মরিয়ম বেগম আর মনিরা নির্বাক দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে আছে নূরের দিকে।
যেমন পিতা তেমনি পুত্র ভাবছেন তারা ওর দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে।
নূর বুঝতে পারলো মা ও দাদীমার মনের কথা। উঠে দাঁড়িয়ে বললো– চলো তোমাদের পৌঁছে দিয়ে আসি।
মরিয়ম বেগম বললেন–তোর শরীর ভাল নয়। ড্রাইভার আমাদের পৌঁছে দেবে।
দাদীমা, তোমরা কি মনে করো আমি এত দুর্বল। এতটুকুতেই আমি কাবু হয়ে পড়বো? এসো আমার সঙ্গে। নূর জামটা গায়ে পরে নিয়ে বেরিয়ে পড়ার জন্য পা বাড়ালো।
মনিরা আর মরিয়ম বেগম নূরকে অনুসরণ করলো।
সিঁড়ি বেয়ে যখন নামছিলো তখন আলী বললো–স্যার, আপনি এ শরীর নিয়ে বাইরে যাচ্ছেন!
বললো নূর–এত ভাবতে হবে না, বুঝলি? যা নিজের কাজ করগে। সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসে সবাই।
নূর গাড়িতে বসে ষ্টার্ট দিলো।
ততক্ষণে মরিয়ম বেগম এবং মনিরা গাড়িতে উঠে বসেছেন।
*
চমকে বিছানায় উঠে বসলো বনহুর।
মিঃ আরমান তার শিয়রে দাঁড়িয়ে।
বনহুর বললো–কি সংবাদ বন্ধু?
সুখবর!
সত্যি বলছেন?
হাঁ।
বলুন?
সেই ব্যক্তি এসেছে?
কোন ব্যক্তি?
যাকে মাঝে মাঝে নিহত মিসেস জ্যাসিলিনের সঙ্গে কথাবার্তা বলতে দেখেছিলাম। লোকটা লেবাননবাসী বলে আমার মনে হয়।
তিনি কোথায়?
হোটেলের নিচতলায় গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে কারও প্রতীক্ষা করছেন। আসুন ঐ জানালার শার্শীর ফাঁকে তাকে দেখা যাবে।
বনহুর শয্যা ত্যাগ করে মিঃ আরমানের সঙ্গে জানালার পাশে এসে দাঁড়ালো।
তাকালো সে নিচের দিকে।
মিঃ আরমান একটা চকলেট কালারের গাড়ির পাশে দণ্ডায়মান একজন ব্যক্তিকে দেখিয়ে দিলেন আংগুল দিয়ে, বললেন–ঐ সেই ব্যক্তি যাকে মাঝে মাঝে নিহত মিসেস জ্যাসিলিনের সঙ্গে কথা বলতে দেখেছি।
বনহুর দেখলো অর্ধবয়সী এক লোক, লোকটাকে দেখে স্বাভাবিক বলে মনে হলো না। কেমন যেন উদ্ৰান্ত চেহারা। গায়ের রং কটা, চুলগুলো রুক্ষ, চোখের উপরে আঁটা রয়েছে কালো কাঁচের চশমা।
তীক্ষ্ণ দৃষ্টি মেলে দেখছিলো বনহুর।
মিঃ আরমান বললেন–লোকটাকে আমার সন্দেহ হয়, কারণ তাকে প্রায়ই মিসেস জ্যাসিলিনের সঙ্গে কথা বলতে দেখেছি। যদি কোনো মুহূর্তে কেউ এসে পড়েছে তখন মিসেস জ্যাসিলিনের পাশ থেকে দ্রুত সরে গেছে। এ ছাড়া বিভিন্ন কারণে তাকে আমার সন্দেহ হয়।
বনহুর ছোট একটা শব্দ করলো–হু। তার চোখ দুটো দীপ্ত হয়ে উঠলো।
এরপর ফিরে এলো বনহুর কক্ষে।
মিঃ আরমানও এসে বসে পড়লেন একটা সোফায়।
বনহুর সিগারেট কেসটা বের করে এগিয়ে ধরলো মিঃ আরমানের দিকে।
মিঃ আরমান একটা সিগারেট তুলে নিলেন।
বনহুর সিগারেটে অগ্নিসংযোগ করে পুনরায় ফিরে এলো সেই শার্শীর পাশে। একরাশ ধূম্র উদ্গীরণ করে ভালভাবে লক্ষ্য করতে লাগলো।
মিঃ আরমান বললেন–নিশ্চয়ই এই ব্যক্তি মিসেস জ্যাসিলিনকে হত্যা করেছে।
সন্দেহ সঠিক হতেও পারে। তবে আমি আরও কিছুটা বেশি ক্লসগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছি মিঃ আরমান। কথাটা বলে ফিরে এলো বনহুর আরমানের পাশে। একটা চেয়ার টেনে বসে পড়ে বললো–মিসেস জ্যাসিলিনের হত্যা রহস্যের সঙ্গে জড়িত আছে আরও একজন।
মিঃ আরমান অবাক কণ্ঠে বললেন–সত্যি বলছেন?
