ঠিক যেমনি করে বনহুর হাসে।
ফুল্লরা অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। সে সর্দারকে ঐ ভাবে হাসতে দেখেছে। বড় অদ্ভুত সে হাসি, এমন করে বুঝি কেউ হাসতে পারে না।
জাভেদের হাসি যেন থামতে চায় না।
জাভেদ হাসছে।
ফুল্লরা বললো–আমার কথায় তুমি হাসছে। বেশ, আমিও আর আসবো না তোমার কাছে। এলে আমার বয়েই যাবে।
জাভেদ তখন গম্ভীর হয়ে পড়েছে।
সে একবার ফুল্লরার দিকে তাকিয়ে ঐ স্থান ত্যাগ করলো।
ফুল্লরা ভাবতে লাগলো ওকে কেমন করে জব্দ করবে। কেমন করে ওকে আকৃষ্ট করবে। জাভেদকে ফুল্লরা ছোটবেলা হতে দেখে আসছে, ওর মধ্যে প্রেম–ভালবাসার কোনো চিহ্ন নেই। কাজেই ফুল্লরার রূপ–যৌবন তাকে আকৃষ্ট করতে পারবে না। এটা সে জানে, তাই নতুন কোনো একটা ফন্দি ভাবতে লাগলো।
হঠাৎ একটা বুদ্ধি তার মাথায় এলো।
জাভেদের অশ্বটাকে লুকিয়ে রাখলে নিশ্চয়ই সে খুঁজে খুঁজে হয়রান হবে তখন এসে বলবে তার ঘোড়াটা কোথায় আছে সে জানে। নিশ্চয়ই ফুল্লরাকে তখন তোষামোদ করবে আকুতি মিনতি করে। মজাটা হবে তখন….
ফুল্লরা সোজা চলে গেলো অশ্বশালায়।
একটা একটা করে সে অশ্বগুলো লক্ষ্য করলো, পাশে শক্ত করে বাঁধা আছে জাভেদের অশ্বটা।
ফুল্লরা ওর চেহারা দেখে খুশি ছিলো না কোনোদিন, কারণ জাভেদের অশ্বটার দেহ এবং চোখমুখ ছিলো অতি ভয়ংকর। যেমন ভয়ংকর তেমনি দুর্দান্ত।
তবু ফুল্লরা সাহস করে এগিয়ে গেলো।
ভীতভাবে অশ্বের মুখের দিকে তাকালো ফুল্লরা বারবার, তারপর লাগাম খুলে নিলো।
জাভেদের অশ্বটা যে পাশে বাধা ছিলো সেই পাশে ছিলো উঁচু একটা পাথরখণ্ড। ফুল্লর সেই পাথর খণ্ডটার উপরে উঠে দাঁড়ালো, তারপর জাভেদের অশ্বের লাগাম হাতের মুঠায় চেপে ধরে অশ্বপৃষ্ঠে বসলো।
সঙ্গে সঙ্গে অশ্বটা দ্রুত বেরিয়ে এলো অশ্বশালা থেকে।
ফুল্লরা তাকে কিছুতেই বাধা দিতে পারলো না। অশ্বটা ভীষণভাবে ছুটতে শুরু করলো। বনজঙ্গল ভেদ করে ছুটলো।
জাভেদ সেই পথ ধরে ফিরছিলো।
তার পাশ কেটে ঝড়ের মত চলে গেলো তারই অশ্ব এবং অশ্বপৃষ্ঠে ফুল্লরা। সে এলোমেলোভাবে ঝুলন্ত অবস্থায় অশ্বের লাগাম ধরে বসে আছে।
জাভেদ অবস্থাটা অনুধাবন করলো এবং ফুল্লরার বিপদাপন্ন পরিস্থিতি লক্ষ্য করে সে ছুটলো আস্তানা অভিমুখে। এত দ্রুত সে ছুটলো যে অল্প সময়েই পৌঁছে গেলো আস্তানায়।
অশ্বশালায় প্রবেশ করে তাজের লাগাম খুলে নিলো। চেপে বসলো ওর পিঠে। মুহূর্ত বিলম্ব না করে ছুটলো জাভেদ তার নিজের অশ্ব পৃষ্ঠে ফুল্লরা যে পথে চলে গেছে সেই পথে। তাজ উল্কাবেগে ছুটলো বনজঙ্গল পেরিয়ে। তাজের খুরের প্রতিধ্বনি কান্দাই জঙ্গলের জীবজন্তুকে আতঙ্কিত করে তোলে।
কিছুক্ষণের মধ্যে জাভেদের কানে ফুল্লরার অপদশব্দ ভেসে এলো।
