নূর তাকালো নূরীর দিকে।
রহমান বুঝতে পারলো নূরীর সাথে তার কোনো সম্পর্ক আছে কিনা। তাই জানতে চাচ্ছে নূর। তাই সে বললো…. ও আমার বোন। ও তোমাকে স্নেহ করে… যাক ওসব কথা, এবার তোমাকে কান্দাই শহরে তোমার বাসভবনে পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে।
নূর উঠে দাঁড়াতে গেলো।
রহমান বললো–বিলম্ব করতে হবে, না হলে পুনরায় অসুস্থ হয়ে পড়বে।
আর আমি অসুস্থ হবো না রহমান চাচা।
নূর
তোমার স্মরণ আছে আমার নাম রহমান চাচা!
হা স্মরণ আছে। তুমি আমাকে কত ভালবাসতে আদর করে কত কি খেতে দিতে, সব মনে আছে আমার।
নূর, এই যে আমার বোনকে দেখছো সেও তোমার একজন পরম, হিতাকাক্ষী……
আমি জানি ও আমার জন্য অনেক কষ্ট স্বীকার করেছে। আমাকে সে কারাগার থেকে মুক্ত করে দিয়েছে নিজের জীবন বিপন্ন করে। সেজন্য আমি কৃতজ্ঞ।
নূরীর চোখ দুটো ছল ছল করে উঠলো।
নূরকে সে কোলে কাখে করে মানুষ করেছিলো শিশু কালে। নিজের ছেলের চেয়েও কোনো অংশে কম ছিলোনা নূর তার কাছে। নূরীর চোখের সামনে ভেসে উঠলো বনহুর যখন নূরকে তার মায়ের কোল থেকে হরণ করে তার কোলে অর্পিত করেছিল। ছোট্ট ছিলো তখন নূর নাম রেখে ছিলো তার মনি। ওর সেই কচি মুখখানা আজও ভোলেনি নূরী। তার হুরের মত ওরও দক্ষিণ বাহুতে ছিলো একটি কালো জট। নূরীর বড় দেখতে ইচ্ছা করলো ওর দক্ষিণ বাহুখানা।
নূরী এগিয়ে গেলো তারপর ওর বাহুর জামাটা তুলে ধরে নিৰ্ণিমেষ নয়নে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ।
অবাক হলো নূর ওর আচরণে তবু নিশ্চুপ রইলো না অবাক হয়ে শুধু লক্ষ্য করতে লাগলো।
নূরী একটা দীর্ঘশ্বাস চেপে গেলো অতি সাবধানে।
নুর বুঝতে পারলো তার দক্ষিণ হাতের জটটি লক্ষ্য করে কিছু ভাবছে সে।
রহমান নূরীর দুর্বলতা বুঝতে পেরে তাড়াতাড়ি বললো–চলো তোমাকে পৌঁছে দিয়ে আসি।
কোথায়?
তোমার বাসায়।
চল, কিন্তু…..
কিন্তু কি?
ও… নূরীর দিকে তাকিয়ে বললো নূর।
রহমান বুঝতে পারলো নূরীকে ছেড়ে চলে যেতে দুঃখ হচ্ছে খুব। বললো রহমান–ও ফিরে যাবে তার নিজের বাসায়।
নূরী এগিয়ে এলো, বললো সে বাবু তুমি আর এসোনা। এখানে অনেক বিপদ আছে…
নূরীর কথায় নূর কোনো জবাব দিলো না। সে শুধু নীরবে তাকে অভিনন্দন জানিয়ে বিদায় নিলো।
হাত নাড়ালো নূরী।
চোখ দুটো তার ছল ছল হয়ে এসেছিলো।
এখানে যখন নূর রহমানসহ কান্দাইয়ের পথে রওয়ানা দিলো তখন জাভেদ ফিরে এসেছে আস্তানায়। ক্রুদ্ধ সিংহের মত তাকে ভীষণ মনে হচ্ছিলো।
সে একটি গাছের ছায়ায় বসলো।
যত রাগ তার মায়ের উপর। কারণ তরুণ ডিটেকটিভটাকে সে সায়েস্তা করতে চেয়েছিলো, সব বানচাল হয়ে গেলো।
