ডাক্তারকে এ বেশে বা এ ধরনের অবস্থায় দেখবেন কোনোদিন মিঃ আরমান তা ভাবেননি। আজ তিনি নতুনরূপে আবিস্কার করলেন ডাক্তার লোমানকে।
আজ মিঃ আরমান বুঝলেন ডাক্তার শুধু হসপিটালের পেসেন্টদের নিয়েই কাজ করেন না, তার কাজ হসপিটালের তলদেশেও।
বললেন ডাক্তার লোমান–কি ভাবছেন মিঃ আরমান? আর যাই ভাবুন কাজে আমাকে সহযোগিতা করতেই হবে।
না, আমি এমন অন্যায় করতে পারবো না। চক্ষু সেন্টারে বহু চক্ষু জমা আছে অথচ আপনি নতুন এক ব্যক্তির জীবন বিপন্ন করে….
নির্বোধ, ঐ চক্ষু দিয়েই যদি হতো তাহলে তোমাকে আর এখানে নিয়ে আসতাম না, কারণ ঐ চক্ষু সেন্টারে জমাকৃত চক্ষুগুলোর নার্ভ বিনষ্ট হয়ে গেছে, কাজেই টাটকা চক্ষুর প্রয়োজন।
মিঃ আরমান আশ্চর্য হয়ে গেছেন, তাঁর মুখ হা হয়ে গেছে, তাকে আপনি থেকে তুমি বলায় তিনি কিছু মনে করেননি। তিনি যখন শুনলেন চক্ষু সেন্টারে জমাকৃত এতগুলো চক্ষু অকেজো হয়ে গেছে তখন তাঁর মাথায় কে যেন বজ্রাঘাত করলো। কত লোকের দৃষ্টিশক্তি বিনষ্ট করে এই চক্ষুগুলো সংগ্রহ হয়েছে।
মিঃ আরমানের সমস্ত শরীর রাগে–দুঃখে কাঁপছে, এসব কি দেখছেন তিনি এবং কি শুনছেন। সত্যিই তাহলে এতগুলো চক্ষু বিনষ্ট হয়ে গেছে। কতবড় সর্বনাশ…..
কি ভাবছেন মিঃ আরমান?
এ্যা।
অমন গভীরভাবে কি ভাবছিলেন?
ভাবছিলাম কতগুলো লোকের দৃষ্টিশক্তি বিনষ্ট করে আপনি দেশের সর্বনাশ করেছেন….
এ কথা তোমাকে ভাবতে হবে না আরমান। এ অপারেশন তোমার জীবনের শেষ অপারেশন। এরপর আর তুমি ফিরে যাবে না পৃথিবীর বুখে।
মিঃ আরমানের বুকটা ধক করে উঠলো। তিনি ডাক্তারের চোখেমুখে দেখলেন এক কুৎসিত হিংস্র ভাব যা আর কোনোদিন দেখেননি।
এতগুলো কথাবার্তা খুব দ্রুতই শেষ হয়ে এলো। ডাক্তার এবার মিঃ আরমানকে তার হাতে গ্লাবস এবং মুখে মাক্স পরে নিতে বললেন।
মিঃ আরমান দৃঢ়কণ্ঠে বললেন–না, আমি কিছুতেই এ ব্যাপারে রাজি নই।
কি বললে তুমি?
আমি রাজি নই।
তুমি ছাড়া এ কঠিন কাজে সহযোগিতা করার অন্য কেউ নেই, কাজেই তোমাকে চাই–তুমি আমাকে সহযোগিতা করবে যেমন করে এতদিন করে এসেছে।
এতদিন করেছি কিন্তু এমন ধরনের অন্যায় কাজ করিনি।
বেশি কথা বাড়িও না, তোমাকে যা বলবো তাই শুনতে হবে।
যদি না শুনি…
তাহলে তোমার মৃত্যু….এই এটা তোমাকে হজম করতে হবে। পিস্তল বের করলেন ডাক্তার প্যান্টের পকেট থেকে এবং পিস্তলখানা তুলে ধরলেন মিঃ আরমানের বুক লক্ষ্য করে।
মিঃ আরমান এবার বাধ্য হলেন সহকারীর কাজে সহযোগিতা করতে।
তিনি হাতে গ্লাবস এবং মুখে মাক্স পরে নিলেন।
ততক্ষণে লোক দুজন বলিষ্ঠ লোকটাকে অপারেশান টেবিলে শুইয়ে দিলো।
ডাক্তার এপ্রোণ পরে নিয়ে মাক্স এবং গ্লাবস পরে নিলেন, তারপর অপারেশন টেবিলের পাশে এসে দাঁড়ালেন।
বিস্ময়কর কক্ষে অদ্ভুত এই পরিবেশ মিঃ আরমানকে বেশ ভাবিয়ে তুলেছে তবু তিনি প্রস্তুত হলেন, না হয়ে তো কোনো উপায় নেই। ডাক্তারের পাশে দাঁড়ালেন মিঃ আরমান তাকে সাহায্য করার জন্য।
