এবার প্রচণ্ড এক ধাক্কায় নূরকে জাভেদ ফেলে দেয় নিচে একেবারে নদীবক্ষে।
জাভেদ ওকে নিক্ষেপ করে সোজা হয়ে দাঁড়ালো।
পাথরে মাথা ঠুকে রক্তে রাঙা হয়ে উঠেছে জাভেদের মাথাটা। কপাল বেয়ে রক্ত ঝরছে।
জাভেদ তাকিয়ে দেখলো নদীবক্ষে নূর তলিয়ে গেলো।
এমন সময় রহমান আর নূরী এসে দাঁড়ালো সেখানে। পেছন থেকে তারা জাভেদকে ঝুঁকে নদীবক্ষে লক্ষ্য করতে দেখে বুঝতে পারলো নূরকে নদীবক্ষে সে নিক্ষেপ করেছে।
রহমান আর নূরী মুখ চাওয়া চাওয়ি করে নিয়ে নূরী বললো–সর্বনাশ হয়ে গেছে, নূরকে জাভেদ নদীবক্ষে ফেলে দিয়েছে। ছুটে যাচ্ছিলো নূরী জাভেদকে সে কিছু কঠিন কথা বলবে কিন্তু রহমান বাধা দিয়ে বললো–থাক কিছু বলনা নূরী, যা হবার হয়ে গেছে আমি দেখছি।
রহমান দৌড়ে নেমে গেলো পাহাড়ের গা বেয়ে কিছুটা নিচে। ঐ স্থান থেকে নূর যেখানে পড়ে গেছে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।
মুহূর্ত বিলম্ব না করে ঝাঁপিয়ে পড়লো রহমান নদীবক্ষে। যদিও রহমানের একটা হাত নেই তবু সে সাঁতারে কম নয়, দক্ষ সাতারুর মত সাঁতার কেটে এগুলো।
অবশ্য নূরও সাঁতার জানে, সেও একজন দক্ষ সাতারুর চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।
তবে আজ সে আহত, তাই নিজকে প্রচণ্ড ঢেউয়ের মুখে ধরে রাখতে পারছিলো না। নদীবক্ষে নিক্ষিপ্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তলিয়ে গেছে সে।
রহমান সাঁতার কেটে ঐ স্থানে উপস্থিত হওয়ার পূর্বে ঢেউ প্রচণ্ডভাবে বাধার সৃষ্টি করতে লাগলো, তবুও রহমান প্রাণপণ চেষ্টা চালাচ্ছে যেমন করে থোক নূরকে রক্ষা করতেই হবে।
ওদিকে নূরীর বুকটা ধক ধক্ করছে। সে বারবার আল্লাহর নাম স্মরণ করছে।
নূরকে এখনও কিছু কিছু নজরে আসছে।
সেও সাঁতার কেটে ওঠার আপ্রাণ চেষ্টা করছে।
জাভেদ ওকে নদীবক্ষে নিক্ষেপ করে ফিরে চললো জয়ী সৈনিকের মত বলিষ্ঠ পদক্ষেপে।
*
রহমান যখন নূরকে ধরে ফেললো তখন নূর সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলেছে। রহমান একটা হাত দিয়ে ওকে ধরে রাখবে না সাঁতার কাটবে ভেবে পেলো না। সে প্রথম একটু হকচকিয়ে গেলেও পরক্ষণে তার মাথায় একটা বুদ্ধি এলো, দাঁত দিয়ে সে নূরের জামা ধরলো তারপর সে সাঁতার কেটে তীরের দিকে এগুতে লাগলো।
নূরী পাহাড়ের উপর থেকে নেমে এলো নদীর ধারে এবং উত্তেজনা নিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলো। তার মনে ভীষণ একটা ঝড় সৃষ্টি হয়েছে, সে ভাবতে পারছে না নূরের এমন একটা বিপদ ঘটবে।
কিছুটা নিকটে আসতেই প্রচণ্ড ঢেউগুলো পুনরায় নূরসহ রহমানকে ঠেলে নিয়ে গেলো দূরে।
নূরী বিলম্ব না করে একটা বড় শুকনো কাঠ টেনে নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লো কারণ সেও সাঁতার জানতো ভালভাবে।
