বাঘা তাজের লাগাম কামড়ে ধরলো, তারপর এক ঝাঁকুনি দিয়ে ইংগিতে কিছু বললো।
তাজ সোজা হয়ে দাঁড়ালো।
সেও বুঝতে পেরেছে বাঘার ইংগিত– বাঘা তাকে ছুটতে বলছে।
বাঘা লাফিয়ে চেপে বসলো তাজের পিছে।
তাজ এবার ছুটতে শুরু করলো।
বাঘা দু’পায়ে তাজের পিঠ আঁকড়ে ধরে বসে তাজকে চালনা করে চললো দক্ষ অশ্বারোহীর মত। তাজ ছুটলো উল্কাবেগে।
কিছুক্ষনের মধ্যে পৌঁছে গেল তাজ আর বাঘা।
বাঘার অদ্ভুত অভিজ্ঞতা বনহুরকে বিস্মিত করল। তেমনিই সে খুশিও হল কিন্তু বেশিক্ষণ ভাববার সময় নেই তার।
তাজ এসে পৌঁছবার পূর্বেই আবার আক্রান্ত হয়েছিল বনহুর। একসঙ্গে কয়েকজন অদ্ভুত সন্ন্যাসী তাকে আক্রমণ করেছিল ভীষণভাবে। বনহুর আশার দেহটা একপাশে নামিয়ে রেখে লড়েছিল তবে বেশিক্ষণ তাকে লড়তে হয়নি, কিছু সময়েই দু’জন সন্ন্যাসী মৃত্যুবরণ করায় ওরা ভীষণ ভড়কে গিয়ে পালিয়ে গিয়েছিল।
তাজ এসে পৌঁছতেই বনহুর আশাকে নিয়ে উঠে বসলো তাজের পিঠে।
তাজ ছুটতে শুরু করলো।
বাঘা তাকে অনুসরণ করে ছুটে চললো।
*
আশাকে নিয়ে বনহুর এক সময় পৌঁছে গেল হিন্দল ঘাটিতে।
আশাকে দেখে বুঝলো বনহুর সে মৃত্যুবরণ করেছে। সম্পূর্ণ দেহ তার সাদা ফ্যাকাশে হয়ে উঠেছে কিন্তু আশ্চর্য, এখনও তার দেহ ঠাণ্ডা কিংবা অসার হয়ে উঠেনি। যেমন ঘুমন্ত মানুষের দেহ নরম এবং উষ্ণ হয়, তেমনি মনে হচ্ছিলো আশা দেহটা।
আশাকে বনহুর মাটিতে শুইয়ে দিয়ে ক্লান্ত অবসন্ন দেহটা এলিয়ে দিল চেয়ারে। একটা গভীর দুঃখ আর বেদনার আভাস ফুটে উঠেছে তার চোখেমুখে।
তার অনুচরগণ ঘিরে দাঁড়িয়েছে আশার দেহটা।
সবার মুখমণ্ডলেই বিষাদের ছায়া।
হিন্দল ঘাটিতে আশা অনেকদিন ছিল, তাই বনহুরের অনুচরগণ তাকে ভালবেসে ফেলেছিল। অবশ্য আশার ব্যবহারই অনুচরদের মনে দাগ কাটতে সক্ষম হয়েছিল। বিশেষ করে লিয়ং বেশি ভালবেসেছিল আশাকে, কারণ আশা তাকে ছোট ভাইয়ের মত স্নেহময় চোখে দেখত।
আশার শায়িত দেহের পাশে দাঁড়িয়ে লিয়ং ডুকরে কেঁদে উঠলো।
অন্য অনুচরদের চোখগুলোও ছলছল করছে।
বনহুর বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বললো– আশাকে খুঁজে পাওয়া গেল সত্য কিন্তু পেয়েও কোন ফল হলো না।
রঘু বললো– সর্দার, আমার মনে হয় আশার মৃত্যু ঘটেনি, কারণ তার দেহ এখনও আরষ্ট হয়ে যায়নি বা মুখমণ্ডল সম্পূর্ণ রক্তশূন্য হয়নি।
বনহুরের এতক্ষণে হুশ হলো, সে আশার দেহটা কাঁধে তুলে নিয়ে আসলেও ভালভাবে তাকে পরীক্ষা করে দেখেনি– ওকে মৃতই মনে করেছিল। বনহুর তাড়াতাড়ি আশার হাতখানা তুলে নিল হাতের মুঠায়, সঙ্গে সঙ্গে খুশিতে দীপ্ত হয়ে উঠলো তার চোখ দুটো। বললো বনহুর–রঘু, তুমি ঠিক বলছো– আশা মরেনি, আশা জীবিত আছে।
