আস্তানার কাছাকাছি এসে গেছে তারা।
ফুল্লরাকে নামিয়ে নিলো জাভেদ।
বললো ফুল্লরা– জাভেদ! জাভেদ তুমি কত ভাল!
জাভেদ ফুল্লরার দিকে একবার তাকিয়ে জাম্বির পিঠে উঠে বসলো। তারপর অশ্ব নিয়ে ছুটে চলে গেলো সেখান থেকে।
ফুল্লরা এতক্ষণ উচ্ছল আনন্দে গদগদ হয়ে পড়েছিলো। এবার সে স্নান হয়ে গেলো। কই, জাভেদ তো একটিবার তার সঙ্গে তেমন করে কথা বললো না। তার ভাবধারায় তো একটুও পরিলক্ষিত হলো না সে তাকে ভালবাসে, তবে কি জাভেদ তাকে অনুগ্রহ করে….
ফুল্লরার বুক চিরে বেরিয়ে এলো একটা দীর্ঘশ্বাস।
*
নূর, এ তোর কি অবস্থা হয়েছে? নূরের দিকে তাকিয়ে বললেন বৃদ্ধ মরিয়ম বেগম।
মনিরা এক গ্লাস গরম দুধ নিয়ে নূরের মুখে ধরে বললো–একটু খেয়ে নাও, সুস্থ বোধ করবে বাবা।
তোমরা অহেতুক চিন্তিত হচ্ছে, আমি ভাল আছি। জেনে রাখো আম্মি, আমিও কম নই। ঐ দস্যু ছোকরাটাকে দেখে নেব। সে আমাকে একবার নয় দুবার সংজ্ঞাহীন অবস্থায় নিয়ে গেছে। আমাকে সে শুধু হত্যাই করতে চায়নি, সে আমাকে চরম আঘাত হেনেছে।
এখন তুমি অসুস্থ বাপ, কাজেই কাউকে নিয়ে চিন্তা করো না। আগেই বলেছি কারও প্রতি অন্যায় আচরণ করো না। কথাগুলো বললো মনিরা।
মরিয়ম বেগম বললেন– শক্তির পরীক্ষা দেখাতে গিয়ে শেষে বিপদে পড়বি!
আমি কি বিপদকে ভয় করি যে তুমি এ কথা বলছো? নূর শয্যায় অর্ধশায়িত অবস্থায় কথাগুলো বললো। তারপর পুনরায় বললো–অন্যায় আমি কিছু করিনি। আমি শুধু শায়েস্তা করবো এই এটা আমার কর্তব্য বটে।
নূর, তুমিও দেখছি তোমার আব্বুর মত জেদী হচ্ছ।
জেদী আমি হইনি, এটা আমার জন্মগত চরিত্র–দাতে দাঁত পিষে কথাগুলো বললো নুর।
এমন সময় নূরের ভৃত্য আলী এসে দাঁড়ালো–স্যার, ঐ লোকটা চলে যাবে তাই দেখা করতে চায়।
নূর বললো–কে, রহমান চাচা?
হা স্যার।
ডাকো এখানে।
আলী চলে গেলো, একটু পরে ফিরে এলো রহমানসহ।
রহমানকে লক্ষ্য করে বললো নূর–রহমান চাচা, তুমি চলে যাবে?
হাঁ, আমার অনেক দূর যেতে হবে। বললো রহমান।
মনিরা অনেকদিন দেখেনি রহমানকে, প্রথমে সে চিনতেই পারছিলো না। নূর যখন তাকে রহমান চাচা বলে ডাকলো তখন সে চিনতে পারলো এবং বিস্ময়ভরা কণ্ঠে বললো–রহমান তুমি!
হাঁ বৌরাণী, আমি।
তোমার এমন অবস্থা হলো কি করে? রহমানের হাতবিহীন দেহটার দিকে তাকিয়ে কথাটা বললো মনিরা।
রহমান বললো–সে অনেক কথা বৌরাণী। সময় করে এক দিন আসবো, তখন বলবো।
মাকে রহমানের সঙ্গে স্বাভাবিক কণ্ঠে কথা বলতে দেখে নূর কিছুটা অবাক হয়ে বললো–আম্মি, রহমান চাচাকে তুমি চিনতে পেরেছো?
হ পেরেছি! বললো মনিরা।
রহমান একটু হেসে বললো–তুমি চিনতে পেরেছো আর বৌরাণী চিনতে পারবেন না? এবার তবে যাই ছোট সাহেব।
আচ্ছা এসো। বললো নূর।
রহমান সালাম জানিয়ে বেরিয়ে গেলো।
মনিরা বললো–রহমান তোমাকে….
