আলীর কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনছিলেন পুলিশপ্রধান এবং মিঃ আরমান ও পুলিশগণ। তারা শুধু বিস্মিতই নন, একেবারে হতভম্ব হয়ে পড়েছেন।
আলী বলেই চলেছে–সেই অসহায় অন্ধ ব্যক্তিগণ দেশের বাইরে অন্ধ ভিক্ষুক হিসেবে ভিক্ষা করে বেড়াচ্ছেন আর যাদের হত্যা করা হয়েছে তারা মরে বেঁচে গেছেন। এসব চক্ষু ডাক্তার লোমান গোপনে দেশের বাইরে পাঠান এবং তার বিনিময়ে পান কোটি কোটি টাকা। যেমন আজ যে ব্যক্তির চক্ষু তুলে নেওয়ার জন্য প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে, তিনি একজন সৎ মহৎ ব্যক্তি। আর যার চোখের দৃষ্টি ফিরিয়ে আনার জন্য এ প্রচষ্টা তিনি হলেন ফেরারী আসামী স্মাগলার মিঃ হুইনক্লিথ ওরফে শওকত আলী।
বিস্ময়ে অস্ফুট ধ্বনি করে উঠলেন পুলিশ প্রধান–এ ব্যক্তি সেই দুর্নীতিবাজ দুস্কৃতিকারী যাকে পাকড়াও করে চোখ উপড়ে ফেলা হয়েছিলো?
হা স্যার, এ সেই মহান ব্যক্তি। চোরাকারবারী করে কোটি কোটি টাকার মালিক বনে বসে আছেন। উনি মনে করেছিলেন এর কোনো প্রায়শ্চিত্ত নেই, এমনি করেই লুটে নেবেন জনগণের মুখের গ্রাস, কিন্তু জনগণ এত বোকা বা অবুঝ নয়। তারা সুযোগের অপেক্ষায় ছিলো এবং সুযোগ বুঝেই ওনাকে ওনার উপযুক্ত পুরস্কার প্রদান করেছে। আলী ক্ষণিকের জন্য থামলো, তারপর পুনরায় বলতে শুরু করলো–জনগণ আরও বুঝতে শিখেছে দুস্কৃতিকারী অসৎ ব্যক্তিদের হত্যা করে তাকে শায়েস্তা করা হয় না বা যায় না, কারণ তা করলে সে মৃত্যুবরণ করে অতি সহজেই দুনিয়া থেকে রেহাই পেয়ে চলে গেলো। তাই সতর্ক জনগণ আজকাল এই নরপশুদের হত্যা না করে সমুচিত পুরস্কার দিচ্ছে, জীবিত রেখে চোখ তুলে নিচ্ছে আলগোছেন এতে স্বনামধন্য ব্যক্তিগণ বুঝতে পারছেন অসৎ কর্মের ফলাফল কেমন এবং কত ভয়ংকর হতে পারে। যতদিন পৃথিবীর বুকে জীবিত থাকবেন ততদিন তিল তিল করে উপভোগ করতে সক্ষম হবেন জনগণের মুখের গ্রাস কেড়ে খাওয়ার কেমন পরিণতি। এই পেসেন্টের দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিলে এক কোটি টাকা ডাক্তার লোমান পাবেন। শুধু এই একটা নয়, এমন বহু অসৎ কাজ এই ডাক্তারের দ্বারা সংঘটিত হয়েছে।
মিঃ আলী, আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ যে, আপনি এমন একটা গভীর রহস্য উদঘাটনে সাহায্য করলেন। বললেন পুলিশপ্রধান।
আলী একটু হেসে বললো–আরও একটা ঘটনার পরিসমাপ্তি আজ ঘটবে। যে ব্যাপারে লণ্ডন, নগরীর প্রতিটি লোক প্রতীক্ষা করছেন।
মিঃ আরমান নির্বাক স্তব্ধ হয়ে পড়েছেন। তিনি ভাবছেন এসব কি দেখছেন এবং শুনছেন। সত্যি কি আলী মানে–বনহুর এসব উদঘাটন করলো। বনহুরের প্রতি একটা শ্রদ্ধাশীল মনোভাব জেগে উঠলো তার মনে।
পুলিশপ্রধান বললেন–মিঃ আলী, আমরা আপনার কাছে কৃতজ্ঞতা। আরও নতুন কোনো কিছু জানার জন্য অপেক্ষা করছি।
আলী বললো–শেষ কথা শোনার পূর্বে ডাক্তারের হাতে হাতকড়া পরিয়ে ফেলার নির্দেশ দিন স্যার। এই সেই খুনী যে মিসেস জ্যাসিলিনকে হত্যা করেছিলো।
সেই রহস্যময় ভূগর্ভে যেন বজ্রপাত হলো।
সবাই তাকালেন আলীর একমুখ দাড়িগোঁফে ভরা মুখখানার দিকে।
পুলিশপ্রধান বললেন–ডাক্তার লোমান মিসেস জ্যাসিলিনকে হত্যা করেছেন?