অনুচরগণ সবাই আনন্দিত হলো, সবার মধ্যেই ফুটে উঠলো খুশির আভাস।
বনহুর বললো– রঘু, শিগগির যাও কোন চিকিৎসককে ডেকে আনো কিন্তু সাবধান, যেন সে জানতে না পারে তাকে তোমরা কোথায় নিয়ে আসছে।
আচ্ছা সর্দার।
যাও।
রঘু এবং আর একজন অনুচর বনহুরকে কুর্নিশ জানিয়ে বেরিয়ে গেল।
বনহুর তাকালো আশার সংজ্ঞাহীন মুখের দিকে।
*
রঘু আর হোসেন যখন ডাক্তারের কাছে এসে পৌঁছলো তখন সন্ধ্যা হয়। ডাক্তার বললেন সন্ধ্যার পর আমি কোথাও রোগী দেখতে যাই না।
রঘু অনুরোধ করে বললো না গেলেই নয়। যত টাকা চান তাই দেব, তবু চলুন ডক্টর।
ডাক্তার বললেন– সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। আমি এখন যাবো না বলে দিলাম। যাও, অন্য কোন ডাক্তার দেখ।
হোসেন বললো–আমরা আপনাকে নিয়ে যাবে এবং পৌঁছে দেব– আপনি তবু চলুন, নাহলে রোগী মারা যাবে।
হোসেনের অনুরোধ তাকে একটুও বিচলিত করল না, ডাক্তার নিষ্ঠুর ভাবে প্রত্যাখ্যান করলেন।
হোসেন এবং রঘু ফিরে এলো আস্তানায়, সব তারা বললো সর্দারের কাছে।
আশার মুমূর্ষ মুখমণ্ডলের দিকে তাকালো বনহুর, তারপর ফিরে চাইলে হোসেন আর রঘুর দিকে। রঘু বললো– সর্দার, আশাকে বাঁচানো সম্ভব হলো না, কারণ ডাক্তার আসবেন না বলে দিয়েছেন।
দাতে দাঁত পিষে বললো বনহুর– আসবেন না বললেই হলো–আসতেই হবে তাকে।
রঘুকে লক্ষ্য করে বললো– চলো আমার সঙ্গে।
বনহুর আর রঘু বেরিয়ে এলো বাইরে। তাজ এবং অপর একটি অশ্ব প্রস্তুত ছিল।
বনহুর আর রঘু চেপে বসল নিজ নিজ অশ্বপৃষ্ঠে।
ডাক্তারের বাড়ি চিনতে ভুল হল না বনহুর আর রঘুর।
ডাক্তার বিশ্রামকক্ষে বিশ্রাম করছিলেন। ঠিক সে মুহূর্তে কক্ষে প্রবেশ করল বনহুর।
রঘু বনহুরকে পথ দেখিয়ে নিয়ে এসেছিল, সে বাড়িটা দেখিয়ে দিয়ে সরে গেছে দূরে।
ডাক্তার হঠাৎ চমকে উঠলেন, জমকালো একটি মূর্তি তার দিকে এগুচ্ছে।
ডাক্তার বললেন– কে আপনি?
বনহুর বজ্রমুষ্ঠিতে চেপে ধরলো ডাক্তারের জামার কলার, দাতে দাঁত পিষে বললো– ডাক্তার, তৈরি হয়ে নাও, যেতে হবে তোমাকে।
অবাক কণ্ঠে বললেন ডাক্তার– এই রাতে আমি কোথায় যাবো?
বনহুর কঠিন গলায় বললো– রোগী দেখতে।
সর্বনাশ।
কেন?
রাতে আমি রোগী দেখি না।
বনহুর দক্ষিণ হাতে ডাক্তারের কলার চেপে ধরেছিল, এবার সে প্রচণ্ড ঝাঁকুনি দিয়ে বললো রাতেই যেতে হবে তোমাকে।
না, আমি যাব না। বুঝেছি সন্ধ্যায় যে লোক এসেছিল তুমি তারই লোক?
হাঁ, আমি তারই লোক। ডাক্তার, তোমার ওষুধের ব্যাগ তুলে নাও, এক্ষুণি যেতে হবে তোমাকে।
না, আমি যাবো না।