হাঁ আম্মি, রহমান চাচা আমাকে…..
উদ্ধার করে এনেছে, তাই না?
যদি মনে করো তাহলে তাই, তবে সব ঐ আল্লাহতায়ালার ইচ্ছা। তারপর মূল সমস্ত ঘটনা মনিরাও মরিয়ম বেগমের কাছে বর্ণনা করে শোনালো।
সব শুনে বললেন মরিয়ম বেগম–নিশ্চয়ই কোনো দস্যু তোকে নাজেহাল করার চেষ্টা চালিয়ে এসেছে।
গম্ভীর কণ্ঠে বললো মনিরা–শুধু নাজেহাল নয়, একেবারে ওকে হত্যা করার উদ্দেশ্য নিয়েই এই চক্রান্ত চলেছে এবং সেই যুবক দস্যু নিশ্চয়ই তোমার সন্তানেরই অনুচর তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ভাগ্যিস রহমান নূরকে দেখেছিলো তাই রক্ষা।
মরিয়ম বেগম পুত্রবধূর কথায় কোনো জবাব দিতে পারলেন না, কারণ তিনি অনেককিছু জানেন যে কারণে তিনি নীরব রইলেন।
নূর পায়চারী করতে লাগলো।
মনিরা নির্বাক দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে রইলো সন্তানের মুখের দিকে।
ভাবছে নূর ঐ তরুণ দস্যুর কথা।
যে দস্যু তাকে একবার নয় দুবার পাকড়াও করে নিয়ে গেছে এবং নানাভাবে লাঞ্ছিত অপমানিত করেছে। শুধু অপমানিতই নয়, তাকে হত্যা করার কৌশল এঁটেছে। নূর রাগে–ক্ষোভে দাঁত পিষতে থাকে।
মরিয়ম বেগম বললেন–এবার তোর আব্বু এলে তাকে কেমন করে বকুনি দিতে হয় তা দেখে নিবি। আমি এতদিন অনেক কিছু সহ্য করেছি, এখন তার এসব বাড়াবাড়ির উচিত শিক্ষা দেবো।
দাদীমার কথায় নূর হাসিতে ফেটে পড়লো। অদ্ভুত সে হাসি, ওর হাসি যেন থামতেই চায় না।
মরিয়ম বেগম আর মনিরা স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে নূরের মুখের দিকে।
মরিয়ম বেগম দেখছেন, এ যে তার সন্তানেরই প্রতিচ্ছবি। সেই খামখেয়ালী অদ্ভুত হাসি। বড় সুন্দর অদ্ভুত অপূর্ব লাগে ওর হাসিটা। মরিয়ম বেগম তার সন্তানকে বহুবার এমনি করে হাসতে দেখেছেন, আজ সেই হাসির হুবহু নকল যেন নূরের হাসি।
ঠিক মনিরার মনেও সেই ভাবের উদ্বেগ।
স্বামীকে সে এমন ভাবেই হাসতে দেখেছে। বহুবার দেখেছে। বিস্ময়কর সে হাসি, অদ্ভুত সে হাসি। অবাক হয়ে তাকিয়ে থেকেছে মনিরা স্বামীর মুখের দিকে স্বামীর হাসিটা যেন তার শরীরে শিহরণ জাগায়, নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখেছে সে। আজ মনিরা পুত্রের মুখে সেই হাসি দেখছে–অদ্ভুত সুন্দর লাগছে নূরকে….।
নূর আম্মি আর দাদীমাকে তার দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে থাকতে দেখে বলে উঠলো–কি দেখছো তোমরা অমন করে? আমার হাসি, তাই না? জানো আম্মি, দাদীমার কথায় আমার বড় হাসি পাচ্ছে আজ। তোমরা ভাবছো কেন হাসির আবার কি হলো? দাদীমা বললেন এবার তার সন্তান এলে খুব করে বকে দেবেন! হায়রে দাদীমা, আজও তোমার সন্তানকে তুমি চিনলে না। হাঙ্গেরী কারাগার যাকে আটকে রাখতে পারেনি, কান্দাই পুলিশবাহিনী যাকে পাকড়াও করেও ধরে রাখতে পারেনি। এমন কি প্রখ্যাত পুলিশসুপার মিঃ জাফরী যার কাছে মাথা নত করেছেন তাকে তুমি বকুনি দিয়ে কাবু করবে? হায়রে দুরাশা। নূর কথাটা বলে সোফায় ধপ করে বসে পড়লো।
