কষ্ট তা হয়েছে বই কি। আমি আশ্চর্য হচ্ছি তুমি কি করে প্রবেশে সক্ষম হলে এবং কি করে সেলের মোটা শিক বাঁকিয়ে ভিতরে প্রবেশ করলে?
বনহুর হাতখানা মেলে ধরলো আশার সামনে।
বনহুরের হাত দুখানা লক্ষ্য করে শিউরে উঠলো আশা। রক্ত জমে কালো হয়ে আছে হাতের আংগুল এবং তালুতে।
আশা কিছুতেই নিজকে সংযত রাখতে পারলো না, তাড়াতাড়ি বনহুরের হাত দুখানা মুঠায় চেপে ধরে নিজের নরম গালে স্পর্শ করলো।
ফোঁটা ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগলো বনহুরের হাতের উপরে। তারই জন্য বনহুরের হাত দুখানা কি ভাবে জখম হয়েছে।
এমন সময় মিঃ আরমান প্রবেশ করলো সেই স্থানে।
আশা সোজা হয়ে দাঁড়ালো।
মিঃ আরমান বললেন–মাফ করবেন আপনাদের স্বামী–স্ত্রীর কথাবার্তায় আমি ব্যাঘাত ঘটালাম।
না না, এমন কিছু নয়। বসুন মিঃ আরমান। বললো বনহুর। আশাকে লক্ষ্য করে বললো–যাও আশা, তুমি হাতমুখ ধুয়ে নিজকে সুস্থ করে নাও।
মিঃ আরমান বললেন, আপনার শরীর সুস্থ নয়, কাজেই আপনি যান, ঠাণ্ডা পানিতে হাতমুখ ধুয়ে বিশ্রাম করুন। আমি কিছু খাবার নিয়ে আসি।
এতে বিপদ বাড়বে মিঃ আরমান, তার চেয়ে ক্ষুধা সহ্য করা অনেক শ্রেয়।
বললো আশা–আমার কোনো কষ্ট হবে না। আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
বনহুর বললো–আশা, ওর পরিচয় তোমাকে দেওয়া হয়নি।
আমি ওকে চিনি না তবে নামটার সঙ্গে আমার পরিচয় আছে। আমার চোখ দুটি যখন অন্ধ ছিলো তখন ঐ নামটা আমি হসপিটালে বহুবার শুনেছি। মিঃ আরমান, আপনাকে আমি অন্তর দিয়ে শ্রদ্ধা করি কথাটা বলে আশা চলে গেলো বাথরুমের দিকে।
বনহুর যখন আশার হাতের মুঠা থেকে নিজের হাতখানাকে সরিয়ে নিচ্ছিলো তখন মিঃ আরমান লক্ষ্য করেছিলেন বনহুরের হাতখানা ভীষণভাবে জখম হয়েছে। মিঃ আরমান টেবিল থেকে পানির বোতলটা তুলে নিয়ে রুমালে ভিজিয়ে জলপট্টি করতে লাগলেন। মৃদু হাসলো বনহুর, কারণ এর চেয়ে অনেক বেশি আঘাত তাকে হজম করতে হয়েছে বহুবার।
মিঃ আরমান তাকে প্রথম শত্রু মনে করলেও আজ তাকে বন্ধুমনে করছেন, কারণ বনহুরের আচরণে অবাক হলেও তিনি অসন্তুষ্ট হতে পারেননি, কারণ আগন্তুক যেই হোক তার পরিচয় না জানালেও তার এমন কিছু কাজ তিনি লক্ষ্য করেছেন, যার জন্য তিনি তাকে বিশ্বাস করতে পেরেছেন।
মাঝে মাঝে মিঃ আরমানের মনে সন্দেহ জাগে কিন্তু সে সন্দেহ গম্ভীর হলেও ক্ষণস্থায়ী, কারণ তিনি সব জেনে নিয়েছেন। মিসেস জ্যাসিলিনের মৃত্যুরহস্য উদঘাটন করাই তার কাজ এবং এ কাজ সমাধা হলে সে বিদায় নিয়ে চলে যাবে।
