ঠিক ঐ মুহূর্তে একজন অর্ধবয়সী লোক বেরিয়ে এলো ড্রেসিং রুম থেকে–স্যার, চা না কফি দেবো?
মিঃ আরমান ক্ষণিকের জন্য চমকে উঠলেও পরক্ষণেই নিজকে সংযত করে নিয়ে বললেন–মাইথিং, তুমি এনাদের জন্য কফি আনো।
মাইথিং কাঁধের ভোয়ালেটা একটু ঠিকভাবে সরিয়ে রেখে ড্রেসিংরুমের দিকে ঝুঁকে বললো–মাইডিয়ার, চা নয় কফি তৈরি করে দাও……
পুলিশপ্রধান বললেন–আপনি এখানে এদের স্থান দিয়েছেন মানে চাকর বাকরকে…
স্যার, স্থান না দিয়ে কি করবেন উনি। উনার ফাদার যা কড়া মানুষ। কখন কি অসুবিধা উনার হয় এসব ভালভাবে নজর রাখার জন্যই তো আমাকে এবং আমার স্ত্রীকে এখানে পাঠানো হয়েছে। তবু কি স্যার স্বস্তি আছে, প্রায়ই উনার ফাদার আসেন দেখাশোনা করার জন্য…
পুলিশপ্রধান হেসে বললেন–আপনার ফাদার দেখছি অত্যন্ত সেকেলে মানুষ।
মিঃ আরমান কিছু বলবার পূর্বেই বলে ওঠে মাইথিং–সেকেলে বলেই তো এত লক্ষ্য তার চারদিকে। শুধু সন্তানের প্রতিই তার লক্ষ্য নয়, আমাদের প্রতিটা ব্যক্তির উপর তার ভীষণ খেয়াল যেন আমরা কেউ কষ্ট না পাই এবং সে কারণেই হোটেলে ছোট সাহেবের কামরায় স্থান করে। দিয়েছেন।
পুলিশপ্রধান বললেন–এটা বেআইনী, কারণ…
স্যার, একথা তিনি ভালভাবে জানেন অর্থাৎ সন্তানের বেলায় তিনি আইন–বেআইন কিছু মানেন না।
পুলিশ প্রধান কামরাগুলো ভালভাবে পরীক্ষা করে দেখলেন।
পুলিশপ্রধান এবং তার সহকারী দুজনকে কামরা তদন্ত করে দেখার সময় সাহায্য করলো মাইথিং। সমস্ত কক্ষ এবং বাথরুম ড্রেসিংরুম ও বেলকুনি সব ভালভাবে পরীক্ষা করে দেখলেন পুলিশ প্রধান ও তাঁর সহকারীদ্বয়।
অনেক সন্ধান করেও কাউকে খুঁজে পেলেন না তারা। শেষ পর্যন্ত বিফল মনে চলে গেলেন।
পুলিশপ্রধান এবং সহকারীদ্বয় বিদায় গ্রহণ করার পর মিঃ আরমান মাইথংবেশী বনহুরের করমর্দন করে বললেন–ধন্যবাদ, আপনারা নিজেদের বাঁচিয়ে নিতে পেরেছেন।
বনহুর বললো–আপনার সহযোগিতাই আমাদের এভাবে রক্ষা করেছে।
আশা হেসে বললো–একবার নয়, কয়েকবার এভাবে বেঁচে গেলাম আমরা কিন্তু এরপর আর রক্ষা নেই…..
তার পূর্বেই আমরা মিঃ আরমানকে মুক্তি দিয়ে চলে যেতে পারবো বলে আশা করছি।
*
অন্ধ হসপিটাল।
রাত তখন গভীর।
লণ্ডনের কোনো এক গীর্জা থেকে ভেসে এলো রাত তিনটা বাজার সংকেতধ্বনি।
মিঃ আরমান হসপিটালের নিজ ক্যাবিনে বসে কোনো কাজ করছিলেন।
এমন সময় ডাক্তার লোমান প্রবেশ করে বললেন–আপনি এখনও যাননি?
হাতে কিছু কাজ ছিলো শেষ করে নিলাম। বললেন–মিঃ আরমান এবং সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়ালেন।
ডাঃ লোমান বললেন–মিঃ আরমান, আপনি আজকাল বেশি কর্মপরায়ণ হয়ে উঠেছেন।
কেন এ কথা বললেন স্যার? এর পূর্বে কি আমি কাজে তৎপর ছিলাম না?
