জানি।
তবে শুয়ে পড়ো।
আশা এবার কোনো কথা না বলে শয্যায় দেহটা এলিয়ে দেয়।
লণ্ডন কারাকক্ষের মেঝেতে শুধু কম্বল বিছিয়ে কদিন কেটেছে আশার। নানা দুশ্চিন্তায় মনটা তার অস্থির ছিলো তাই সে ঘুমোতে পারেনি। আজ সে নিশ্চিন্ত, কারণ বনহুরকে পাশে পেয়েছে। বনহুরের কোনো অমঙ্গল হয়নি, এটাই তার বড় সান্তনা।
বনহুর দেয়ালে ঠেস দিয়ে ভাবছে কিভাবে এবার সে লণ্ডন ত্যাগ করবে। কাজ তার সমাধা হয়েছে, তবুও একটু বাকি আছে। জ্যাসিলিনের হত্যাকারীকে খুঁজে বের করতে সক্ষম হয়েছে কিন্তু তাকে শায়েস্তা করা হয়নি এখনও, তাই কদিন তাকে আরও বেশি কাটাতে হচ্ছে লণ্ডনে। বনহুর যে ভরসা নিয়ে লণ্ডন এসেছিলো তা সফল হয়েছে। আশার চোখ দুটোতে আবার সে দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেয়েছে। বড় আনন্দ লাগছে বনহুরের, কারণ আশা তার শুধু জীবন রক্ষাই করেনি, সে তাকে ভালবাসে গভীরভাবে। বনহুরের দুঃখ তার ভালবাসার বিনিময়ে তাকে সে কিছু দিতে পারেনি। মানুষের সমস্ত দেহের কোনো অঙ্গের চেয়ে বেশি প্রয়োজনীয় তার চক্ষুদ্বয়। যার দৃষ্টিশক্তি নেই তার মত অসহায় বুঝি এ দুনিয়ায় কেউ নয়? আশা বড় নিঃসঙ্গ, বড় অসহায় হয়ে পড়েছিলো।
বনহুর তাকিয়ে দেখলো আশা ঘুমিয়ে পড়েছে।
একটা ফুটন্ত গোলাপ ধীরে ধীরে মান হয়ে আসছে সূর্যের প্রখরতায়। সূর্য শুধু তার তাপ দিয়ে পৃথিবীর কোমলতাকে কঠিন করে তোলে, কোমলতায় ভরিয়ে দিতে পারে না। পারে বসুন্ধরা পৃথিবীর সৌন্দর্যকে আরও মনোমুগ্ধকর করে তুলতে…. আশা একদিন ফুটন্ত গোলাপের মত ছিলো–দিন দিন ঝিমিয়ে পড়ছে ক্লান্তি আর অবসাদে। আশা ভুল করেছে বনহুরকে ভালবেসে, সে ইচ্ছে করলে নিজের জীবনকে পরিপূর্ণতায় ভরিয়ে তুলতে পারতো। বিয়ে করে সংসারী হতে পারতো। স্বামী সংসার নিয়ে সুখে বসবাস করতে পারতো কিন্তু সে ভুল করেছে…বনহুকে ভালবেসে সে ভুল করেছে….. বনহুর একটা দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করে চোখ মুদলো। কিন্তু ভাবনা তাকে রেহাই দিলো না–কেন সে পারলো না আশাকে ভালবাসার বিনিময়ে কিছু দিতে। কেন সে তাকে গ্রহণ করতে পারলো না। আশা তো তাকে ভালবাসে অন্তর দিয়ে, আশা তো তাকে উজার করে দিতে চেয়েছিলো তার সবকিছু। নিজকে সে সমর্পণ করতে চেয়েছিলো বনহুরের কাছে
বনহুর আবার চোখ দুটো তুলে তাকালো আশার ঘুমন্ত মুখমণ্ডলের দিকে। সত্য কি সে তাকে গ্রহণ না করে ভুল করেছে? না ভুল সে করেনি, কারণ সে তো লোভ–লালসামুক্ত মানুষ। আশার ভালবাসা সে উপলব্ধি করে, তার বিনিময়ে সেও ভালবাসে ওকে–তাই বলে সে ওর পবিত্রতা বিনষ্ট করতে পারে না। চিন্তার গভীরে তলিয়ে যায় বনহুর।