নূরী যে বন্দীকে মুক্ত করে দিয়েছে তা ভালভাবে জানে এবং নিজের চক্ষে সে তাকে দেখেছে, কাজেই মায়ের উপর রাগ হওয়াটা তার স্বাভাবিক।
জাভেদ যখন একটি গাছের তলে বসে মনে মনে ক্রুদ্ধ হয়ে উঠছিলো তখন ফুল্লরা পেছন থেকে এসে একটা লম্বা কাঠি নিয়ে ওর মাথার চুলে নাড়া দিলো।
চমকে ফিরে তাকালো জাভেদ।
ফুল্লরা উচ্ছল হাসিতে ফেটে পড়লো।
জাভেদ রাগতভাবে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে অন্যদিকে তাকালো।
ফুল্লরা এবার সামনে এসে দাঁড়ালো।
জাভেদ পুনরায় দৃষ্টি অন্যদিকে ফেরালো, ফুল্লরার প্রতি তার রাগ এ কারণে, কেন সে তাকে এ ভাবে বিরক্ত করে। কেন তার কাছাকাছি আসে ফুল্লরা, জাভেদ আপনাতে আপনি বিভোর থাকতে চায়।
আর ফুল্লরা সে চায় জাভেদকে আপন করে নিতে। জাভেদ তার হৃদয় জুড়ে স্থান করে নিয়েছে, জাভেদের হাসি তার কণ্ঠস্বর, তার চলাফেরা সব তাকে আকৃষ্ট করেছে। এ ছাড়াও ফুল্লরা ছোটবেলা হতেই দেখে আসছে জাভেদকে। ও যে ওর খেলার সাথী…..
ফুল্লরা ওকে যত ভালবেসেছে, জাভেদ ওকে তত দূরে ঠেলে দিয়েছে। ফুল্লরা যেন ওর চোখের বালি। ওকে দেখলেই জাভেদের মুখমণ্ডল গম্ভীর হয়ে ওঠে।
তেমনি ফুল্লরাও নাছোড়বান্দা।
প্রথম প্রথম ও যে অভিমান করতো, ব্যথায় মুষড়ে পড়তো কিন্তু এখন সে শক্ত করে নিয়েছে মনটাকে। একটুতেই ঘাবড়ে যায় না বা রাগ করে না।
জাভেদ আজ যখন ফুল্লরাকে দেখে মুখ ফিরিয়ে নিলো তখন ফুল্লরা এসে দাঁড়ালো তার সম্মুখে। আঁচলে কিছু বন ফুল সে এনেছিলো সেই ফুল সে ছড়িয়ে দিলো জাভেদের মাথার উপরে।
এতে জাভেদ আরও রেগে গেলো, কিন্তু কোনো কথা না বলে সে একবার ক্রুদ্ধদৃষ্টি মেলে তাকালো ফুল্লরার দিকে।
ফুল্লরা হেসে বললো–জাভেদ ফল খাবে?
আঁচল থেকে একটা সুমিষ্ট পাকা ফল বের করে দেখালো সে জাভেদকে।
জাভেদ তাকালো কিন্তু কোনো উত্তর সে দিলো না।
ফুল্লরা মনে করলো ফলটা হয়তো সে নেবে। কিন্তু কোন লক্ষণ নেই ফল নেবার।
ফুল্লরা ফলটা হাতে নিয়ে ওর পাশে ঘনিষ্ঠ হয়ে দাঁড়িয়ে ফলটা তুলে ধরলো ওর মুখের কাছে।
জাভেদ ফলটা নিয়ে ফেলে দিলো।
ফুল্লরার দুচোখ ছাপিয়ে পানি এলো, সে অধর দংশন করতে লাগলো।
জাভেদ চলে যাচ্ছিলো।
ফুল্লরা ওর পথ আগলে দাঁড়ালো। বললো সে যেতে পারবে না।
জাভেদ দুচোখে বিস্ময় এনে বললো–কেন?
তুমি জবাব দাও কেন আমার দেওয়া ফলটা ছুঁড়ে ফেলে দিলে?
আমার হাত পা আছে, গাছ থেকে পেড়ে খাবো। তোমার দেওয়া ফল আমি খেতে যাবো কেন। সরে দাঁড়াও, আমাকে যেতে দাও।
না, তোমাকে যেতে দেবো না! আচ্ছা জাভেদ, তোমার মন বলে কি কিছু নেই।
হঠাৎ জাভেদ অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো।
