সন্ন্যাসীরা বেশ কিছুক্ষণ মন্ত্র আওড়ালো, তারপর উঠে দাঁড়ালো তারা।
অগ্নিকণ্ডের চারপাশে কয়েকবার ঘুরে ঘুরে মন্ত্র পাঠ করলো। তারপর দলপতি তার সঙ্গীদের লক্ষ্য করে কিছু বললো।
সঙ্গীদের দু’জন বেরিয়ে গেল সেই অদ্ভুত গুহা থেকে।
বনহুর আরও বেশি করে দেয়ালের সঙ্গে মিশে দাঁড়ালো। সন্ন্যাসী দুজন চলে গেল ওদিকে অপর দিকে দরজা দিয়ে।
বনহুর স্তব্ধ নিঃশ্বাসে প্রতীক্ষা করতে লাগল। সময় যেন কাটতে চায় না। অগ্নিকুণ্ডের লালচে আলো যেন ক্রমে ম্লান হয়ে আসছে, সুড়ঙ্গমধ্যে একটু একটু করে অন্ধকার বাড়ছে।
হঠাৎ একটা শব্দ হলো।
বনহুর চমকে উঠলো, এবার তাকালো গুহার মধ্যে। দেখলো যে দু’জন সন্ন্যাসী বেরিয়ে গিয়েছিল তারা ফিরে এসেছে গুহামধ্যে। তাদের পিছনে রয়েছে চারজন লোক। লোক চারজন একটি কাঠের বাক্স বহন করে এনেছে।
কাঠের বাক্সটা কোন একটি শবাধার বলে মনে হলো বনহুরের।
বিরাট চেহারার সন্ন্যাসী পুনরায় বসে পড়ল।
যারা এতক্ষণ উদগ্রীব হয়ে দাঁড়িয়েছিল তারা শবাধারটি চারজন লোকের কাঁধ থেকে নামিয়ে নিচে রাখলো।
দলপতির নির্দেশে দু’জন সন্ন্যাসী অগ্নিকুন্ডে কিছু তেল জাতীয় তরল পদার্থ ঢেলে দিল। সঙ্গে সঙ্গে লালচে এক বিস্ময়কর আলোতে উদ্ভাসিত হয়ে উঠলো গুহাটি।
বনহুর লক্ষ্য করছিল সবকিছু, মাঝে মাঝে সে কোমরের বেল্টে হাত বুলিয়ে অস্ত্রের অস্তিত্ব অনুভব করে নিচ্ছিলো। বনহুর দেখলো শবাধারটি ওরা অগ্নিকুন্ত্রে পাশে রেখে গোলাকার হয়ে দাঁড়ালো।
দলপতি সন্ন্যাসীটি উচ্চকণ্ঠে কিছু মন্ত্র আবৃত্তি করলো।
সঙ্গে সঙ্গে চারজন সন্ন্যাসী বাক্সের ডালা খুলে ফেললো এবং তার মধ্য হতে বের করলো একটি নারীদেহ। বনহুরের চিনতে বাকি রইল না, শবাধার থেকে যে নারীদেহ বের করা হলো তা যে আশার দেহ তাতে কোন ভুল নেই। তবে কি আশার সত্যি মৃত্যু ঘটেছে আশার দেহটা ওরা বের করে অগ্নিকুণ্ডের পাশে রাখলো। বনহুরের প্রাণটা হু হু করে কেঁদে উঠলো এবার আশার দেহটা ওরা অগ্নিদগ্ধ করে খাবে।
বনহুরের মন বিদ্রোহী হয়ে উঠলো, আশা যেন তার কানে ফিস ফিস করে বললো– আমাকে এভাবে নিঃশেষ হতে দিও না বনহুর– আমাকে এভাবে অগ্নিদগ্ধ করতে দিও না– তুমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছো– ওরা আমাকে এভাবে পুড়িয়ে নিঃশেষ করে ফেলবে–
বনহুর আপন মনে বলে উঠলো না, তোমাকে আমি অগ্নিদগ্ধ হতে দেব না আশা, দেব না
ওরা যেমনি আশাকে তুলে নিয়েছে হাতের উপর, অমনি বনহুর ঝাঁপিয়ে পড়ল এবং প্রচণ্ড ঘূষি বসিয়ে দিল এক এক সন্ন্যাসীর মুখে।
