আশা হেসে বললো–আনন্দে ক্ষুধা দূর হয়ে গেছে। সত্যি কি বলে যে আপনাদের আমি কৃতজ্ঞতা জানাবো ভেবে পাচ্ছি না।
বনহুর বললো– হাঁ, মিঃ আরমান আমাদের বন্ধুই শুধু নন, পরম আপনজন। যা করছেন তা কল্পনাতীত।
বেশি বলে আমাকে ফাঁপিয়ে তুলছেন।
এমন সময় দরজায় কলিংবেল বেজে উঠলো।
মিঃ আরমান ও বনহুরের খাওয়া তখন সমাধা হয়েছে।
বললেন মিঃ আরমান–আপনারা দুজন ড্রেসিংরুমে চলে যান, নিশ্চয়ই পুলিশ এসেছে।
বনহুর এবং আশা দ্রুত ড্রেসিংরুমে চলে গেলো।
মিঃ আরমান বনহুরের খাবারের থালাটা সরিয়ে রাখলেন টেবিলের নিচে। তারপর দরজা খুলে দিলেন।
দরজা খুলে দিতেই মিঃ আরমান দেখতে পেলেন। দুজন পুলিশ অফিসার।
একজন মিঃ আরমানের অতি পরিচিত, তিনি মিঃ আরমানকে লক্ষ্য করে বললেন–মিঃ আরমান, আপনাদের অন্ধ হসপিটাল থেকে যে মহিলাটিকে আটক করা হয়েছিলো তাকে কারাগার থেকে দস্যু বনহুর নিয়ে ভেগেছে।
মিঃ আরমান বললেন–আমি কি করতে পারি?
যদি কোনো সন্ধান আপনার জানা থাকে বা ঐ ধরনের কেউ আপনার ক্যাবিনে আসে তাহলে সঙ্গে সঙ্গে টেলিফোন করে জানিয়ে দেবেন। আমরা প্রত্যেকটা কামরায় এ কথা জানিয়ে গেলাম।
মিঃ আরমানের সঙ্গে পুলিশ অফিসারদ্বয় যখন কথা বলছিলেন তখন বনহুর সব শুনতে পাচ্ছিলো। সে মৃদু হাসলো তাদের কথা শুনে।
মিঃ আরমান বললেন পুলিশ অফিসারদ্বয়কে লক্ষ্য করে আপনারা কিছু ভাববেন না সে রকম কোনো কিছুর সন্ধান পেলে, সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ অফিসে জানিয়ে দেব।
মিঃ আরমান দরজা বন্ধ করে ফিরে এলেন।
ডাকলেন তিনি–এবার বেরিয়ে আসুন।
বনহুর আর আশা বেরিয়ে এলো।
আবার জমে উঠলো নানা গল্প।
বনহুরকে আজ বড় প্রফুল্ল লাগছে।
আশার মনটাও প্রসন্ন কারণ বনহুরকে আনন্দিত দেখে তারও বড় আনন্দ হচ্ছে। বনহুর কেন এত খুশি হয়েছে আশার বুঝতে বাকি নেই। আশাকে বন্দী করার পর বনহুর বেশ চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলো। সর্বক্ষণ আশাকে মুক্ত করার ব্যাপার নিয়ে মাথা ঘামাতে হচ্ছিলো তাকে।
হঠাৎ এত অল্পসময়ে বনহুর আশাকে মুক্ত করে আনতে পারবে এটা তার নিজের কাছেও একটু আশ্চর্য লাগছে, কারণ লণ্ডন কারাকক্ষ থেকে বন্দীকে খালাস করে আনা সেটা কত ভয়ংকর তা সবাই জানে।
বনহুর জয়ী হয়েছে।
লোহার শিক বাঁকাতে গিয়ে হাতখানা তার ভীষণভাবে জখম হয়েছে। বলিষ্ঠ হাতের মুঠা লাল হয়ে কালো জখম হয়ে গেছে।
মিঃ আরমান পানিতে জলপট্টি করে হাত দুখানা সুস্থ করে তোলার চেষ্টা করেছিলো কিন্তু বেশিক্ষণ সে সুযোগ আসেনি।
আশাও লক্ষ্য করেছিলো মিঃ আরমান বনহুরের হাত দুখানা জলপট্টি করে আরোগ্য করে ভোলার জন্য সচেষ্ট। অত্যন্ত খুশি হয়েছে আশা, কারণ তার মনটা অস্থির হয়ে পড়েছিলো ওর হাত দুখানা দেখে।
