এবার কথা বললো বনহুর–আমাকে চিনতে পারছেন না স্যার, আমি আপনার পুরোন ভত্য হ্যারিসন।
ও এবার বুঝতে পারলাম…. আপনি…..আপনি…
আপনি নয় বলুন তুমি? আমি হ্যারিসন। পুরোনো নওকর।
উঃ কি সাংঘাতিক কাণ্ড বলুন তো?
আবার বলুন বলছেন?
তবে কি বলবো?
সব সময় তুমি বলবেন, নাহলে হঠাৎ কোনো সময় আপনি বেরিয়ে আসবে মুখ ফসকে।
আপনি–না তুমি–তুমিই বলবো।
এই তো বন্ধুর মত কথা। বললো বনহুর। একটু থেমে বললো আবার সে–মাঝে মাঝে আপনার গাড়ির ড্রাইভার হিসেবে কাজ করবো, বুঝলেন?
আপনি দেখছি গাড়ি চালাতেও জানেন?
সব জানি মিঃ আরমান। আপনার চাকর হ্যারিসনের অসাধ্য কোনো কাজ নেই।
তাহলে তো বড় উপকার হয়। বেশ রাজি! বললেন মিঃ আরমান।
বনহুর বললো–আমাকে আপনি চিনতে পারেননি, কাজেই আমার ছদ্মবেশ সার্থক হয়েছে।
*
আশার তন্দ্রা ছুটে গেলো।
অতি পরিচিত কণ্ঠস্বর।
আশা আমি এসেছি…
তুমি!
মুহূর্ত বিলম্ব করোনা, উঠে এসো।
কোথায় যাবো?
পরে সব জানতে পারবে।
এই নাও আমার হাত ধরে বেরিয়ে এসো আশা।
আশা অন্ধকারে হাত বাড়াতেই একটা বলিষ্ঠ হাতের স্পর্শ অনুভব করলো। আনন্দে বুকটা টিপ টিপ করে উঠলো তার। স্বপ্ন না সত্য–বনহুরের হাতখানা সত্যি তার হাতের মুঠোয়। আশা ভাবতেও পারেনি এই কারাকক্ষ থেকে সে উদ্ধার পাবে। কঠিন পাথরে ঘেরা দেয়ালের মধ্যে আজ কদিন সে আবদ্ধ রয়েছে। মাঝে মাঝে তাকে বের করে নিয়ে যাওয়া হয় বিচারকক্ষে, সেখানে বিচারকের সামনে তাকে নানা প্রশ্ন করা হয়, তারপর পুনরায় ফিরিয়ে আনা হয় সেই কারাকক্ষে।
বনহুরকে পাকড়াও করার জন্য লণ্ডন পুলিশবাহিনী ব্যস্তসমস্ত। তাকে যেমন করে তোক খুঁজে বের করতেই হবে। গোয়েন্দা বিভাগ সমস্ত লণ্ডন নগরীতে ছড়িয়ে পড়েছে। বনহুরকে পাকড়াও করতে না পারলে তাদের বিফলতার অন্ত থাকবে না। কাজেই দস্যু বনহুরকে নিয়ে লন্ডন পুলিশবাহিনীর সর্বক্ষণ আলাপ আলোচনা চলেছে। ওয়্যারলেসে সর্বদা তাদের কথা বিনিময় হচ্ছে।
কালাই নগরী থেকে দস্যু বনহুর লণ্ডন নগরীতে আগমন করেছে, এটা বিস্ময়কর না হলেও ভয়ংকর। লণ্ডন সরকার চান না যে, দস্যু বনহুর তাদের দেশে বিচরণ করে বেড়াক, কোনো ক্ষতি সাধন করুক। এটা কোনো দেশেই চাইবে না যে তার দেশের বা জনগণের ক্ষতি সাধন হোক।
লণ্ডন সরকার চাইবে কেন।
এবং সে কারণেই সমস্ত–লণ্ডন নগরীতে পুলিশবাহিনী আনাচে কানাচে ছড়িয়ে পড়েছে, দস্যু বনহুর যেন কারও চোখে ফাঁকি দিয়ে কোনো অঘটন ঘটাতে না পারে।
বনহুর আশাকে নিয়ে সাবধানে বেরিয়ে এলো কারাগার কক্ষ হতে। বনহুরের শরীরে জেল রক্ষকের ড্রেস তার হাতে রিভলভার।
আশাকে নিয়ে কারাগারের ফটকে এসে দাঁড়ালো বনহুর।
