটুকু তার চেয়ে শতগুণ জানে আলী।
আলী তখন বলেই চলেছে–ডাক্তার লোমান এবং জ্যাসিলিনের মধ্যে যখন ঘনিষ্ঠতা আরও নিবিড় ভাব ধারণ করে তখন মিসেস জ্যাসিলিনের স্বামী মিঃ আলটাবাস মেস্ক লণ্ডন এসে স্ত্রীর সন্ধান পান এবং স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিয়ে যাবার প্রচেষ্টা চালান। এ কারণে স্ত্রীর নিকটে মিঃ মেস্ক প্রায়ই হসপিটালে আসতেন এবং স্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে তাঁকে ফিরিয়ে নেওয়ার প্রস্তাব দিতেন। জ্যাসিলিনের মনটা স্বামীর প্রতি এতবেশি নারাজ হয়ে পড়েছিলো যে, স্বামীকে তিনি কিছুতেই সহ্য করতে পারতেন না। এ জন্য প্রায়ই দেখা যেতো স্বামী–স্ত্রীর মধ্যে একটা রাগারাগি ভাব। হসপিটালে কেউ মিসেস জ্যাসিলিনের স্বামীকে চিনতেন না। শুধু এক ব্যক্তিই জানতেন তিনি হলেন ডাক্তার লোমান এবং যখন জানলেন জ্যাসিলিন তার স্বামীর সঙ্গে ফিরে যাবার জন্য মনস্থির করেছেন তখন ডাক্তার লোমান জ্যাসিলিনকে কৌশলে হত্যা করলেন। অবশ্য জ্যাসিলিনের স্বামীকেও হত্যা করতে পারতেন ডাক্তার লোমান, তাহলেও পথের কাঁটা দূর হতো কিন্তু তা তিনি করেননি। এর কারণ কিছু আছে বলে মনে হয়? বললেন–পুলিশ প্রধান।
হাঁ কারণ ছিলো, মিসেস জ্যাসিলিন শেষের দিকে বেশ ঝুঁকে পড়েছিলেন দেশে ফেরার জন্য। আরও একটা কারণ ছিলো–মিসেস জ্যাসিলিনের একটা কন্যা সন্তান দেশে রয়েছে, বিশেষ করে তাকে বেশি করে মনে পড়ছিলো তার। ডাক্তার লোমান মিসেস জ্যাসিলিনকে শেষ পর্যন্ত হত্যা করে তার ভালোবাসার প্রতিদান দিয়েছেন।
পুলিশপ্রধান হাত বাড়ালেন আলীর দিকে।
আলীও হাত বাড়িয়ে করমর্দন করলো।
পুলিশগণ তখন ডাক্তার লোমান ও তার সঙ্গীদ্বয়ের হাতে হাতকড়া লাগিয়ে প্রস্তুত হয়ে দাঁড়িয়েছেন।
পেসেন্ট স্মাগলার ফেরারী আসামী শওকত আলী সর্দারকে আপাতত অন্ধ হসপিটালে পুলিশ প্রহরায় রাখা হলো। তবে তার চক্ষু সংযোজনের জন্য নয়, চোখ দুটো তুলে নেওয়ায় যে ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে সেই ক্ষত যতদিন না ঠিক হয় ততদিন তাকে চিকিৎসাধীন রাখা হবে, তারপর তাকে তার উপযুক্ত স্থানে প্রেরণ করা হবে।
মিঃ আরমানের সঙ্গেও করমর্দন করলেন পুলিশপ্রধান।
আলী পুলিশপ্রধানের নিকটে সব কথাই বলেছে। নিজের পরিচয় দিয়েছে– সে একজন ডিটেকটিভ বলে অতি সাবধানে আত্মগোপন করে এই হত্যারহস্যের মূল তথ্য উদঘাটনে নিজেকে নিয়োজিত করেছিলো। আলীর নিকটে ছিলো তার ডিটেকটিভ হিসেবে পরিচয় পত্র, কাজেই লণ্ডন পুলিশপ্রধানের সন্দেহের কোনো কারণ ছিলো না। আলী আরও বলেছিলো মিঃ আরমান তাকে বিশেষভাবে সহযোগিতা করেছেন, তাই সে এত বড় দুঃসাহসী কাজে জয়যুক্ত হলো। অবশ্য মিঃ আরমানকেও অনেক কথা গোপন করে তাকে কাজ করতে হয়েছে।
পুলিশপ্রধান অত্যন্ত খুশি হয়েছেন, আলীকে তিনি অভিনন্দন জানালেন অন্তর থেকে।
বিদায় মুহূর্তে পুলিশপ্রধান বললেন–ডাক্তার লোমান অন্ধ হসপিটালের অভ্যন্তরেই শুধু অমানুষিক কাজে লিপ্ত ছিলেন না, তিনি মিসেস জ্যাসিলিনকেও হত্যা করেছেন। একসঙ্গে আমরা দুটি রহস্য উদঘাটনে সক্ষম হলাম। কিন্তু….