তারপর দোয়ালে ঠেশ দিয়ে একসময় ঘুমিয়ে পড়ে।
হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলো তার।
চোখ মেলে তাকিয়ে দেখলো আশা তার মাথার নিচে নিজের বালিশটা গুঁজে দিচ্ছে।
বনহুর বললো–বেশ ছিলাম।
কিন্তু আমি দেখলাম তুমি খুব কষ্ট পাচ্ছো। শক্ত দেয়ালে মাথাটা তোমার অত্যন্ত আঘাত পাচ্ছিলো।
আমার মাথাটা মোটেই নরম নয় আশা, কাজেই ও কিছু হবে না।
তা হয় না, তুমি কষ্ট করবে আর আমি আরামে নিদ্রা যাবে। বনহুর, তুমি বিছানায় শয়ন করো আমি বসছি, কারণ আমার নিদ্রা শেষ হয়ে গেছে।
বনহুর হেসে বললো–আশা, কথা বাড়িয়ে কোন লাভ হবে না। তুমি ঘুমাও।
না, আমি কিছুতেই ঘুমাবো না। তুমি বিছানায় শয়ন করো।
বেশ, যদি তাতে খুশি হও।
শুধু খুশি নয়, স্বস্তি পাবে শান্তি পাবো।
আশা।
বলো?
তুমি সত্যি আমার জন্য কত ভাবো অথচ আমি তোমাকে কিছু–মানে কিছু ভালবাসাও দিতে পারিনি।
বনহুরের কথায় একটা স্নান হাসি ফুটে উঠলো আশার ঠোঁটের কোণে।
বনহুর শয্যায় শয়ন করে হাতখানা বাড়িয়ে দিলো আশার দিকে।
বনহুরের আহত হাতখানার উপরে আশা তার কোমল হাতখানা বুলিয়ে চললো।
বললো বনহুর–আশা, জীবনটাকে তুমি নিঃশেষ করে দিলে। সব আছে তোমার তবু তুমি নিঃস্ব রিক্ত। কেন তুমি নিজকে বঞ্চিত করলে আশা?
আশা বললো–আমি তোমার মধ্যে হারিয়ে গিয়ে নিজকে পরিপূর্ণতায় ভরিয়ে তুলতে চেয়েছিলাম কিন্তু যখন জানলাম তোমাকে কোনোদিন পাবো না, তখন আমি তোমার প্রতিচ্ছবি মনের গভীরে প্রতিচ্ছত করে নিজকে পরিপূর্ণ করে তুলেছি। তুমি তো জানো বনহুর, আর আমার কোনো সাধ নেই। তোমাকে চিরকাল পূজা করবো হৃদয় সিংহাসনে বসিয়ে।
বনহুর একটু হেসে মুখটা বালিশের মধ্যে খুঁজে একটা দীর্ঘশ্বাস চেপে নিলো।
*
জাভেদ লোহার দরজা খুলে টেনে বের করে আনলো নূরকে। তারপর তাকে সোজা অন্ধ গহ্বরে নিয়ে গেলো। হাত দুখানা শক্ত করে বেঁধে উপরে একটা রডের সঙ্গে আটকালো, তারপর একটা চাবুক তুলে নিলো সে হাতে।
নূরের কঠিন মুখোভাব।
সে মোটেই ভীত নয়।
জাভেদের দিকে সে বাঁকা চোখে তাকালো একবার।
জাভেদ বললো–বদমাইশ, তুমি জানো না তাই চালাকি করে আমাদের সর্দারকে আটক করে। রেখেছে। বলো তাকে কোথায় রেখেছো তোমরা?
নূর বললো–সর্দার! কে সর্দার?
নেকামি করছো! বলো সর্দারকে কোথায় আটক করে রেখেছো?
জানি না।
এবার জাভেদের হাতের চাবুকখানা সপাং করে পড়লো নূরে শরীরে।
নূর কুঁকড়ে গেলো না, যন্ত্রণায় মুখমণ্ডল তার শুধু বিকৃত হলো।
পুনরায় কষাঘাত করলো জাভেদ নূরের দেহে।
এমন সময় নূরী এসে জাপটে ধরলো–না না, ওকে তুই মারতে পারবি না। ওকে তুই মারতে পারবি না…..