আচমকা আক্রমণে সন্ন্যাসীদল ভড়কে গেল ভীষণভাবে, তারা ভাবতে পারেনি এমন একটা ঘটনা তাদের জন্য এই মুহূর্তে ঘটবে বা ঘটতে পারে। ওরা নিশ্চিন্ত মনে কাজ করে যাচ্ছিলো। বনহুরের আচমকা আক্রমণে ঘাবড়ে গেল সন্ন্যাসীদল, তারা আশার দেহটা ফেলে দিয়ে নিজেদের জীবন রক্ষার জন্য প্রস্তুত হয়ে নিল।
সন্ন্যাসী দলপতির সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হলো বনহুরের।
বনহুর দলপতিকে আক্রমণ করতেই অন্যান্য সন্ন্যাসী শবাধারে আশার দেহটা ফেলে দিয়ে। পালিয়ে গেল। তারা ঠিক বুঝতে পেরেছিল যে ব্যক্তি তাদের ভূগর্ভে সুড়ঙ্গপথে ভিতরে প্রবেশ করতে পেরেছে, সে কম ব্যক্তি নয়। তাছাড়া ব্যক্তিটি যে অত্যন্ত শক্তিশালী তাতেও কোন ভুল নেই। বনহুরের কোমরের বেল্টে অস্ত্র রয়েছে, তাও তারা লক্ষ্য করেছিল এবং এ কারণেই ভীষণ ভয় পেয়ে গিয়েছিল সন্ন্যাসীরা।
বনহুর সন্ন্যাসী দলপতিকে কিছুক্ষণের মধ্যেই কাবু করে ফেললো। যদিও সন্ন্যাসী দলপতির দেহেও অত্যন্ত শক্তি ছিল তবু সে কাবু হলো বনহুরের কাছে।
পিছু হটে সে পালিয়ে গেল কোথায় কে জানে।
বনহুর মুহূর্ত বিলম্ব না করে আশা দেহটা তুলে নিল কাঁধে, তারপর দ্রুত সুড়ঙ্গপথ ধরে উপরে উঠতে লাগল।
বনহুর কিছুটা এগুতেই একটা তীরফলক স করে তার পাশ কেটে চলে গেল এবং ভূগর্ভ সুড়ঙ্গপথের দেয়ালে গেঁথে গেল।
বুঝতে পারল বনহুর সন্ন্যাসীরা তাকে পিছন থেকে আক্রমণ করছে। হঠাৎ তার দেহে তীরফলক এসে বিদ্ধ হতেও পারে। কাঁধে আশার রক্তাক্ত দেহ। বনহুর যতদূর সম্ভব দ্রুত এগিয়ে চললো।
কিন্তু বেশিদূর না এগুতেই তার পাশ কেটে চলে গেল আরও দুটো তীরফলক। ভাগ্য প্রসন্ন বলতে হবে, তাই বনহুর রক্ষা পেল এই তীরফলক দু’টি থেকে। ততক্ষণে প্রায় সুড়ঙ্গমুখে একে পড়েছে বনহুর।
সুড়ঙ্গমুখ দিয়ে কিছু সূর্যের আলো এসে পড়েছে সুড়ঙ্গপথে। অদূরে বাঘা দাঁড়িয়ে আছে, তার ছায়া স্পষ্ট দেখতে পেল বনহুর।
বনহুর আশা সহ বেরিয়ে আসতেই বাঘা আনন্দসূচক শব্দ করে উঠলো।
বনহুর ডান কাঁধে আশার দেহখানা শক্ত করে ধরে বাঘার মাথায় হাত বুলিয়ে নিল।
বাঘা বুঝতে পারল মনিব এ মুহূর্তে কি চায়। সে তীরবেগে ছুটলো যেখানে তাজ আপন মনে বিচরণ করে ফিরছিল।
বনহুর হিন্দল জঙ্গলে আসার সময় তাজের পিঠেই এসেছিল। শুধু বনহুর নয়, তার অন্যান্য অনুচর সবাই এক একটি অশ্ব নিয়েই অনুসরণ করেছিল বাঘাকে। বাঘা দক্ষভাবে বনহুর ও তার অনুচরদের পথ দেখিয়ে নিয়ে এসেছিল।
সবাই যখন অশ্ব ত্যাগ করে পদব্রজে অগ্রসর হলো তখন অশ্বগুলো জঙ্গলের নিকটে এক জায়গায় বিচরণ করে ফিরতে লাগল।
বাঘা তীরবেগে ছুটে গেল সেই জায়গায় যেখানে অশ্বগুলো ছিল।
