তোমরা ভয় পেও না রঘু, আমি ঠিক ফিরে আসব।
কথাটা বলে বনহুর বাঘাকে অনুসরণ করলো।
বাঘা চলেছে তো চলেছেই।
বনহুর ভেবেছিল বাঘা যেখানে তাকে নিয়ে চলেছে হয়তো সেখানে গিয়ে আশাকে দেখতে পাবে কিন্তু সেখানে পৌঁছে বনহুর হতাশ হলো, আশা সন্ধান পেল না। বাঘা যেখানে এসে মাটি শুঁকতে লাগল সেখানে শুধু আছে শুকনো রক্তের ছাপ। বনহুর শিউরে উঠলো, তবে কি আশা নিহত হয়েছে? এ রক্ত তার? বাঘা পশু, কি করে সে জবাব দেবে তার প্রশ্নের।
বাঘা বারবার রক্তের দাগগুলো শুঁকে ওকে এক অদ্ভুত ধরনের শব্দ করতে লাগল, হয়তো সে কিছু বলে বনহুরকে বোঝাতে চেষ্টা করছে।
বনহুর বললো– বাঘ, বল্ আশা কোথায়? বল এ রক্ত আশার কিনা!
বাঘা লেজ নাড়তে লাগল।
বনহুর বুঝতে পারল এ রক্ত আশার। আশাকে তাহলে হিন্দল পুলিশ বাহিনী হত্যা করেছিল। সে কারণেই বাঘাও পুলিশের লোকগুলোকে এক এক করে হত্যা করেছে। কিন্তু আশার লাশ গেল কোথায়?
বনহুর বসে পড়ল একটি পাথরখণ্ডে।
পাথরখণ্ডটা পড়েছিল রক্তের দাগের পাশেই। এতটা পথ বনহুর একটানা হেঁটে এসেছে, তাই সে কিছুটা ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। তা ছাড়াও একটা দারুণ চিন্তা তাকে অস্থির করে তুলেছে। আশার এই নির্মম মৃত্যু সে যেন সহ্য করতে পারছিল না। আশার মৃত্যু তার মনকে বিচলিত করে তুলছিল।
বনহুর যখন পাথরখণ্ডে বসে ছিল তখন পাথরখানা যেন একটু দুলে উঠলো এমনি মনে হলো তার, তবে প্রথমে বনহুর তেমনভাবে গ্রাহ্য করলো না কিন্তু একটু পরেই পুনরায় পাথরখানা নড়ে উঠলো।
এবার বনহুর বুঝতে পারল পাথরখানা কোন শূন্যস্থানে লটকানো অবস্থায় আছে। সে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালো, তারপর পাথরখানা পরীক্ষা করে দেখতে লাগল। অকস্মাৎ পাথরখানা করে গেল একপাশে, বেরিয়ে এলো একটি গর্ত।
বনহুর বিস্ময় নিয়ে গর্তমুখ পরীক্ষা করে দেখতে লাগল।
বাঘার চোখেমুখেও ফুটে উঠেছে একটা আশ্চর্য ভাব, সেও উদগ্রীব হয়ে দেখছিল তাকিয়ে তাকিয়ে।
বনহুর পকেট থেকে বের করে লাইট ল্যাম্প জ্বালালো, সঙ্গে সঙ্গে দেখলো গর্ত নয় সেটা একটা সুড়ঙ্গপথ। বনহুর বাঘার দিকে ফিরে তাকালো, বাঘা তখন তাকিয়ে আছে বনহুরের দিকে।
বাঘা একটু শব্দ করলো এবং সুড়ঙ্গমধ্যে প্রবেশ করার জন্য পা বাড়ালো।
বনহুরের দৃষ্টি পড়ল পাথরটার গায়ে এক জায়গায় রক্তের দাগ লেগে আছে। একটা চিন্তার ছায়া ছিল বনহুরের মুখে। তবে কি রক্ত পাথরটার গায়ে লেগেছে। বনহুর নিজে প্রবেশ করলো সুড়ঙ্গ মধ্যে। বাঘা তাকে অনুসরণ করলো।
অন্ধকার সুড়ঙ্গমধ্যে ধীরে ধীরে অগ্রসর হচ্ছে বনহুর। বাঘাও তেমনি আস্তে আস্তে এগুচ্ছে, সে বুঝতে পেরেছে নিশ্চয়ই তার মনিব সুড়ঙ্গমধ্যে কিছুর সন্ধান পেয়েছে।
বনহুর এগুচ্ছিলো।
