সরে যাও আম্মু…
নূরীকে জাভেদ বাঁ হাতে সরিয়ে দিয়ে পুনরায় আঘাত করলো নূরের দেহে। তারপর বেরিয়ে গেলো সে।
নূরী ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরলো নূরকে–বাপু, তুই কেন এলি এখানে?
নূর বললো—-আমি নিজে আসিনি, আমাকে ঐ দস্যু ধরে নিয়ে এসেছে। ঘুমন্ত অবস্থায় ছিলাম আমি।
ও বুঝেছি। জাভেদ শুধু দুর্ধর্ষই হয়নি, সে কুচক্রী হয়েছে। যাও আমি তোমাকে মুক্ত করে দিলাম….নূরী ওর দুহাতের বাধন খুলে দিলো। এসো আমার সঙ্গে।
নূরী হাত দুটি মুক্ত করে দিতেই নূর সোজা হয়ে দাঁড়ালো, বললো–তোমাকে অনেক ধন্যবাদ। এর পূর্বেও তুমি যখন আমাকে মুক্ত করে দিয়েছিলে তখন তোমাকে আমার জন্য হয়তো অনেক যন্ত্রণা ভোগ করতে হয়েছে। এবারও তুমি আমার জন্য….
সে ভাবনা তোমাকে করতে হবে না। তুমি এসো আমার সঙ্গে। নূরী ওকে সঙ্গে করে একটা সুড়ঙ্গপথে প্রবেশ করলো।
নূরী চলেছে।
পেছনে নূর।
আধো অন্ধকার সুড়ঙ্গপথ।
অতি সন্তর্পণে চলতে হচ্ছিলো ওদের।
সুদীর্ঘ পথ মনে হলো নূরের কাছে। সুড়ঙ্গটা ক্রমান্বয়ে আঁকা বাঁকা হয়ে এগুচ্ছে।
অনেকক্ষণ চলার পর এমন স্থানে এসে দাঁড়িয়ে পড়লো সেখানে কোনো পথ নেই।
আশ্চর্য কণ্ঠে বললো–পথ পাথরখণ্ড দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে তবে কি জাভেদ টের পেয়েছে…
নূর বুঝতে পারলো জাভেদ বুঝতে পেরে পথ বন্ধ করে দিয়েছে।
হাত দিয়ে নুরী পাথরটা সরিয়ে দেবার চেস্টা করলো কিন্তু কিছুতেই সরাতে সক্ষম হলো না।
এবার নূর এসে পাথরখণ্ডটাকে সরিয়ে ফেলার জন্য ভীষণভাবে শক্তি প্রয়োগ করলো। নূরের দেহেও কম শক্তি ছিলো না, সে ঠেলে পাথরটাকে উল্টে ফেলে দিলো।
তারপর ওরা বেরিয়ে এলো দুজন।
নূরী আর নূর।
নূরী বললো–যাও, তুমি মুক্ত…..
কথা শেষ হয় না নূরীর, অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে জাভেদ–হাঃ হাঃ হাঃ আমি জানতাম এবারও তুমি ওকে মুক্ত করে দেবে, তাই সজাগ ছিলাম……
নুর দাঁতে দাঁত পিষে বললো–তোমার ক্ষমতা নেই আমার পথ রোধ কর।
কি বললে ডিটেকটিভ চক্রী।
সরে যাও পথ ছেড়ে…. নূরী গম্ভীর কণ্ঠে কথাটা বললো।
নূরীর চোখে শুধু বিস্ময় নয়, ভীতিভাব ফুটে উঠলো। না জানি এই মুহূর্তে কি অঘটন ঘটবে। নুরী চেয়েছিলো নূরকে মুক্ত করে দেবার পর যা তার ভাগ্যে ঘটে ঘটবে। নিজের জীবন দিয়েও সে রাজি আছে তবু নূরের যেন অমঙ্গল না হয়।
কিন্তু একি হলো।
নূরের চিন্তা বিছিন্ন হয়ে গেলো, নূরকে ভীষণভাবে আক্রমণ করলো জাভেদ।
শুরু হলো উভয়ের মধ্যে মল্লযুদ্ধ।
জাভেদ নূরের প্রতি অস্ত্র ব্যবহার করলো না। কারণ নূর অস্ত্রশূন্য ছিলো।
জাভেদ আর নূরে ভীষণ লড়াই চলেছে।
নূরী বিস্ময়ভরা চোখে দেখছে।
সে কোনো রকমে বাধা দিতে পারছে না।
নূরী জানে নূর আর জাভেদের সম্পর্ক তবুও সে বলতে পারে না কিছু। বলা তার মোটেই শ্রেয় হবে না।
দুটি সিংহশাবক লড়াই করছে যেন।
হঠাৎ জাভেদ নূরকে মাটিতে ফেলে একটা পাথরখণ্ড তুলে নিয়ে নূরের মাথায় আঘাত করতে গেলো। সঙ্গে সঙ্গে নূরী এসে চেপে ধরলো জাভেদের পাথরসহ হাত দুখানা। চিৎকার করে বললো–ওকে হত্যা করিস না, আমি তোকে বারণ করছি জাভেদ।
তুমি সরে যাও, আমি ওকে খতম করে তবে ফিরে যাবো।
নূরী বলে উঠলো–জাভেদ!