বলুন স্যার।
আপনাকে আমরা ছাড়ছি না।
পুলিশ সুপারের কথায় আলীর দ্বয় ভ্রুকুঞ্চিত হলো।
পুলিশ সুপার বললেন–আপনাকে আরও একটি কঠিন কাজের দায়িত্ব আমরা দিতে চাই, আশা করি আপনি এ দায়িত্বভার গ্রহণ করবেন।
বলুন স্যার?
আপনি জানেন দস্যু বনহুর লণ্ডন নগরীতে আগমন করেছে এবং পুলিশমহলের চোখ এড়িয়ে সে আত্মগোপন করে আছে। যে কোনো মুহূর্তে সে লণ্ডন নগরীর ক্ষতি সাধন করতে পারে, কাজেই আমার অনুরোধ দত্যু বনহুর গ্রেপ্তারেও আপনি আমাদেরকে সহযোগিতা করবেন…
একটু হাসলো আলী, তারপর বললো–চেষ্টা করবো স্যার।
চেষ্টা নয়, এ দায়িত্ব আপনাকে গ্রহণ করতেই হবে। পুলিশ প্রধান বলিষ্ঠ কণ্ঠে কথাটা বললেন।
তখনও আলীর মুখে মৃদু হাসির আভাস পরিলক্ষিত হচ্ছে।
মিঃ আরমানসহ আলী এবার হসপিটাল থেকে বেরিয়ে এলো।
মিঃ আরমানের গাড়ি বাইরে অপেক্ষা করছিলো। আলী এবং মিঃ আরমান গাড়িতে চেপে বসলো।
বললো আলী–বন্ধু এবার বিদায়। আমাকে লণ্ডন বিমান বন্দরে পৌঁছে দিন, তাহলে চিরকৃতজ্ঞ থাকবো।
মিঃ আরমান বিস্ময় প্রকাশ করে বললেন–হঠাৎ এমন প্রস্তাব কেন বন্ধু? তাছাড়া হোটেলে আপনার স্ত্রী রয়েছেন।
গম্ভীর শান্ত কণ্ঠে বললো আলী–লগুনের কাজ আমার শেষ হয়ে গেছে, তাই এবার ফিরে যাবো দেশে। আর ও আমার স্ত্রী নয়–আমার বান্ধবী, বোনও বলতে পারেন, কারণ তার সঙ্গে আমার পবিত্র সম্পর্ক ছাড়া অন্য কোনো সম্পর্ক নেই….
মিসেস আশা আপনার স্ত্রী নন?
মিসেস নয়, কারণ সে এখনও অবিবাহিতা।
তাহলে তিনি একা থাকবে লণ্ডনে?
না।
তবে?
আমাদের উভয়ের প্লেনের টিকেট হয়ে গেছে। আজই সকালের বিমানে আমরা রওয়ানা দেবো।