তার মনে হচ্ছে বাঘাও যেন তার একজন অনুচর। অবশ্য বনহুরের চিন্তাধারা মিথ্যা নয়, বাঘা বনহুরের অনুচরই বটে, কারণ বনহুরকে সে প্রাণাপেক্ষা বেশি ভালবাসে।
বনহুর সুড়ঙ্গপথ ধরে যতই এগুচ্ছে ততই বিস্ময় জাগছে তার মনে। গভীর জঙ্গলে অদ্ভুত এক সুড়ঙ্গপথ, কে জানে এ সুড়ঙ্গপথ কোথায় গিয়ে শেষ হয়েছে। নিশ্চয়ই আশার মৃতদেহ এই সুড়ঙ্গমধ্যে নিয়ে আসা হয়েছে তাতে কোন ভুল নেই, কারণ পাথরের উপর স্পষ্ট দেখতে পেয়েছে সে রক্তের ছাপ। বাঘা তাকে দক্ষ অনুচরের মত অনুসরণ করে চলেছে।
বেশ কিছুটা এগুতেই বনহুর থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল, সে দেখলো একটা লাল আলোকরশি বেরিয়ে আসছে অদূরস্থ এক গুহা থেকে। সুড়ঙ্গ মধ্যে অদ্ভুত গুহা, আশ্চর্য বটে।
বনহুর নিজের ঠোঁটে আংগুলচাপা দিয়ে বাঘাকে সতর্ক করে দিল, সে যেন কোনরকম শব্দ না করে।
বাঘা বনহুরের দিকে তাকালো এবং বনহুরের ইংগিত যেন সে বুঝতে পারল, নিপে অতি হালকা পায়ে এগুতে লাগল বাঘা।
বনহুর সুড়ঙ্গের দেয়ালে ঠেস দিয়ে দিয়ে এগুচ্ছে, যেন তার শরীরের ছায়া সুড়ঙ্গপথের মেঝেতে এসে না পড়ে। বনহুর এবার বাঘার মাথায় হাত বুলিয়ে চাপাকণ্ঠে বললো– বাঘা, তুই এবার ফিরে যা। সুড়ঙ্গমুখে আমার জন্য অপেক্ষা করবি। যা বাঘা, চলে যা।
বাঘা যেন বনহুরের কথা বুঝতে পারল সে ফিরে এলো সুড়ঙ্গমুখে।
বনহুর ধীরে ধীরে অগ্রসর হয়ে ঐ গুহার পাশে এসে দাঁড়ালো, যে গুহা থেকে অদ্ভুত ধরনের আলোকরশ্মি বেরিয়ে আসছিল। বনহুর দেয়ালে পিঠ লাগিয়ে ঘাড় বাঁকা করে দেখলো যেমনি গুহামধ্যে দৃষ্টি ফেললো অমনি বিস্ময়ে স্তম্ভিত হলো সে। দেখতে পেল গুহার মধ্যে একটি অগ্নিকুণ্ড জ্বলছে। সেই অগ্নিকুণ্ডে পাশে বসে আছে এক জটাজুটধারী সন্ন্যাসী। সন্ন্যাসীর চেহারা বিরাট এবং ভয়ঙ্কর। চোখ দুটো তার মুদিত। সম্মুখে একটি ত্রিফলা আকারে লৌহশলাকা মাটিতে গাঁথা রয়েছে।
অগ্নিকুণ্ডের চারপাশে ঘিরে বসে আছে আরও চারজন সন্ন্যাসী, তারা সবাই চোখ মুদিত অবস্থায় বসে আছে।
অগ্নিকুণ্ডের লালচে আলোকরশ্মিতে সন্ন্যাসীগুলোকে বড় ভয়ঙ্কর, ভীষণ লাগছিল। সন্ন্যাসী দলপতি কি যেন বিড়বিড় করে আওড়াচ্ছিলো।
যে মুহূর্তে সন্ন্যাসী দলপতির ঠোঁট দু’খানা চুপ হচ্ছিলো তখন তার সঙ্গীরা বিড়বিড় করে অদ্ভুত শব্দ উচ্চারণ করছিল। কি বলছে ঠিক বুঝতে পারে না বনহুর, তবে কোন মন্ত্র হবে তাতে কোন সন্দেহ নেই।
সন্ন্যাসীগুলো আসল সন্ন্যাসী না কোন যাদুকর ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। এরা ভূগর্ভে এমনভাবে আত্মগোপন করে আছে কেন আর এদের আত্মগোপন করার উদ্দেশ্যই বা কি। নিশ্চয়ই এরা কোন উদ্দেশ্য নিয়েই এখানে আছে। আশাকে এরাই হত্যা করেছে, নাহলে সুড়ঙ্গপথে রক্তের ছাপ থাকবে কেন। বনহুরের মনে নানা রকম চিন্তার উদ্ভব হচ্ছিলো, সে ভালভাবে লক্ষ্য করে দেখছিল সবকিছু।
