বাঘাকে দেখে চমকে উঠলো বনহুর, বাঘার মুখে এবং দেহে রক্তের ছাপ লেগে আছে। হঠাৎ কিছু বুজতে না পেরে অবাক হলো বনহুর।
অনুচররাও কম আশ্চর্য হয়নি, একজন অনুচর রাইফেল উদ্যত করে ধরলো বাঘাকে লক্ষ্য করে, বললো– সর্দার, বাঘাই আশাকে হত্যা করেছে, দেখছেন না ওর মুখের রক্তের ছাপ। হুকুম করুন সর্দার, এ গুলীতে ওকে হত্যা করি।
বনহুর বললো– না, ওকে হত্যা করা চলবে না।
অপর একজন অনুচর বললো– বাঘা পাগল হয়ে গেছে, তাই সে আশাকে হত্যা করেছে।
বাঘা হয়তো অনুচরদের কথা বুঝতে পারল, সে বনহুরের প্যান্টের কাপড় কামড়ে ধরে কিছু বোঝাতে চেষ্টা করলো।
অনুচরদের একজন বলে উঠলো– সর্দার, ও আপনাকে কামড়াবে।
বনহুর বাঘার মাথায় হাত বুলিয়ে বললো– কি হয়েছে বাঘা? আশা কোথায়? বল আশা কোথায়? বাঘা বনহুরের কাপড় কামড়ে তাকে বের হতে বলছে। যদিও সে কথা বলতে পারছে না। তবু তার আচরণ দেখে মনে হচ্ছিলো সে তাকে তার সঙ্গে যাবার জন্য ইংগিত করেছে।
বনহুর অনুচরদের লক্ষ্য করে বললো– বাঘা আমাকে তার সঙ্গে যাবার জন্য বলছে। তোমরা কয়েকজন এসো, দূর থেকে আমাকে এবং বাঘাকে অনুসরণ কর।
ততক্ষণে রঘু দাঁড়িয়েছে সেখানে।
পূর্ব হতেই সে সব শুনেছিল, এখন সে নিজেও সর্দারকে অনুসরণ করলো।
বাঘা চলেছে আগে আগে তার পিছনে চলেছে বনহুর।
বনহুরের অনুচরগণ দূরে থেকে বাঘা এবং সর্দারকে অনুসরণ করছে।
বনহুরের দেহে জমকালো পোশাক, মাথায় কালো পাগড়ি, পায়ে ভারী বুট, কোমরের বেল্টে গুলীভরা রিভলভার, অপর এক খাপে সূতীক্ষ্ণ ধার ছোরা রয়েছে।
বাঘা আপন মনে অগ্রসর হচ্ছিলো। জিভটা বেরিয়ে এসেছে, চোয়ালের দু’পাশ দিয়ে দেখা যাচ্ছে ধারালো দাঁতগুলো। চোয়াল এবং মুখে রক্ত লেগে আছে– কিসের রক্ত, কার রক্ত জানে না কেউ।
বনহুর আর বনহুরের অনুচরগণ এগুচ্ছে, তাদের মনে নানারকম চিন্তাধারা বয়ে চলেছে।
হিন্দল জঙ্গল।
যদিও কান্দাই জঙ্গলের মত হিন্দল জঙ্গলের গভীরতা ছিল না তবু একেবারে কমও নয়। বিরাট জঙ্গলের কিছু অংশ মানুষ বা কোন জীবজন্তু প্রবেশ করতে পারত না, কারণ এ অঞ্চলে ছিল শুধু কাটা বন। অদ্ভুত ধরনের কাটা বন। — এ ছাড়াও ছিল মানুষখেকো গাছ। হঠাৎ যদি কোন জীবজন্তু বা মানুষ ভুল করে এদিকে এসে পড়তো, সে আর কোনদিন ফিরে আসতো না।
বাঘা বনহুরকে নিয়ে সেদিকে অগ্রসর হলো।
জঙ্গলের বিপদজনক স্থানের দিকে সর্দারকে যেতে দেখে তার অনুচরগণ বেশ ঘাবড়ে গেল, তারা দ্রুত এগিয়ে এসে সর্দারের পথরোধ করে দাঁড়ালো।
একজন বললো– সর্দার, আর অগ্রসর হওয়া আপনার উচিত হবে না, কারণ ওদিকে গেলে কেউ ফিরে আসে না।
