বনহুরকে লক্ষ্য করে বললো আশা ভারি অদ্ভুত কুকুর বাঘা। বনহুর, আমি এমন কুকুর কোনদিন দেখিনি।
ঐ মুহূর্তে লিয়ং একটা গামলাভর্তি তাজা মাংস নিয়ে হাজির হলো।
বনহুর ওর হাত থেকে গামলাটি নিয়ে মেঝেতে রাখলো, তারপর এক একখণ্ড তুলে নিয়ে ছুঁড়ে দিতে লাগল সে বাঘার মুখ গহ্বরে।
বাঘার তখন আনন্দ ধরে না, লেজ নেড়ে নেড়ে সে বনহুরের সঙ্গে বন্ধুত্ব ভাব জমিয়ে তুলছিল।
আশা মুগ্ধ হলো।
একখণ্ড মাংস তুলে নিয়ে সেও বাঘার দিকে এগিয়ে ধরলো।
বাঘা কিন্তু এতক্ষণ বাঁকা চোখে আশাকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিল, কেমন যেন সন্দেহপূর্ণ ভাবে তাকাচ্ছে সে আশার দিকে।
এবার আশাকে একখণ্ড মাংস তুলে নিয়ে তার দিকে বাড়িয়ে ধরতে দেখে চট করে মাংস গ্রহণ করতে পারল না সে, ফিরে তাকালো বনহুরের মুখের দিকে।
বনহুর একটু হেসে বললো– নে খেয়ে নে, নে বাঘা। ওর নাম আশা– আমার বন্ধু, বুঝলি? নে, নে বাঘা।
এবার বাঘা না নিয়ে পারলো না।
আশার হাত থেকে মাংস খণ্ড নিয়ে গোগ্রাসে গিলে ফেললো বাঘা।
আশা পুনরায় আর একটি মাংসখণ্ড দিল ওর মুখে। সেটিও বাঘা নিয়ে ফেললো।
বাঘা কিছুক্ষণের মধ্যেই আশার সঙ্গে ভাব জমিয়ে ফেললো।
বনহুর দেখে মুগ্ধ হলো, বললো সে বানরীকন্যা শাপলাকে তুমি মানবী বানিয়ে ছেড়েছো, তাকে বশীভূত করে ফেলেছিলো নিজের বোনের মত করে আর বাঘাতে জন্তু, ওকে বশিভূত করতে তোমার মোটেই সময় লাগবে না।
সে কথা মিথ্যা নয়, অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই বাঘা আশার ভক্ত হয়ে পড়ল। আধো অন্ধকার ঘরে সমস্ত দিন বাঘা বন্দী থাকে, রাত যখন গম্ভীর হয় তখন বাঘাকে মুক্ত করে দেয়া হয়। বাঘার সঙ্গে থাকে রঘু কিংবা বনহুর।
আশা একদিন বাঘাকে নিয়ে সন্ধ্যার অন্ধকারে বেরিয়ে পড়ল।
বনহুর যেদিন বিদায় নিয়ে চলে গেছে কান্দাই অভিমুখে, আশার একা মোটই ভালো লাগছিল না! আজকাল বাঘা আশার বাধ্য হয়ে গেছে, তাই আজ যখন বারবার ওর মনটা বনহুরের জন্য কেমন করছিল তখন বাঘাকে নিয়ে আশা বের হলো।
হিন্দল জঙ্গল আশার তেমন পরিচিত নয়, তবু আশা প্রায়ই বের হতে রাতের অন্ধকারে। অন্যান্য দিনের মত আজও আশা বের হলো, বাঘা রয়েছে তার সঙ্গে।
আগে আগে এগুচ্ছে আশা, পিছনে বাঘা। মাঝে মাঝে আশা বাঘার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলো। বাঘা এতে খুশি হচ্ছিলো অনেক, সেও লেজ নেড়ে নেড়ে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছিলো।
আজ আমার মন ভাল নেই, তাই অন্যমনস্কভাবে পথ চলছিল। মনের পর্দায় ভেসে উঠছিল বনহুরের মুখখানা। যদিও আশা বনহুরকে কোনদিন নিবিড়ভাবে পায়নি তবু সে পেয়েছে তার স্বচ্ছ–পবিত্র ভালবাসা। আশা তাতেই খুশি, তৃপ্ত, আনন্দিত। আশা ওর কাছে বেশি কিছু চায় না, চায় শুধু ওকে পাশে পেতে। জানে আশা, ওকে সে ধরে রাখতে পারবে না। রাখা যাবেও না কোনদিন তবু মন চায় ওকে ধরে রাখতে। বনহুর হিন্দল পুলিশ বাহিনী এবং হিন্দল শিকারী কুকুরগুলোর দৃষ্টি এড়িয়ে অতি স্বাভাবিকভাবেই হিন্দল থেকে চলে গেছে।