সঙ্গে সঙ্গে প্রহরী ফটক খুলে দিলো এবং সেলুট করলো সসম্মানে।
বনহুর আশাসহ বেরিয়ে এলো ফটকের বাইরে।
একজন লোক দাঁড়িয়েছিলো জেলের অদূরে গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করছিলো সে।
বনহুর আশাসই গাড়িতে উঠে বসলো।
লোকটি ড্রাইভার আসনে বসে গাড়িতে স্টার্ট দিলো। মুহূর্তে দৃষ্টির আড়ালে গাড়িখানা চলে গেলো।
মাত্র কয়েক মিনিট, ভীষণভাবে বেজে উঠলো পাগলা ঘণ্টি। বিপদ সংকেত আলো জ্বলে উঠলো বার্লিহোম কারাগারের সুউচ্চ প্রাচীরের ফটকে।
পুলিশের ছুটাছুটি শুরু হয়ে গেছে।
ওয়্যারলেসে সংবাদটা ছড়িয়ে দেওয়া হলো ট্রাফিক পুলিশদের কাছে।
সবাই সজাগ হয়ে উঠলো।
দস্যু বনহুর বন্দিনী আশাকে নিয়ে পালিয়েছে।
গাড়ির নাম্বার জানে না কেউ।
তবে কোনো এক মোটরে গেছে, পুলিশবাহিনী তা জানে, তাই তারা পুলিশ ভ্যান নিয়ে ছুটলো এলোপাতাড়ি।
অনেক সন্ধান করেও কোনো হদিস পাচ্ছে না পুলিশবাহিনী।
লণ্ডন শহরের বিপদ সংকেত আলোগুলো জ্বলছে আর নিভছে।
ট্রাফিক পুলিশ হন্তদণ্ড হয়ে উঠেছে।
তারা যে গাড়ি যাচ্ছে থামিয়ে ফেলছে এবং তদন্ত করে দেখছে কোন গাড়িতে বনহুর বন্দিনীকে নিয়ে পালাতে সক্ষম হয়েছে।
বহু তদন্ত চালিয়েও পুলিশবাহিনী কিছুতেই বনহুর আর আশার সন্ধান পেলো না।
ততক্ষণে বনহুর আশাকে নিয়ে পৌঁছে গেছে তাদের হোটেলে।
সন্দেহের কোনো কারণ না থাকায় লণ্ডন পুলিশবাহিনী এবং গোয়েন্দা বিভাগ হোটেলে কোনো রকম পাহারা রাখেনি বা মোতায়েন করেনি।
বনহুর আশাসহ উঠে এলো উপরে।
ড্রাইভারও তাদের সঙ্গে আছেন যিনি এতক্ষণ কৌশলে গাড়ি চালিয়ে এসেছেন।
হোটেল কক্ষের দরজা খুলে ভিতরে প্রবেশ করতেই বনহুর ড্রাইভারের পিঠ চাপড়ে দিয়ে বললো–আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ মিঃ আরমান। আপনি আমাকে সাহায্য না করলে এত সহজে কার্যোদ্ধার সম্ভব হতো না।
মিঃ আরমান ড্রাইভারের ড্রেস পরিবর্তনের জন্য ড্রেসিংরুমে প্রবেশ করলেন।
বনহুর বললো–আশা, এ হোটেল কক্ষে কদিন তোমাকে আত্মগোপন করে থাকতে হবে। কারণ এখনও আমার কাজ শেষ হয়নি।
আশা অবুঝ নয়, সে জানে বনহুর একটা কথাও অনর্থক বলে না কাজেই সে নীরবে মাথা দোলালো।
বনহুর একটা সোফায় বসে সিগারেটে অগ্নিসংযোগ করে একমুখ ধোয়া ছাড়লো।
আশা দাঁড়িয়েছিলো এতক্ষণ।
বনহুর বললো–বসো আশা।
আশা আসন গ্রহণ করলো।
বললো বনহুর–বন্ধু মিঃ আরমান আমাকে সাহায্য না করলে এত সহজ হতো না বালিহোম কারাগারে প্রবেশ করা এবং কার্যোদ্ধার করা মোটেই সহজ হতো না। একটু থেমে বললো–আশা, তোমার খুব কষ্ট হয়েছে, তাই না?