বনহুর বললো– তোমরা আমাকে বাধা দিও না, আমাকে যেতেই হবে বাঘা যেখানে যেতে চায় সেখানে।
অনুচররা জানতে সর্দার তাদের বাধা শুনবে না, কাজেই নিশ্চুপ রইলো।
বনহুর বললো– তোমাদের যদি ভয় হয় তবে তোমরা যেও না।
কিন্তু অনুচরগণ সর্দারের জন্য জীবন দিতেও প্রস্তুত আছে, কাজেই তারা কেউ ফিরে যাবার জন্য পিছপা হলো না।
কিছুটা এগুতেই দেখতে পেল বনহুর, অদূরে একটি গাছের নিচে পড়ে আছে বিক্ষিপ্তভাবে কয়েকটি মৃতদেহ। মৃতদেহগুলোর দেহ ক্ষতবিক্ষত, রক্তাক্ত।
বনহুর তার অনুচরদের লক্ষ্য করে বললো– এই দেখ বাঘার কীর্তি। বাঘা এদের হত্যা করেছে এবং এই নিহত ব্যক্তিদের রক্তই লেগে রয়েছে বাঘার মুখমণ্ডলে।
বনহুরের অনুচরদের চোখেমুখে ফুটে উঠেছে এক বিস্ময়কর ভাব। তারা নিহত ব্যক্তিদের দেখে একেবারে হতভম্ভ হয়ে পড়েছে। এতগুলো লোককে বাঘা একা কি করে নিহত করলো ভেবে পায় না বনহুর। প্রতিটি লেকের পাশে পড়ে আছে পিস্তল, রাইফেল, রিভলভার এক একটি আগ্নেয়াস্ত্র।
বনহুর যখন নিহত লোকগুলোকে পরীক্ষা করে দেখছিল তখন বাঘা এক অদ্ভুত ধরনের শব্দ করছিল, রাগে ফুলে উঠছিল বাঘার লোমগুলো।
বনহুরের অনুচর রঘু বললো– সর্দার, এরা করা জান? নিশ্চয় কোন শত্রুদল।
*
বললো বনহুর— আমি বুঝতে পেরেছি, যদিও এরা ছদ্মবেশ ধারণ করেছে তবু চিনতে আমার ভুল হয়নি– এরা হিন্দল পুলিশ বাহিনীর লোক। কিন্তু বাঘা এদের কেনই বা হত্যা করেছে, তবে কি আশাকে এরা ধরে নিয়েছিল? যদি এরা আশাকে ধরবে তবে সে গেল কোথায়?
বাঘা তখন নিহত লোকগুলোর পাশে ঘুরে ঘুরে আনন্দ উপভোগ করছিল এবং মাঝে মাঝে বনহুরের দিকে তাকিয়ে কিছু বলতে চেষ্টা করছিল।
কিন্তু বাঘার কথা কেউ বুঝতে পারছিল না।
বনহুর বললো– বাঘা, তুই এদের কেন হত্যা করেছিস? বল্ কেন হত্যা করেছিস?
বাঘা যেন বুঝতে পারল বনহুরের কথাগুলো। সে লাশগুলোর পাশ থেকে সরে এলো, তারপর বনহুরকে তার সঙ্গে চলার জন্য তার কাপড় কামড়ে ধরে ইংগিত করলো।
বনহুর বাঘার সঙ্গে এগুবার পূর্বে আর একবার লাশগুলো ভালভাবে পরীক্ষা করে দেখলো। প্রতিটি লাশ বাঘার দাঁত এবং নখের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেছে। বিকৃত হয়ে গেছে তাদের মুখমণ্ডল, চিনবার উপায় নেই কাউকে।
বনহুর এবার অনুচরদের লক্ষ্য করে বললো– তোমরা এখানে অপেক্ষা কর, আমি বাঘাকে অনুসরণ করছি। হয়তো আশার সন্ধান পাবো।
রঘু বললো— সর্দার, আপনি একা যাবেন?
না, বাঘা আমার সঙ্গে আছে।
তবুও আপনি—
কিছু ভাবতে হবে না তোমাদের।
সর্দার, বাঘা যেদিকে যাচ্ছে ওদিকে বড় বিপদ আছে।
