পুলিশ বাহিনী কয়েকজন ভড়কে গিয়েছিল, সন্ধ্যার অন্ধকার যতই ঘনীভূত হচ্ছিলো ততই ভীত হচ্ছিলেন তাঁরা, অবশ্য কয়েকজন নির্ভীক পুলিশ অফিসার এ দলে ছিল যারা ভয় পাবার লোক নন।
হিন্দল জঙ্গল হাতড়ে বেড়ানো যে কতবড় দুঃসাহসের কথা, হয়তো অনেকেই না জানলেও হিন্দল পুলিশ বাহিনী জানে।
তারা যখন অগ্রসর হচ্ছিলো তখন হঠাৎ তাদের দূরবীক্ষণ যন্ত্রে ধরা ছিল সেই ভীষণ চেহারার কুকুরটি আর এক নারী মূর্তি।
হিন্দল পুলিশ বাহিনীর যারা ইতিপূর্বে বনহুর গ্রেফতার অভিযানে পড়ল তারা চিনে ফেললেন বাঘাকে। এ কুকুরটিই তাদের কতগুলো শিকারী কুকুরকে ঘায়েল করে ফেলেছে এবং কয়েকটিকে নিহত করেছে।
দলের প্রধান যিনি ছিল তিনি নির্দেশ দিল, কুকুরটিকে লক্ষ্য করে গুলী ছোড়। কুকুরটিকে হত্যা করে ঐ নারীকে গ্রেফতার করতে হবে, তাহলেই আমরা সন্ধান পাবো দস্যু বনহুরের।
দলপতির নির্দেশ পাওয়ামাত্র পুলিশ বাহিনীর একজন অভিজ্ঞ পুলিশ তার রাইফেল উঁচু করে ধরলো এবং সে বাঘাকে লক্ষ্য করে গুলী ছুড়লো।
ঠিক ঐ মুহূর্তে আশা একটু সরে এসেছিল, তাই গুলীটা বাঘার শরীরে বিদ্ধ না হয়ে বিদ্ধ হলো আশার দেহে, সঙ্গে সঙ্গে আশা মাটিতে পড়ে গেল এবং রক্তে ভিজে গেল হিন্দল জঙ্গলের শুকনো মাটি।
হঠাৎ আশাকে এভাবে পড়ে যেতে দেখে বাঘা ভীষণভাবে চমকে উঠেছিল এবং পর মুহূর্তে সে বুঝতে পেরেছিল আশার অবস্থা ভয়াবহ কেউ বা তাকে হত্যার উদ্দেশ্যে গুলী ছুঁড়েছিল, পশু হলেও সে ঠিক তা ধরে নিয়েছিল এবং ঐ দণ্ডে সে ছুটেছিল শত্রুর সন্ধানে, কিন্তু বেশিক্ষণ সে শত্রুর সন্ধানে মনোযোগ দিতে পারেনি। কারণ আশা রক্তাক্ত দেহে মাটিতে পড়ে গেল, সে ঐ সময় কেমন আছে হয়তো এ কথাটাই বাঘার মনে উদয় হয়েছিল, তাই সে পুনরায় ফিরে এসেছিল আশার কাছে।
কিন্তু বাঘা এসে আশাকে আর দেখতে পায়নি। শুধু দেখতে পেয়েছিল তাজা রক্তের ছাপ। বাঘা বেশিক্ষণ বিলম্ব করতে পারেনি, কারণ শত্রু তাহলে হাতছাড়া হবে, তাই বাঘা আবার ছুটেছিল শক্রর সন্ধানে।
বাঘা শত্রুর সন্ধান পেয়েছে, আর সে সরে যাবে না। গাছটার অদূরে সে বসে রইলো চুপটি করে। মাঝে মাঝে ঊর্ধ্বমুখী হয়ে দেখে নিচ্ছিলো সে শত্রু গাছে আছে কিনা। পুলিশ বাহিনীর যারা গাছটার উপরে উঠে বসেছিল, তারা অস্ত্র থাকা সত্ত্বেও বাঘাকে লক্ষ্য করে গুলী ছুঁড়তে পারছিল না, কারণ বাঘা ছিল লক্ষ্যের বাইরে।
অত্যন্ত চালাক ছিল বাঘা, সে জানে শত্রুর হাতে অস্ত্র আছে, তাই সে গাছের গোড়ার দিকে লক্ষ্য রেখে বেশ দূরেই বসেছিল! যেমনি ওরা গাছ থেকে নামবে, অমনি সে আক্রমণ করবে শত্রুকে।
