স্যার, বিশ্বাস করুন কালকের ঝড়বৃষ্টি ছিল বড় অদ্ভুত। ঐ ঝড়বৃষ্টির সঙ্গে প্রাকৃতিক কোন যোগাযোগ ছিল বলে আমার মনে হয় না। নিশ্চয়ই ওটা কোন–
বলেন, থামলেন কেন? বললেন পুলিশ প্রধান মিঃ নাং চিয়ু।
মিঃ হিং বললেন– স্যার, আমরা যাকে পাকড়াও করব বলে সন্ধান করছিলাম কালকের ঝড়বৃষ্টির পিছনে আছে তারই কারসাজি–
আপনি কি বলছেন মিঃ হিংহু।
হাঁ স্যার, আমার মনে হয় এই দুর্যোগ সৃষ্টিকারী স্বয়ং দস্যু বনহুর।
দস্যু বনহুর!
হাঁ, কারণ তার অসাধ্য কিছুই নেই। হয়তো এমন কোন মেশিন আছে যার দ্বারা সে ভীষণ ঝড়বৃষ্টি তৈরি করে আমাদের পথ রোধ করেছিল। তাছাড়া যে ভয়ঙ্কর কুকুরটি আমাদের শিকারী কুকুরগুলোকে নিহত করেছে, সে কুকুরটিও তারই একজন অনুচর।
অপর একজন পুলিশ অফিসার বললেন– স্যার, আমরা জন্তুটার হাত হতে বাঁচার জন্য একেবারে মরিয়া হয়ে উঠেছিলাম। কুকুর তো নয় যেন একটা হিংস্র ব্যাঘ্র। একটা কুকুর এতগুলো কুকুরকে ঘায়েল করলো অথচ আমরা কোন কিছু করতে পারলাম না।
ঠিক বলেছ, কুকুর নয় যেন একটা ভয়ঙ্কর জীব। আকারে যেমন বৃহৎ তেমনি ভীষণ চেহারা। কি বলবো স্যার, আমরা একেবারে নাজেহাল হয়ে উঠেছিলাম।
পুলিশ প্রধানের চক্ষুস্থির, কারণ এমন তাজ্জব ব্যাপার কোনদিন তারা দেখেননি বা শোনেননি। মেশিনের দ্বারা ঝড়বৃষ্টি–তুফান হয় এ কেমন কথা! তবে আজকাল বিজ্ঞানের যুগ, নানা রকম মারাত্মক মেশিন এবং যন্ত্রের আবিষ্কার ঘটেছে। সে সব যন্ত্রের দ্বারা অসাধ্য সাধন হয়।
তবু যেন বিশ্বাস হয় না মিঃ হিংহুর কথাগুলো পুলিশ প্রধান মিঃ নাংচিয়ুর, তিনি ক্রুদ্ধ কণ্ঠে বলেন— যেমন করে হোক দস্যু বনহুরকে পাকড়াও করতেই হবে। জন্তু পুলিশ মহল থেকে সংবাদ এসেছে দস্যু বনহুর হিন্দল অভিমুখে এসেছে, তাকে গ্রেফতার করার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন জম্বুর অধিনায়ক।
মিঃ হিংহু বললেন– স্যার চেষ্টার কোন ত্রুটি করিনি কিন্তু এমনভাবে আমাদের হয়রানি হতে হবে, ভাবতে পারিনি আমরা।
আমাদের কুকুরগুলো এখন কোথায় আছে মিঃ হিংহু?