মিঃ আরমান আর বনহুর যখন কথাবার্তা বলছিলো আশা বললো–আপনাদের কণ্ঠস্বর বাইরে শোনা যাবে, কাজেই এভাবে কথা না বলাই শ্রেয়।
মিঃ আরমান একটু হেসে বললেন–আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন। এ সব কামরার ভিতরের আওয়াজ কোনো ক্রমেই বাইরে যাবে না।
আশা কিছুটা আশ্বস্ত হলো এবার।
অত্যন্ত ক্লান্তিবোধ করায় আশা বারবার হাই তুলছিলো।
বনহুর বললো–যাও আশা ঘুমিয়ে পড়োগে।
মিঃ আরমান বললো–আপনাদের কষ্ট আমিই দিচ্ছি, আপনারা শয়ন করুন, আমি ড্রেসিংরুমে ঘুমোবো। কতদিন পর আপনাদের আজ শুভরাত্রি।
লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠলো আশার মুখমণ্ডল। সে বুঝতে পারলো মিঃ আরমান মনে করেছেন ওরা দুজন স্বামী স্ত্রী। কিছু বলতে যাচ্ছিলো আশা, বনহুর বুঝতে পেরে বলে উঠলো–মিঃ আরমান, আপনার কথা শিরোধার্য। আপনি এখানেই শয়ন করুন, আমরা বরং ড্রেসিংরুমে শয়ন করছি।
তা কি করে হয়, আপনারা আমার….
মেহমান, এই হত?
শুধু মেহমান নন, আপনারা বিপদগ্রস্ত মেহমান।
তাই আপনি জেনেও এবং বুঝেও আমাদের প্রতি এত সদয়? কি বলে যে আপনাকে ধন্যবাদ জানাবো…..
আপনাদের উপকার করতে পারলেই আমি ধন্য হবো মনে করছি।
সত্যি আপনার কাছে আমরা চিরঋণী। আমার আসল পরিচয় আজ না বলে পারছি না, যদিও আপনি কিছুটা অনুধাবন করতে সক্ষম হয়েছেন। মিঃ আরমান, আমি সেই বনহুর যাকে লণ্ডন পুলিশ খুঁজে বেড়াচ্ছে।
হেসে বললেন মিঃ আরমান–আপনি পরিচয় না জানালেও আমি জানতে পেরেছি কে আপনি। কারণ আপনার পৌরুষদীপ্ত চেহারা এবং আচরণ সবই বিস্ময়কর। আপনি সাধারণ মানুষ নন, এটা আপনাকে দেখলেই বেশ বোঝা যায়।
তাহলে আমি নিশ্চিন্ত। বললো বনহুর।
মিঃ আরমান বললেন–এবার শয্যা গ্রহণ করুন আপনারা।
তা হয় না, আপনি শয্যায় শয়ন করুন, আমরা ড্রেসিংরুমে… কথাটা বলে বনহুর আশার হাত ধরে টেনে নিয়ে চলে গেলো।
বনহুর আশাকে নিয়ে গেলো এমন ভাব দেখিয়ে যেন ওরা দুজনা স্বামী স্ত্রী। মিঃ আরমান যেন কোন সন্দেহ করতে না পারেন। বনহুর এ ব্যাপারে বেশ সতর্ক রয়েছে।
ড্রেসিংরুমের মেঝেতে বিছানা পাতা, ছোষ্ট্র বিছানা, দুজন এক সঙ্গে শয়ন করা একটু। কষ্টকর।
বনহুর বললো–আশা, কিছু ভেবোনা, তুমি শুয়ে পড়ো।
আর তুমি?
আমি–তা আমার জন্য কোনো অসুবিধা হবে না। বনহুর একপাশে দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে পড়লো।
আশা বিছানায় বসে তাকালো বনহুরের দিকে।
বনহুর বুঝতে পারলে তাকে দেয়ালে ঠেশ দিয়ে বসে পড়তে দেখে ভীষণ দুঃক পাচ্ছে তাই একটু হেসে বললো–কোনো অসুবিধা হচ্ছে না। আশা, তুমি তো জানো সব সহ্য করার মতো এ দেহটা আমার।
