চারদিকে নানা ধরনের মেশিন আর যন্ত্রপাতি রয়েছে। মাঝে মাঝে একটা টেবিল, টেবিলের পাশে একটা করে গোলাকার কাঁচপাত্র।
মিঃ আরমান বিস্ময়ভরা চোখে দেখলেন একটা নয়, দুটো নয়, শত শত চোখ ঐ কাঁচপাত্রে তরল পদার্থে জমা রাখা হয়েছে। কেমন যেন অদ্ভুত আর বিস্ময়কর।
মিঃ আরমানকে হতবাক হয়ে কাঁচপাত্রটার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে ডাক্তার হেসে উঠলেন। কেমন যেন ভয়ংকর সে হাসি।
চোখ দুটো ফিরে এলো মিঃ আরমানের ডাক্তারের মুখে। তিনি এতক্ষণে বুঝতে পারছেন ডাক্তার তাকে কোনো ষড়যন্ত্রের শিকার হিসেবে এখানে নিয়ে এসেছে। দ্রুত কিছু দৃশ্য ভেসে উঠলো আরমানের চোখের সামনে। ডাক্তার দীর্ঘ সময় এই হসপিটালে আছেন। তারই প্রচেষ্টায় নাকি ওই হসপিটাল লণ্ডন নগরীর এক নিভৃত স্থানে স্থাপিত হয়েছে। আজও অন্য কোনো ডাক্তার এই হসপিটালে চাকরী পাননি। যারা পেয়েছেন তারা সবাই ডাক্তার লোমানের সহকারী হিসেবেই পেয়েছেন। ডাক্তার লোমানকে সবাই শ্রদ্ধা করেন, কারণ তিনি একজন দক্ষ চক্ষু চিকিৎসক। শুধু চিকিৎসকই নন তিনি সার্জনও বটে। অল্পভাষী এই ভদ্রলোক অতি বুদ্ধিমান তাতে কোনো সন্দেহ নেই। হসপিটালের রোগীরা ছাড়াও নার্স এবং অন্যান্য কর্মচারী সবাই ডাক্তারকে শ্রদ্ধা এবং ভয় করে। এহেন ব্যক্তিকে আজ একটা রহস্যময় পৃরীতে দেখে আশ্চর্য না হয়ে পারলেন না মিঃ আরমান।
কি ভাবছেন মিঃ আরমান?
কিছু না।
অবাক হয়েছেন আমার এই রহস্যময় গবেষণাগার দেখে। তা অবাক হবার কথাই বটে। আসুন আমাকে সহায়তা করুন মিঃ আরমান।
সহায়তা করবো আমি!
হ।
কি কাজে?
একটা অপারেশন হবে।
অপারেশন?
হাঁ অপারেশন। একটা জীবিত ব্যক্তির চোখ তুলে নিয়ে অপর এক ব্যক্তির চোখে মানে জীবিত ব্যক্তির চোখের কোটরে বসিয়ে দিতে হবে। আপনি ছাড়া কেউ পারবে না এ কাজ করতে।
স্যার, তা এখানে কেন?
হসপিটালের প্রকাশ্য স্থানে এ অপারেশন চলবে না।
কারণ।
যার কপাল থেকে চক্ষুদ্বয় তুলে নেওয়া হবে সে চির অন্ধ হয়ে যাবে?
বিস্ময়ভরা কণ্ঠে বললেন মিঃ আরমান–সে চির অন্ধ হয়ে যাবে স্যার?
হাঁ
কিন্তু..
কোনো কিন্তু নয়, একজন অন্ধ হবে, অপরজন যিনি চির অন্ধ ছিলেন তিনি এই সুন্দর পৃথিবীর অপরূপ সৌন্দর্য উপলব্ধি করবেন।
না না, তা হয় না স্যার।
আপনার কথার মূল্য এখানে নেই।
তাহলে….
হাঁ, অপারেশন হবেই।
তারপর যাকে চির অন্ধ করে দিচ্ছেন তাকে….
তাকে! তাকে কি করবো?
হা হা, তাকে কি করবেন?
হয় হত্যা নয় দূর কোনো দেশে প্রেরণ করবো,…
স্যার, এ কেমন কথা?