মিঃ হিংহু ক্লান্ত কন্ঠে জবাব দিল– পুলিশ গুদামে কুকুরগুলোকে রাখা হয়েছে। স্যার, কুকুরগুলো বড় অবসন্ন হয়ে পড়েছে।
পুলিশ প্রধান কঠিন কণ্ঠে বললেন– তবু আপনাদের পুনরায় চেষ্টা চালাতে হবে। পুনরায় যেতে হবে হিন্দল বন অভিমুখে। আমাদের শিকারী কুকুরগুলো যত অবসন্নই হোক না কেন, দুদিনেই সবল হয়ে উঠবে। এক্ষুণি কুকুর পালককে জানিয়ে দিন তাদেরকে যেন ভাল খাবার এবং কাঁচা মাংস খাওয়ানো হয়। প্রতিদিন এক একটি কুকুরকে চার সের কাঁচা মাংস খাওয়ানো দরকার।
আচ্ছা স্যার, আপনার নির্দেশমতই কাজ করব। বললেন মিঃ হিংহু।
সেদিনের কথাটা সমস্ত শহরময় ছড়িয়ে পড়েছে। সবার মুখেই সেই অদ্ভুত ঝড়বৃষ্টি আর দুর্যোগের কথা। আকাশে মেঘ নেই, বাতাস নেই হঠাৎ ঝড়ো হাওয়া, তার সঙ্গে ভীষণ বৃষ্টিপাত। যদিও এই ঝড়ো হাওয়া বনজঙ্গলেই হয়েছিল তবু শহরের অনেকেই আঁচ করেছিল কিছুটা।
*
হিন্দল শহরবাসীরা যখন বনহুর আর হিন্দল পুলিশ বাহিনী সম্বন্ধে নানা রকম আলাপ আলোচনা করছিল, তখন বনহুর তার হিন্দল আস্তানায় আধো অন্ধকার একটি কক্ষে বসে বাঘার সঙ্গে বন্ধুত্ব করছিল।
বনহুর বসে আছে একটু সামান্য উঁচু আসনে। আর তার পায়ের কাছে বসে আছে বাঘা। যে বাঘার কাছে হিন্দল পুলিশ বাহিনী নাজেহাল পেরেশান হয়ে গেছে, যে বাঘা নিহত করেছে কয়েকটি হিন্দল শিকারী কুকুরকে, যে বাঘার সঙ্গে তুলনা হয় না কোন কুকুরের।
বিরাটদেহী জমকালো কুকুর বাঘা। চোখ দুটো ক্ষুদে কিন্তু অত্যন্ত তীব্র, যেন ছোট ছোট দুটি আগুনের বল। দাঁতগুলো লম্বা তীক্ষ্ণ ধারালো অস্ত্রের মত। বাঘাকে দেখলে যে কোন সাহসী ব্যক্তির হৃদকম্প হবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। বনহুরের পায়ের কাছে দু’পায়ের মধ্যে মাথা রেখে বসেছিল বাঘা।
বনহুর ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলো আর মাঝে মাঝে নাম ধরে ডাকছিল ওকে। কখনও বা শিষ দিচ্ছিলো, তখন বাঘা মুখ তুলে লেজ নাড়ছিল একটু একটু করে।
এমন সময় আশা এলো, সঙ্গে সঙ্গে বাঘা উঠে দাঁড়িয়ে ভীষণ দৃষ্টি নিয়ে তাকালো আশার দিকে।
আশা ভয় পেয়ে গেল, তাড়াতাড়ি বেরিয়ে যাবার জন্য পা বাড়াতেই বললো বনহুর যেও না আশা, বাঘা তোমাকে কিছু বলবে না।
আশা থমকে দাঁড়িয়ে তাকালো বাঘার দিকে।
বাঘার চোখ দুটো ভয়ঙ্করভাবে জ্বলছে, যেন দুটি আগুনের গোলক।
বনহুর ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বললো– বাঘা, ও আমাদের লোক। বস, তুই বস যা, এক্ষুণি তোর খাবার আসবে।
আশা ততক্ষণে বনহুরের পাশে দাঁড়িয়েছে।
বনহুর উঠে দাঁড়িয়েছিল বাঘার সঙ্গে সঙ্গেই, সে মনে করেছিল হঠাৎ যদি বাঘা আশাকে আক্রমণ করে বসে তাহলে রক্ষা নেই। বাঘার কবল থেকে আশাকে উদ্ধার করা কঠিন হবে কিন্তু বাঘা আশাকে হটাৎ আক্রমণ না করে তাকালো বনহুরের দিকে। আদেশ পেলেই সে ঝাঁপিয়ে পড়বে এমনি তার মনোভাব।
বনহুর যখন বাঘাকে শান্তকণ্ঠে বসতে বললো তখন সে না বসে পারল না।
আশা অবাক হয়ে দেখছে, সে ঝড়ো হাওয়ার মধ্যে মধ্যে অদ্ভুত যন্ত্রের কাঁচে দেখেছিল এক অদ্ভুত জীব– সে এই বাঘা। অন্যান্য কুকুরের সঙ্গে এর কোন মিল খুঁজে পাওয়া যায় না–মুখটা থেবড়ো চোখ দুটো ক্ষুদে, চোয়ালের দুপাশে কালো চোয়ালের ফাঁক দিয়ে সূতীক্ষ্ণ দাঁতগুলো বেরিয়ে আছে দুপাশে মাঝখানে লকলকে জিভখানা।