যে লোকটার হাত দুখানা পিছমোড়া করে বেধে আনা হয়েছিলো তাকে একটা সাদা এপ্রোণে ঢেকে দেওয়া হলো। লোকটা করুণভাবে বারবার নিজের চোখ দুটিকে না তুলে নেবার অনুরোধ জানাচ্ছিলেন।
কিন্তু ডাক্তার তার কথা কানেও নিলেন না। তিনি পাশাপাশি পেসেন্ট এবং যার চোখ তুলে নেওয়া হবে তাকে শুইয়ে দিয়ে প্রস্তুত হয়ে নিলেন।
এবার তিনি অস্ত্রোপচারের কাজ শুরু করবেন।
মাত্র কয়েক সেকেণ্ড, ঠিক ঐ মুহূর্তে দেয়াল সরে গিয়ে একটা গুপ্তপথ বেরিয়ে এলো। সঙ্গে সঙ্গে সেই গুপ্তপথ দিয়ে কক্ষে প্রবেশ করলেন পুলিশপ্রধান এবং তার সঙ্গে কয়েকজন সশস্ত্র পুলিশ। তাদের সঙ্গে রয়েছে মিঃ আরমানের পুরোনো ভূত আলী।
পুলিশপ্রধান এবং তার সঙ্গীদের হাতে উদ্যত পিস্তল। দৃশ্য লক্ষ্য করে হকচকিয়ে গেলেন ডাক্তার লোমান। তিনি ভেবে পেলেন না এনারা কি করে তার এই রহস্যময় গবেষণাগারের সন্ধান পেলেন। কি করে তারা তার কাজের হদিস আবিস্কার করলেন। কি করে এই পথের দিশা বা সন্ধান পেলেন। মুহূর্তে সব ভেবে নিলেন ডাক্তার, হাতে তার অপারেশনের অস্ত্র। আর এক মুহূর্ত বিলম্ব হলে অসহায় ব্যক্তিটার চোখ দুটো তুলে নেওয়া হতো আলগোছে, তারপর দুর্নীতিবাজ অসৎ শওকত আলী সর্দারের চোখে সংযোগ করা হতো কিন্তু সে সুযোগ আর হলো না।
পুলিশপ্রধান বললেন–খবরদার, একচুল নড়বে না। তিনি পিস্তল চেপে ধরলেন ডাক্তারের বুকে।
পুলিশগণ পিস্তল ধরলো ডাক্তারের দুজন সঙ্গী যারা এতক্ষণ ঐ ব্যক্তিটাকে ধরে রেখেছিলো তাদের বুকে।
মিঃ আরমান হতবাক হয়ে গেছেন। তিনি ভাবতেও পারেননি আলী পুলিশবাহিনী নিয়ে সশরীরে হাজির হবে। আর পথই বা সে চিনলো কি করে, হঠাৎ তার মনে পড়লো বন্ধু বনহুর তাকে বলেছিলো আজ তিনি যেন হসপিটালে ইচ্ছা করেই বিলম্ব করেন। বিশেষ কোনো কারণে সে এ কথা তাকে বলছেন, এটাও সে পরিষ্কার ভাবে বুঝিয়ে দিয়েছিলো। এবার মিঃ আরমান বুঝতে পারলেন কেন তাকে হসপিটালে বিলম্ব করার জন্য বলেছিলো এবং কেনই বা তাঁকে রাত অবধি কোনো কাজের বাহানা করে থাকতে বলেছিলো। তবে কি আলী সব জানতে…
মিঃ আরমানের চিন্তাধারায় বাঁধা পড়লো, আলী বলে উঠলো–স্যার, ডাক্তার লোমান দীর্ঘদিন এই হসপিটালে কাজ করে এসেছে, তাকে সবাই মহৎ ব্যক্তি হিসেবেই জানতেন কিন্তু তার এই মহত্বের অন্তরালে ছিলো এক ভয়ংকর রূপ। যে রূপ নিয়ে তিনি হসপিটালের তলদেশে কুকর্ম করে যেতেন। বহু অসহায় ব্যক্তির দৃষ্টিশক্তি ডাক্তার লোমান হরণ করেছেন, ঐ দেখুন তার প্রমাণ। ঐ যে কাঁচপাত্র বা চক্ষু রক্ষণাবেক্ষণের পাত্রটা দেখছেন ওটার মধ্যে রয়েছে শত শত ব্যক্তির চোখ। কত নিরপরাধ অসহায় ব্যক্তির দৃষ্টিশক্তিই না ইনি চিরতরে লুপ্ত করে দিয়েছেন তার পরিসীমা নেই। এবং সেসব দৃষ্টিশক্তি লুপ্ত ব্যক্তিদের হয় হত্যা নয় পাচার করে দিয়েছেন দেশের বাইরে।