হা মিঃ আরমান! আমি পূর্বেই বলছি মিসেস জ্যাসিলিনের হত্যারহস্য উদঘাটন প্রায় সমাপ্ত হয়ে এসেছে। তারই সঙ্গে আরও একটি রহস্যের সমাধান হবে বলে আমি আশা করছি। এ ব্যাপারে আমি আপনার অজ্ঞাতে আপনার সহযোগিতা পেয়েছি মিঃ আরমান।
মিঃ আরমান বনহুরের কথায় বিস্ময়ভরা চোখে তাকালেন তার মুখের দিকে। তার অজ্ঞাতে তার সহযোগিতা পেয়েছে–সে কেমন কথা!
মিঃ আরমানকে বিস্ময় প্রকাশ করতে দেখে বনহুর হাসলো এবং বললো–আপনার সহযোগিতা ছাড়া আমার এগুনো সম্ভব হতো না। আপনাকে সব জানাবো। শুধু জানিয়েই ক্ষান্ত হবোনা, সব নিজে অনুধাবন করবেন। একটু থেমে বললো বনহু–গভীর এক রহস্য লুকিয়ে আছে ঐ অন্ধ হসপিটালের অভ্যন্তরে…..
এ আপনি কি বলছেন?
হ যা বলছি সত্য!
এমন সময় আশা এসে দাঁড়ায় সেখানে।
মিঃ আরমান বলে–বসুন গল্প করা যাক।
আশা আসন গ্রহণ করে।
আশা বললো–এমনিভাবে আত্মগোপন করে আর কতদিন থাকা যায় বলুন মিঃ আরমান? হাঁপিয়ে উঠেছেন বুঝি? বললেন মিঃ আরমান।
বনহুর বললো–মিঃ আরমান, আমাদের আত্মগোপন করার ব্যাপারটা আপনার আন্তরিক সহযোগিতা ছাড়া কিছুতেই সম্ভব হতো না।
তবু যদি সফলতা অর্জন করতে পারেন তাহলে আমিও সার্থক হবো। আমি নিজেই চাই মিসেস জ্যাসিলিনের মৃত্যুরহস্যের উদঘাটন।
বাইরে কোনো শব্দ শোনা যায়।
মিঃ আরমান সতর্কভাবে উঠে দাঁড়ালেন এবং শার্শীর ফাঁকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলে উঠলেন–পুলিশপ্রধান ও তাঁর দুজন সহকারী এসেছে। হয়তো তারা কোনো রকম সন্দেহ করে বসেছেন। কাছেই আপনারা ড্রেসিংরুমে গিয়ে আত্মগোপন করুন……
বনহুর আর আশা ড্রেসিংরুমে গেলো।
একটু পরেই দরজা খুলে দিলেন মিঃ আরমান।
পুলিশপ্রধান এবং তাঁর দুজন সহচর প্রবেশ করলেন মিঃ আরমানের কক্ষে। তাঁদের হাতে রিভলভার। পুলিশপ্রধান বললেন–এই কামরায় আমরা তদন্ত চালাবো।
বললেন মিঃ আরমান–আমার কামরায় সন্দেহের কারণ?
কারণ আমরা জানাতে রাজি নই। বললেন পুলিশ সুপার।
মিঃ আরমান দ্বিধাজড়িত কণ্ঠে ভ্রুকুঞ্চিত করে বললেন–বেশ দেখুন… মুখ কথাটা উচ্চারণ করলেও মনের ভিতরে একটা দুরু দুরু ভাব ছিলো।