এবার নূরী সাঁতার কেটে এগুতে লাগলো যদিও প্রচণ্ড ঢেউগুলো তাকে সাঁতার কাটায় বাধার সৃষ্টি করছিলো তবু নুরী আপ্রাণ চেষ্টায় সে বাধা অতিক্রম করে পৌঁছে গেলো রহমান ও নূরের কাছে।
সে রহমানকে সাহায্য করলো।
কাঠের খণ্ডটা রহমানের হাতের নিচে ঠেলে ধরলো।
রহমান নূরের জামাটা ধরে ছিলো দাঁত দিয়ে কামড়ে। এবার হাতখানা দিয়ে ধরে ফেললো কাঠের খণ্ডটা।
রহমান এবার নূরসহ তীরের দিকে এগুলো।
নূরীও তীরে পৌঁছে গেলো।
উভয়ে মিলে নূরকে তুলে আনলো তীরে।
নূরের সংজ্ঞাহীন দেহটা তীরের মাটিতে শুইয়ে দিয়ে নূরী আর রহমান তার সংজ্ঞা ফিরে আনার চেষ্টা করতে লাগলো।
রৌদ্রতাপে শুকিয়ে এলো ওদের দেহ এবং জামাকাপড়।
নূর ধীরে ধীরে চোখ মেললো এক সময়।
রহমান এবার নূরকে লক্ষ্য করে বললো–কোনো ভয় নেই ছোট সাহেব, আমি।
তুমি! অস্পষ্টভাবে উচ্চারণ করলো নূর।
রহমানকে দেখে বিস্মিত হলো৷ রহমানকে সে ছোটবেলায় বহুবার দেখেছে আজও তার সেই চেহারা মোটেই বিস্মিত হয়নি বেশ স্পষ্ট মনে আছে তাকে।
একটা হাত না থাকায় রহমান অসুবিধা বোধ করছিলো তবু নূরের মাথাটা সে তুলে নিলো কোলে। তারপর সেই সহকারে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো।
নূরী পাশে বসেছিলো।
নূর একবার তাকে তাকিয়ে দেখে নিলো, তারপর চোখ বন্ধ করলো।
রহমান নূরীকে বললো, কিছু শুকনো কাঠ আর পাতা নিয়ে এসো, আগুন জ্বালাতে হবে।
নূরী তাই করলো।
রৌদ্র তাপ হলেও ঠাণ্ডায় নূরের হাত-পা বরফের মত জমে এসেছিলো।
রহমান নূরের মাথাটা কোল থেকে অতি যত্নসহকারে নামিয়ে রাখলো, তারপর পাথর ঠুকে আগুন জ্বালালো।
শুকনো পাতা আর কাঠে আগুন ধরে গেলো। নূরী আগুনে নিজের ওড়নার আঁচল গরম করে নূরের হাতে পায়ে সেঁক দিতে লাগলো।
কিছুক্ষণের মধ্যেই নূর সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠলো।
সে রহমানকে লক্ষ্য করে বললো–রহমান চাচা তুমি?
হাঁ, হাঁ নূর, আমি তোমার রহমান চাচা।
বহুদিন তোমার কথা আমার স্মরণ হয়েছে। কিন্তু তোমাকে আর খুঁজে পাইনি। তোমার একখানা হাত কোথায়?
হারিয়েছি। একটা দুর্ঘটনায় হাতখানা আমার নষ্ট হয়ে যায়, আমি ওটাকে দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন। করে ফেলেছি।
বড় দুঃখ হচ্ছে তোমাকে দেখে।
সব আমার অদৃষ্ট, বুঝলে বাবা!
তা তো দেখতে পাচ্ছি কিন্তু তুমি এখানে এলে কি করে আর আমাকে এই মৃত্যুর কবল থেকে তুমি রক্ষা করলেই বা কেন?
রহমান একটু হেসে বললো–নূর, তুমি আরও কয়েকবার আমাকে দেখেছো কিন্তু পরিস্থিতিক্রমে তুমি হয়তো আমাকে চিনতে পারেনি। যাক তোমার প্রশ্নের জবাব দিচ্ছি। আমি একজন দস্যু…. কিন্তু দস্যু হলেও আমি মানুষ এবং সে কারণেই আমি তোমাকে খরস্রোতা নদীবক্ষ হতে রক্ষা করেছি। তারপর আরও বলবো, দস্যু বলেই আমি বনে জঙ্গলে বাস করি এবং তোমাকে মানবতার খাতিরে ও স্নেহের টানে মৃত্যুর কবল থেকে রক্ষা করার চেষ্টা করেছি। আসলে তো রক্ষাকারী তিনি। রহমান আংগুল দিয়ে উপরের দিকে দেখালো।