না, কোনো বাধাই আমি শুনবো না।
আমি তোর কাছে হাতজোড় করে বলছি ওকে তুই মাফ করে দে। নূরী কান্নাজড়িত কণ্ঠে কথাটা বললো।
নূর বলে উঠলোনা, আমি কোনো অপরাধী নই, কাজেই আমি মাফ চাই না। তুমি আমার মায়ের মত, তাই তোমাকে আমি শ্রদ্ধা করি। তাই বলে আমি কারও কাছে তোমাকে মাফ চাইতে দেবো না।
নূর!
হাঁ, মনে রেখো আমি কোনো দোষ করিনি।
তুমি দোষ করোনি ডিটেকটিভ? তবে সর্দারকে কারা আটক করেছে কে তাকে বন্দী করে। সরিয়ে ফেলেছে।
নূরী বলে উঠলো–না, ও সর্দারকে আটক করেনি।
আম্মু, তুমি মিথ্যা বলছো?
না, আমি জানি ওর কোনো দোষ নেই।
আমি জানি ঐ বাদমাইশটা সর্দারকে আটক করে রেখেছে।
জাভেদ, কারও সাধ্য নেই সর্দারকে আটক করে রাখে। আমার মন বলছে তাকে কেউ আটক করেনি।
নূর বুঝতে পারলো সর্দার মানে তার আব্বু। একটা মুখ তার চোখের সামনে ভেসে উঠলো। এদের সর্দার হারিয়ে গেছে, তাকে এরা খুঁজে পাচ্ছে না, তাই এত আক্রোশ তার উপর। তবে কি এই তরুণ আব্বুর কোনো অনুচর–কিন্তু মেয়েটি কে?
নূরী এসে জাভেদের হাত দুখানা চেপে ধরলো–জাভেদ, আমি জানি সর্দারকে ও আটক। করেনি….
নূর তখন হাতের পিঠে ঠোঁটের রক্ত মুছে ফেলছিলো।
জাভেদ গর্জন করে বললো–সর্দার যতদিন ফিরে না আসবে ততদিন ওকে বন্দী করে রাখবো….
বলে উঠলো নুর–তোমার সাধ্য নেই আমাকে বন্দী করে রাখা….
আবার ছুটে এসে জাভেদ নূরের জামার কলার চেপে ধরলো।
নূরী পারলো না তাদের লড়াই ক্ষান্ত করতে।
আবার শুরু হলো যুদ্ধ।
উভয়ে লড়াই করতে করতে উঠে গেলো পাহাড়টার উপরে।
ওপাশে খরধার নদী।
প্রবল স্রোতধারা বয়ে যাচ্ছে ভীষণ বেগে।
নূরী ছুটলো রহমানের সন্ধানে, কারণ সে পারলো না ওদের যুদ্ধ থামাতে। সুড়ঙ্গপথে নূরী ঘুরতে লাগলো রহমান এসে যদি বন্ধ করতে পারে ওদের লড়াই তবু রক্ষা পাবে।
ওদিকে নূর আর জাভেদ এ ওকে আঘাতের পর আঘাত করে চলেছে। পেছনে নদীর স্রোতের কল কল শব্দ কানে আসছে। প্রচণ্ড ঢেউগুলো আছাড় খাচ্ছে পাহাড়ের গায়ে।
লড়াই এবার পাহাড়ের উপর চলেছে।
একজন আর একজনকে কাবু করার ভীষণ চেষ্টা। উভয়ের শরীরের স্থানে স্থানে কেটে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। চুলগুলো এলোমেলো বিক্ষিপ্ত ছড়িয়ে পড়ছে কপালের চারপাশে।