এবার জাভেদ সেইদিকে ছুটলো।
তার অশ্ব জাম্বি কত দুর্দান্ত এটা জানে জাভেদ। সাধ্য নেই কেউ ওকে আয়ত্তে আনে একমাত্র জাভেদ ছাড়া। না জানি ফুল্লরাকে সে এতক্ষণে পিঠ থেকে ফেলে দিয়ে পায়ে পিষে ফেলেছে কিনা।
জাভেদ ছুটছে তো ছুটছেই।
তাজের খুরের আওয়াজ পাথুরিয়া মাটিতে ভীষণভাবে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।
বন-জঙ্গলে পশু-পাখি সে আওয়াজে প্রকম্পিত হলো। গাছের পাতাগুলো যেন কাঁপছে থরথর
বনবাদাড় জলা পাথরখণ্ড ডিংগিয়ে ছুটছে। এক একটা টিলার উপর দিয়ে প্রচণ্ডভাবে লাফিয়ে পার হয়ে যাচ্ছে তাজ।
তাজ বুঝতে পেরেছে জাম্বিকে ধরতে হবে, তাকে পরাজিত করতে হবে, তাই তাজ প্রাণপণে ছুটছে। জাভেদ তাজের পিঠে বসে লাগাম চেছে ধরে আছে। সে এক ভীষণ দৃশ্য যেন।
জাভেদ একসময় দেখতে পেলো দূরে বিদ্যুৎ গতিতে ছুটছে জাম্বি আর ফুল্লরার দেহ অর্ধ ঝুলন্ত অবস্থায় জাম্বির পিঠে।
জাভেদ তাজকে এমনভাবে অন্য পথে চালনা করলো যে জাম্বিকে সে পাকড়াও করতে পারে। সোজা পথে নয়, এলোপাতাড়ি পথে তাজ জাম্বির পাশাপাশি এসে পড়লো।
ঐ মুহূর্তে জাম্বির পৃষ্ঠদেশ হতে তুলে নিলো জাভেদ ফুল্লরাকে এবং তাজসহ দাঁড়িয়ে পড়লো কিছুদূর গিয়ে…..।
জম্বিও ততক্ষণে বেশ কিছুটা দৌড়ে গিয়ে থামকে দাঁড়িয়ে পড়েছে।
জাভেদ ফুল্লরাসহ নেমে পড়লো তাজের পিঠ থেকে। ফুল্লরা ভাবতেও পারেনি জাভেদ তাকে এভাবে উদ্ধার করতে এগিয়ে আসবে।
ক্ষণিকের জন্য হলেও ফুল্লরা জাভেদের কণ্ঠ বেষ্ঠন করে ধরলো এবং তার দেহের পরশ তাকে অভিভূত করলো। ফুল্লরা যেন আত্মহারা হয়ে পড়লো।
জাভেদ এবার ফুরাকে সোজা দাঁড় করিয়ে দিয়ে দ্রুত এগিয়ে গেলো জাম্বির দিকে।
জাম্বি তখনও পাগলামি করছিলো।
জাভেদ ওকে ধরে ফেললো তারপর টেনে আনলো ফুল্লার পাশে। ফুল্লরাকে লক্ষ্য করে বললো জাভেদ–এমন কাজ কেন করতে গিয়েছিলে? জাম্বিকে তুমি চেনো না সে কত ভয়ংকর।
ফুল্লরা কোনো জবাব দিলো না।
সে একবার দৃষ্টি তুলে ধরলো জাভেদের মুখের দিকে, তারপর চোখ দুটো নত করে নিলো।
জাভেদ এবার ফুল্লরাকে তাজের পিঠে তুলে দিলো, তারপর নিজে চেপে বসলো জাম্বির পিঠে। তার হাতের মুঠায় তাজের লাগাম।
ফুল্লরার অশ্বের লাগাম ধরে নিয়ে চললো জাভেদ। অপূর্ব এক অনুভূতিতে ফুল্লরার মনটা নেচে উঠলো। কিছুক্ষণ পূর্বেও ফুল্লরা মৃত্যুভয়ে আতঙ্কিত ছিলো আর এখন সে আনন্দে উচ্ছল হয়ে উঠলো। ফুল্লরার জীবন আজ ধন্য সত্যি জাভেদ তাকে ভালোবাসে। সে না বুঝে ভুল করেছে… নানা ধরনের চিন্তা ফুরাকে উচ্ছল করে তুললো। কতক্ষণ লাগলো খেয়াল নেই হঠাৎ ফুল্লরার চিন্তাজাল বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলো।