মিঃ আরমান, এমন অনেক কাজই হয় যা সাধারণ দৃষ্টিতে মোটেই শ্রেয় মনে হয় না। আপনি আমাকে এ ব্যাপারে আর কোনো কথা জিজ্ঞাসা করবেন না।
বেশ, আর কোনো কথা জিজ্ঞাসা করবো না। বললেন মিঃ আরমান।
ডাক্তার লোমান এবার একটা ইংগিতপূর্ণ শব্দ করলেন।
সঙ্গে সঙ্গে একটা লোককে নিয়ে আসা হলো সেখানে। লোকটি তেজোদ্দীপ্ত যোয়ান, তার হাত দুখানা পিছমোড়া করে বাঁধা। দুজন লোক তাকে দুপাশে ধরে নিয়ে এলো।
আবার ডাক্তার একটা সুইচে চাপ দিলো।
অমনি একটা রোগীসহ বেড় বেরিয়ে এলো দেয়ালের ভেতর হতে। রোগীর দুচোখে পট্টি বাধা।
ডাক্তার বললেন– রোগীর চোখ দুটো তুলে ফেলা হয়েছে, কাজেই…
রোগীর চেহারা দেখে মনে হলো বয়স হলেও বৃদ্ধ নয় এবং বলিষ্ঠ দেহ। রোগীর চোখের বাঁধন খুলে ফেলা হলো।
চমকে উঠলেন মিঃ আরমান, তিনি অস্কুট ধ্বনি করে বললেন–ইনি সেই ফেরারী আসামী স্মাগলার মিঃ হুইনক্লিক নামধারী শওকত আলী সর্দার।
আপনি দেখছি ওকে দেখেই চিনে ফেলেছেন? বললেন ডাক্তার।
মিঃ আরমান বললেন–চিনবো না? ইনি স্বনামধন্য ব্যক্তি, কে না এনাকে চেনে। বিশেষ করে পত্রিকায় এনার যে ছবি ছাপা হয়েছিলো তা অতি স্পষ্ট। না চিনবার কোনো কথা নয়।
বেশ, যখন চিনেই ফেলেছেন তখন বলতেই হয় সংক্ষেপে। শুনুন,
কিন্তু তার পূর্বে আমি আর একটু বলতে চাই এর সব কথাই আমার জানা আছে। কদিন পূর্বে এই স্মাগলার মিঃ হুইনক্লিক কোথাও ধরা পড়ে যান এবং সেখানে তিনি হারান তার চক্ষুদ্বয়। চোখ দুটোকে উপড়ে নেওয়া হয়েছিলো তারপর তিনি নিখোঁজ হন। একটু থেমে পুনরায় বললেন মিঃ আরমান–এ মুহূর্তে দেখছি তিনি এখানে।
হাঁ, এর চোখ দুটো তুলে নেওয়া হয়েছে। সেই চোখ দুটোই আবার বসিয়ে দেবো, আপনি এ ব্যাপারে সাহায্য করবেন।
কিন্তু যার চোখ তুলে নিচ্ছেন মানে ঐ তরুণ লোকটার কি ঘটবে, একথা একবার ভেবে দেখেছেন ডাক্তার?
এর জন্য আপনি বা আমি নিশ্চিন্ত। যে ব্যবস্থা করতে হয় করবেন আমাদের পেসেন্ট মিঃ হুইনক্লিক। কথাটা বললেন ডাক্তার।
মিঃ আরমান গভীর ভাবে ভাবছেন, যে ডাক্তারকে তিনি অতি সরল সহজ ভেবে এসেছেন এতদিন, সেই ডাক্তারের মধ্যে আত্মগোপন করেছিলো এক নরপশু। শুনেছিলেন আরমান এই হসপিটাল হওয়ার প্রাক্কালে ডাক্তার লোমান সহযোগিতা করেছিলেন এবং তিনি নিজ স্বার্থ ত্যাগ করে সর্বক্ষণ হসপিটালের প্রাঙ্গনে উপস্থিত থাকতেন। কথাগুলো শোনার পর মিঃ লোমানের প্রতি একটা শ্রদ্ধা আর বিশ্বাস দানা বেঁধে উঠেছিলো। যেমন করে গুণী মহৎ জনের প্রতি বিশ্বাস এবং শ্রদ্ধা জন্মায় তেমনি করে। আর আজ সে শ্রদ্ধা সে বিশ্বাস বালির বাঁধের মত ধসে পড়লো।
মিঃ আরমান, আপনি ভাবছেন এটা অন্যায়। আর আমি ভাবছি মোটেই অন্যায় নয়, কারণ একজনের দৃষ্টিশক্তি নিভে যাবে আর একজন দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাবে। মাঝখানে আমি পাবো একলক্ষ ডলার…..ডাক্তারের চোখ দুটো কেমন যেন অদ্ভুতভাবে জ্বলে উঠলো, লোভাতুর শার্দুলের মত।