অবশ্যই ছিলেন তবু সময়মতই ফিরে যেতেন হোটেলে। আজকাল সব সময় আপনাকে হসপিটালেই পাই। এটা আমার পরম সৌভাগ্য বলে মনে করি।
স্যার, রোগীর সেবা করাই আমাদের ব্রত। বললেন মিঃ আরমান।
চক্ষুদান সেন্টারে আজ প্রায় পঁচিশটা চক্ষু গ্রহণ করা হয়েছে এর মধ্যে সাতজন জীবিত এবং বাকিগুলো মৃত ব্যক্তির। ডাক্তার কথাটা বলে তাকালেন মিঃ আরমানের মুখের দিকে।
স্যার, আমি আপনাকে এ ব্যাপারে সাহায্য করেছি, এ কারণে সবই আমার জানা আছে।
হসপিটালের লাইফে এতগুলো চক্ষু চক্ষুদান সেন্টারে জমা হয়নি।
হ্যাঁ স্যার, এ কথা মিথ্যা নয়। এত চক্ষু কোনো সময় চক্ষু সেন্টারে জমা হয়নি।
ডাক্তার একটু হেসে বললেন–মিঃ আরমান, চলুন আমি আপনাকে দেখাবো চক্ষুসেন্টার ছাড়াও আরও একটি সেন্টার আছে যেখানে আপনি কেন, হসপিটালের কেউ প্রবেশ করেনি।
মিঃ আরমান অবাক হলেন, বললেন তিনি–এমন কোনো সেন্টার অথবা কেন্দ্র এই হসপিটালে নেই যা আমার দেখা হয়নি। চলুন স্যার, যদি না-দেখা কিছু দেখতে পাই।
চলুন।
ডাক্তারের সঙ্গে এগিয়ে চললেন মিঃ আরমান।
হসপিটালের রোগীরা নিদ্রায় অচেতন।
কোনো কোনো ক্যাবিন থেকে সদ্য অপারেশন করা রোগীর যন্ত্রণাদায়ক আর্তকণ্ঠ ভেসে আসছে।
ডাক্তার বেলকুনি ধরে এগিয়ে গেলেন এবং একটা ছোট সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামলেন। সামনে একটা অদ্ভুত যন্ত্র, ডাক্তার যন্ত্রটি ঘুরালেন।
মিঃ আরমানের দৃষ্টিতে কোনোদিন এসব ধরা পড়েনি। আজ নতুন করে দেখছেন তিনি। এগুলো।
ডাক্তার বিস্ময়কর যন্ত্রটা ঘুরালেন, সঙ্গে সঙ্গে দেয়ালটা ফাঁক হয়ে গেলো।
ডাক্তার আর মিঃ আরমান–অন্য কেউ নেই আশেপাশে।
একটা শব্দ শোনা যাচ্ছে।
কেমন যেন অদ্ভুত সে শব্দ।
কট কট আওয়াজ।
ডাক্তার প্রবেশ করলেন দেয়ালে সুড়ঙ্গ ধরনের পথের মধ্যে।
সঙ্গে সঙ্গে নেমে চললো পথ বা সিঁড়িটা।
বেশ কিছু নিচে নামবার পর থেমে গেলো লিফটের মত বস্তু বা যানটা।
মিঃ আরমানকে নেমে আসার ইংগিত করলেন ডাক্তার।
হসপিটালের নিচে ভূগর্ভে এমন একটা কক্ষ আছে ভাবতে পারেন নি মিঃ আরমান।
ডাক্তার মিঃ আরমানকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতে দেখে হেসে বললেন–খুব অবাক লাগছে, তাই না?
মিঃ আরমান বললেন–হসপিটালের তলদেশে এমন একটা গবেষণাগার আছে জানতাম না।
জানতেন না বলেই আজ আপনাকে এখানে এনেছি। শুধু দেখবার জন্যই আনিনি, এনেছি। আরও কিছু…. থাক, সব এত তাড়াতাড়ি জেনে কাজ নেই। আসুন সব দেখিয়ে নিই।
মিঃ আরমান ডাক্তারের কথাবার্তায় একটু অবাক হচ্ছিলেন, কারণ ডাক্তারকে তিনি এমন করে কোনোদিন কথা বলতে শোনেননি। আজ তাকে বেশ সচ্ছ মনে হচ্ছে।