হিন্দল পুলিশ বাহিনী যারা বৃক্ষডালে বসেছিল তারা ধীরে ধীরে অবসন্ন হয়ে আসছিল, পর পর কয়েকবার তারা বাঘাকে লক্ষ্য করে গুলী ছুঁড়েছিল কিন্তু বাঘার নাগাল পায়নি তাদের নিক্ষিপ্ত গুলীগুলো।
সমস্ত রাত কেটে গেল।
বাঘা ঠায় বসে রইলো, একবারেও সে সরে গেল না।
ওদিকে আশাকে ফিরে যেতে না দেখে হিন্দল ঘটির অনুচরগণ চিন্তিত হলো। আশার সঙ্গে রয়েছে বাঘা, সেও ফিরে এলো না, ব্যাপারখানা তাদের কাছে বেশ ঘোরালো লাগছে।
কয়েকজন অনুচর আশার সন্ধানে বেরিয়ে পড়ল, হিন্দল জঙ্গলের প্রায় অর্ধেক চষে ফেললো তবু তারা আশার সন্ধান পেল না।
সংবাদটা সঙ্গে সঙ্গে ওয়্যারলেসে জানিয়ে দিল ওরা বনহুরকে।
বনহুর তখন ফাংহায় যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলো।
ফাংহায় এক অদ্ভুত কাণ্ড প্রতিদিন ঘটে চলেছে। সে হলো এক বিস্ময়কর জীবের আবির্ভাব। প্রতি রাতে ফাংহা শহরে–বন্দরে–গ্রামে এক অদ্ভুত পায়ের ছাপ পরিলক্ষিত হচ্ছে এক একটি মৃতদেহ। মৃতদেহগুলো কোন না কোন যুবকের। নিহত যুবকগুলোর দেহ অবিকৃত কিন্তু তাদের প্রত্যেকের বুক চিরে অতি কৌশলে হৃদপিণ্ড বের করে নেওয়া হয়েছে। মৃতদেহের অন্য কোন স্থানে কোন ক্ষতচিহ্ন নেই। তবে মৃতের চোখেমুখে এক ভয়ঙ্কর ভীতির ভাব ফুটে থাকতে দেখা যাচ্ছে।
সংবাদটা বনহুরকে বেশ ভাবিয়ে তুলেছে। কান্দাই শহরে একবার এমনি এক অদ্ভুত হত্যাকাণ্ডের সূত্রপাত ঘটেছিল, সে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হতো লোমশ দুটি বাহু দ্বারা, তবে এ হত্যাকাণ্ড কার দ্বারা সংঘটিত হচ্ছে কে জানে। বনহুর ফাংহার হত্যাকাণ্ড নিয়ে যখন গভীরভাবে চিন্তা করছিল তখন ওয়ারলেসে সংবাদ এলো আশা হিন্দল জঙ্গল থেকে হারিয়ে গেছে, তাকে আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
এ সংবাদে বনহুর ভীষণভাবে বিচলিত হলেও একেবারে ঘাবড়ে গেল না, সে ভ্রু কুঞ্চিত করে ভাবলো, নিশ্চয় আশাকে পুলিশ বাহিনী উধাও করেছে, নইলে সে হঠাৎ অন্তর্ধান হবে কেন?
বনহুরের ফাংহায় যাওয়া হলো না, সে হিন্দল অভিমুখে রওনা হলো।
বনহুর প্রথম জম্বু পৌঁছলো, তারপর সুড়ঙ্গপথে হিন্দল অভিমুখে রওনা দিল।
হিন্দল পৌঁছে বনহুর জানতে পারল, শুধু আশাই নয়, বাঘাও আশার সঙ্গে নিখোঁজ হয়েছে।
ঘটনাটা যেন কেমন রহস্যপূর্ণ মনে হলো বনহুরের কাছে। অনুচরগণ বহু সন্ধান করেও আশার কোনো খোঁজ পায়নি বা বাঘাকেও দেখতে পায়নি তারা।
বনহুর নিজে অনুচরদের নিয়ে প্রস্তুত হলো সে হিন্দল জঙ্গলে সন্ধান করবে, তারপর পুলিশ মহলে খোঁজ করে দেখবে আশা কোথায় আছে।
যখন বনহুর সহচরদের নিয়ে আস্তানার বাইরে বের হবে, ঠিক ঐ মুহূর্তে বাঘা এসে সম্মুখে দাঁড়ালো।