হাঁ স্যার।
কারণ?
কারণ অত্যন্ত জটিল তবু আমি সংক্ষেপে বলছি। বললো আলী।
পুলিশপ্রধান ডাক্তার এবং তার সঙ্গীদ্বয়ের হাতে হাতকড়া পরিয়ে দেওয়ার ইংগিত করলেন।
সঙ্গে সঙ্গে পুলিশপ্রধানের নির্দেশ পালিত হলো। ডাক্তার একটা কথাও উচ্চারণ করতে পারলেন না, কারণ তিনি ভীষণ ভড়কে গেছেন, নার্ভাস হয়ে পড়েছেন। এতদিনের সব প্রচেষ্টা তাঁর বিফল হয়ে গেলো…. লক্ষ লক্ষ নয় কোটি কোটি টাকার স্বপ্ন তাঁর তাসের ঘরের মত ভেঙে চুরমান হয়ে গেলে।
পেসেন্ট অবস্থায় স্মাগলার মিঃ হুইনক্লিক নামধারী শওকত সব শুনছিলো কিন্তু সে কিছুই দেখতে পাচ্ছিলো না, এ কারণেই সে নিশ্চুপ ছিলো এবং নিশ্চুপ থেকেই সব অনুধাবন করছিলো। অবস্থা এখন বড়ই কঠিন তাই কণ্ঠনালী শুকিয়ে আসছিলো শয়তানটার। অবোধ শিশুর মতই এ মুহূর্তে তার অবস্থা। কিছুক্ষণ পূর্বেও শওকত ভেবেছিলো তার দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাবে, আবার সে দেখতে পাবে এই সুন্দর পৃথিবীর অপরূপ সৌন্দর্য। শুধু তাই আবার সে তার গদীতে আসন গেড়ে বসতে পারবে, চলবে তার ব্যবসা পুরাদমে। ….. সব ধূলিসাৎ হয়ে গেলো, নস্যাৎ হয়ে গেলো তার আশা ভরসা। ঐশ্বর্যের ইমারত একদণ্ডে ধসে পড়লো। একটা আর্তনাদ করে উঠলো শওকত আলী সর্দার–যে পাপ আমি করেছিলাম তার প্রায়শ্চিত্ত আমার হয়েছে। আমাকে আপনারা মাফ করে দেন, আমাকে আপনারা মাফ করে দেন…
কিন্তু শওকত আলী সর্দারের কথায় কেউ কান দিলেন না, তারা মিঃ আরমানের পুরোন চাকর আলীর কথা শোনায় ব্যস্ত।
এবার আলী বললো–মিসেস জ্যাসিলিন লেবাননবাসিনী তার স্বামী মিঃ আলটাবাস মেঙ্ক। স্বামী–স্ত্রীর মধ্যে কলহ সৃষ্টি হওয়ায় মিসেস জ্যাসিলিন চলে আসেন লণ্ডনে এবং অন্ধ হসপিটালে নার্সের চাকুরী গ্রহণ করেন। অন্ধ হসপিটালে আসার পর তিনি নিষ্ঠার সাথে কাজ করতে থাকেন। হসপিটালে রোগীর সেবায় নিজকে ভুলিয়ে রাখতে চেষ্টা করেন। কিন্তু ডাক্তার লোমান মিসেস জ্যাসিলিনকে নিজের আয়ত্তে আনেন নানা কৌশলে। জ্যাসিলিন সরলা মহিলা, তাকে আয়ত্তে আনতে দুষ্টচরিত্র লোমানের বেশি বেগ পেতে হয়নি।