পুলিশ বাহিনী কিন্তু সেই ভীষণ ঝড়বৃষ্টি আর তুফানের কথা বিস্মৃত হয়ে পুনরায় হিন্দল জঙ্গল অভিমুখে রওনা দিল, এবার তারা শিকারী কুকুরগুলো সঙ্গে নেয়নি, নিয়েছে আগ্নেয়াস্ত্র।
ওরা গোপনে অতি সতর্কতার সঙ্গে বনজঙ্গল অতিক্রম করে এগুচ্ছে। ওদের দেহে ছিল জংলী জাতীয় পোশাক পরিচ্ছদ। সহসা কেউ দেখলে যাতে চিনতে না পারে বা বুঝতে সক্ষম না হয়, সে জন্যই তারা এ ধরনের পোশাক পরিধান করেছিল।
আশা যখন বাঘাকে সঙ্গে নিয়ে হিন্দল জঙ্গল অতিক্রম করে সম্মুখস্থ একটি ঝিলের দিকে অগ্রসর হচ্ছিলো তখন একটা গুলী এসে বিদ্ধ হলো আশার পিছে।
সঙ্গে সঙ্গে আশা পড়ে গেল মাটিতে।
আশা ভাবতেও পারেনি এমন একটা বিপদ তার জন্য ওৎ পেতে ছিল সেখানে।
আশা মাটিতে পড়ে যেতেই বাঘা ঘেউ ঘেউ করে উঠলো, সে ছুটলো যেদিক থেকে গুলী এসে বিদ্ধ হয়েছিল সেদিকে কিন্তু কাউকে সে ঐ মুহূর্তে খুঁজে পেল না। একটু পরই সে ফিরে এলো আশার পাশে, এসে বাঘা আর আশাকে দেখতে পেল না। মাটিতে পড়ে আছে চাপ চাপ তাজা রক্ত। বাঘা চারদিকে সন্ধান করে দেখতে লাগল। আশাকে খুঁজে না পেয়ে বাঘা পুনরায় ছুটলো যেদিক থেকে গুলী এসেছিল সেইদিকে। মাটি খুঁকে ওঁকে অগ্রসর হলো বাঘা। কিন্তু তেমন কোন গন্ধ সে আবিষ্কার করতে সক্ষম হচ্ছে না।
তবু বাঘা চললো, হঠাৎ এক জায়গায় এসে বাঘার নাকে শত্রুর গন্ধ প্রবেশ করলো। বাঘার মুখ দিয়ে বেরিয়ে এলো অদ্ভুত এক ধরনের শব্দ রাগে ফুলে উঠলো বাঘার দেহের লোমগুলো। বাঘা শত্রুর সন্ধান পেয়েছে। সে মাটি একে একে এগুতে লাগল। বেশ কিছুটা এগুতেই বাঘা তাকালো গাছের উপরে। সে দেখলো বিরাট একটি গাছ, তার ডালে বসে আছে কয়েকজন লোক।
বাঘা বুঝতে পারল তারাই আশাকে লক্ষ্য করে গুলী ছুঁড়েছিল। যদিও রাতের অন্ধকার তখন জমাট হয়ে এসেছে তবু বাঘার দৃষ্টি থেকে রেহাই পেল না আশার শত্রুরা। বাঘা তাদের স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে।
সমস্ত রাত ধরে বাঘা গাছের তলায় বসে রইলো। এক মুহূর্তের জন্যও সে গাছের তলা থেকে সরে গেল না। রাগে বাঘা ফুলছে, তার চোখ দুটো অন্ধকারে জ্বলছে যেন। বাঘার সে কি ভীষণ চেহারা– এই মুহূর্তে কেউ সামনে পড়লে তার রক্ষা নেই।
গাছের ডালে যারা উঠে বসেছে তারা হলো হিন্দল পুলিশ বাহিনী। তারা অতি গোপনে এবং সতর্কতার সঙ্গে এগুচ্ছিলো। মাঝে মাঝে উঁচু টিলা বা গাছের ডালে বসে দূরবীক্ষণ যন্ত্র দ্বারা দেখছিল কোথাও কিছু দেখা যায় কিনা। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছিল তবু হিন্দল পুলিশ বাহিনী ক্ষান্ত হয়নি। হবার কোন উপায়ও ছিল না, কারণ সরকারি নির্দেশ রয়েছে তারা ফিরে যেতে পারবে না যতক্ষণ না দস্যু বনহুরকে তারা গ্রেফতার করতে সক্ষম না হয় বা সন্ধান না পায়। পুলিশ বাহিনীর কয়েকজন নামকরা অফিসার এবার এসেছেন, অবশ্য এরা পূর্বের অনুসন্ধানকারী দলেও ছিল।