মিঃ আরমান জানেন যেকোন ডিটেকটিভ কোনো রহস্যজাল উদঘাটন ব্যাপারে সর্বদা সজাগ থাকেন এবং নানাভাবে তারা আত্মগোপন করে থাকেন বিভিন্ন জায়গায়।
তবুও যে মিঃ আরমানের মনে আরও একটা সন্দেহ উঁকি দেয়নি তা নয়। কিছুদিন পূর্বে লণ্ডন বিমান বন্দরে দস্যু বনহুর অবতরণ করে এবং তারপর সে নিখোঁজ হয়। পুলিশবাহিনী এবং গোয়েন্দা বিভাগ তাকে সন্ধান করে ফিরছে লণ্ডন নগরীর আনাচে কানাচেই শুধু নয়, সমস্ত নগরীর প্রায় স্থানেই তাদের আনাগোনা রয়েছে।
মিঃ আরমানের মনে প্রথম যে সন্দেহ দানা বেঁধে ছিলো তা জমাট বেঁধে উঠেছে এবং ওর কথাবার্তায় তা প্রকাশ পেয়েছে।
কিন্তু মিঃ আরমান তা বিশ্বাস করতে পারেনি প্রথমে, তবে আজ আর সন্দেহ শুধু সন্দেহেই সীমাবদ্ধ নেই, আগন্তুকটি কে হতে পারে, এ ব্যাপারে তিনি নিশ্চিন্ত তবুও মিঃ আরমান চান না ওকে পুলিশের হাতে অর্পণ করেন। কারণ ওর আচরণে বা কার্যকলাপে অন্যায় কিছু প্রকাশ পায়নি। তা ছাড়াও আরমান তাকে বন্ধু হিসেবেই মেনে নিয়েছেন।
যদি তিনি ওর মধ্যে কোনো খুঁত পেতেন তাহলে কিছুতেই হজম করে যেতে পারতেন না, সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেলেই সব কিছু প্রকাশ করে দিতে পারতেন। অবশ্য মিঃ আরমানের ক্ষমতা কিছুটা লোপ করে দেওয়া হয়েছিলো তার ক্যাবিনের টেলিফোন বিচ্ছিন্ন করে। এ কারণেই প্রথমে মিঃ আরমান দুর্বল ছিলেন। তবে এখন মিঃ আরমান সম্পূর্ণ মুক্ত, ইচ্ছা করলেই বনহুরকে লণ্ডন পুলিশবাহিনীর হাতে তুলে দিতে পারেন তিনি।
আশা বাথরুমে।
বনহুর সিগারেট থেকে ধুম্র নির্গত করে চলেছে।
মিঃ আরমান কিছু ভাবছিলেন অপর এক সোফায় বসে।
বললো বনহুর–সব ভাবনার অবসান হবে মিঃ আরমান। আমার আসল পরিচয় আপনি পাবেন এবং তা অচিরেই পাবেন। অবশ্য আমি বুঝতে পারছি আপনি কিছুটা আঁচ করে নিয়েছেন আমি কে?
মিঃ আরমান বললেন–আপনি জ্যোতিষীর মত কথা বলছেন। আমার মনের কথা আপনি সব জ্ঞাত আছেন দেখছি।
অসংখ্য ধন্যবাদ আপনাকে, জেনেও আপনি আমাকে গ্রেপ্তার করার জন্য পুলিশকে সংবাদ দিচ্ছেন না, বরং
অথচ সাহায্য করে চলেছি, তাই না?
হ মিঃ আরমান, আপনার সাহায্য না পেলে আমাকে হয়তো ব্যর্থ হতে হতো।
বেশি বলবেন না, এতে আমার মনের পরিবর্তন আসতে পারে। কাজেই যাক ওসব কথা, এবার টেবিলে যে খাবার ঢাকা দেওয়া আছে তাই তিনজন ভাগাভাগি করে নিয়ে খাওয়া যাক।
ততক্ষণে আশাও এসে গেছে।
আশাকে এখন অনেকটা সুস্থ মনে হচ্ছে।
বললেন মিঃ আরমান–আসুন আমরা একসঙ্গে বসে খাবারগুলো খেয়ে নিই।
বনহুর আশার দিকে একখানা চেয়ার এগিয়ে দিয়ে বললো–বসো।
আশা বললো–ধন্যবাদ, আমি রাতে কিছু খাবো না।
কেন? বললেন মিঃ আরমান।
