আশাকে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বললো বনহুর– এখানে এসেছে।
হাঁ, এলাম, কি করছো তুমি?
হিন্দল পুলিশ বাহিনী আর শিকারী কুকুরগুলো আমার সন্ধান করে ফিরছিল, তাই তাদের কিছু শায়েস্তা করা প্রয়োজন মনে করছি।
আমি জানতে চাই কিভাবে তুমি শত শত মাইল দূর থেকে তাদের শায়েস্তা করবে?
জানতে চাও আশা?
হাঁ।
বেশ, তাহলে এসো আমার পাশে।
বনহুর একটি উঁচু জায়গায় দাঁড়িয়ে মেশিন চালাচ্ছে। আশা উঠে এলো তার পাশে।
বনহুর বললো– এই যন্ত্রের কাছে দৃষ্টি ফেলো আশা, তাহলেই দেখতে পারবে সবকিছু।
আশা দৃষ্টি ফেললো যন্ত্রের কাঁচে, বিস্ময়ে স্তব্ধ হলো সে দেখলো অন্ধকারে ভীষণ ঝড় ও বৃষ্টির মধ্যে এলোপাতাড়িভাবে দৌড়াদৌড়ি করছে কতগুলো লোক এবং তাদের সঙ্গে দৌড়াচ্ছে কতগুলো ভীষণ চেহারার কুকুর। আশা পরিষ্কার সবকিছু দেখতে পাচ্ছে, বললো এবার সে– আচ্ছা আকাশে তো মেঘ নেই, তবে এমন ঝড়বৃষ্টি হচ্ছে কেন? আশ্চর্য ব্যাপার দেখছি—
বনহুর বললো–আশ্চর্য নয়, একটু চিন্তা করলেই বুঝতে পারবে। এই যে যন্ত্রটা দেখছো, এটা ঝড়বৃষ্টি আর তুফানের সৃষ্টিকর্তা। আর এই যে পাশে যে সুইচটা দেখছো, এটা টিপলে একটি রশ্মি বেরিয়ে আসবে– অতি ভয়ঙ্কর সে রশ্মি।
সে রশিতে কি কাজ হয়?
তুমি দেখতে চাও? যদি বলো আমি সেই আলোকরশ্মির সুইচ অন করে ঐ পুলিশ বাহিনী আর তাদের শিকারী কুকুরগুলোকে এক্ষুণি ভস্মে পরিণত করতে পারি।
না না, তা হয় না, এতগুলো প্রাণীকে তুমি এভাবে ধ্বংস করতে পার না বনহুর।
বনহুর হেসে বললো– প্রয়োজন হলে হয়তো ঐ আলোক রশ্মি মেশিন আমাকে ব্যবহার করতে হবে। তবে যতক্ষণ আমি নিজকে সংযত রাখতে পারবে ততক্ষণ ঐ সুইচে চাপ দেব না।
বনহুরের কথাগুলো মনোযোগ সহকারে শুনছিল আশা। সত্যি এমন বিস্ময়কর আলোকরশ্মি সম্বন্ধে সে কোনদিন শোনোনি। আরও সে কোনদিন দেখেনি মেশিনের দ্বারা প্রচণ্ড ঝড়–বৃষ্টি সৃষ্টি করা। আশা পুনরায় দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো মেশিনের মধ্যে যন্ত্রটার আয়নায়। আশা দেখতে পেল হিন্দল পুলিশ বাহিনী ভিজে নেড়কে বাঘের মত লুটোপুটি খেয়ে ছুটছে। তার সঙ্গে ছুটছে। কুকুরগুলো।
বনহুর বললো– ওরা প্রায় বনাঞ্চল পার হয়ে গেছে, আর কিছুটা এগুলেই রেহাই পাবে–
আশা বলে উঠলো একটা ভীষণ আকার জন্তু দেখতে পাচ্ছি, জন্তুটা হিন্দল পুলিশ বাহিনীর কুকুরগুলোকে তাড়া করে চলেছে– দেখ দেখ বনহুর, জন্তুটা একটা কুকুরকে ঘায়েল করে ফেললল, মেরে ফেললো একেবারে।
বনহুর আশার মুখের কাছে মুখ নিয়ে জন্তুটার কাছে দৃষ্টি ফেললো, তারপর হেসে বললো– ওটা জন্তু বটে তবে অন্য কোন জন্তু নয়– ওটা কুকুর এবং ওরই নাম বাঘা।
বাঘা এসে গেছে তাহলে?
হাঁ, বাঘা জম্বু ঘাটিতেই ছিল, তাই হিন্দল সুড়ঙ্গপথে দ্রুত আনা সম্ভব হয়েছে। বাঘা বড় দুঃসাহসী এবং শক্তিশালী, বাঘাকে আমি কোথায় পেয়েছি একদিন বলবো তোমাকে।
আশার দৃষ্টি তখনও সেই যন্ত্রের আয়নায় সীমাবদ্ধ রয়েছে। অবাক হয়েছে আশা বনহুরের অদ্ভুত যন্ত্রের কারসাজি দেখে। মেশিনের সাহায্যে এমনভাবে ঝড়বৃষ্টি হতে পারে, এ যেন কল্পনার বাইরে।
আশা বললো– হিন্দল পুলিশ বাহিনী চরমভাবে নাজেহাল রয়েছে, তার সঙ্গে কুকুরগুলোও। এবার তুমি তোমার অদ্ভুত মেশিন অফ করে দাও বনহুর।
তাহলে তুমি খুশি হও?
ওরা যেভাবে শায়েস্তা হয়েছে তাতে আর কোনদিন এ মুখো হবে না। কিন্তু তোমার বাঘাকে ফেরাবে কি করে?
বাঘা ঠিক এসে যাবে। কথাটা বলে বনহুর তার ঝড়বৃষ্টির মেশিনের সুইচ টিপে ধরলো, সঙ্গে সঙ্গে থেমে গেল ঝড় বৃষ্টি–তুফান।
বনহুর নেমে এলো মেশিনের পাশ থেকে নিচে। তার চোখ–মুখ দেখে মনে হচ্ছে ঐ মুহূর্তে সে অনেকটা শান্ত হয়ে এসেছে।
ঝড়বৃষ্টি–দুর্যোগ মেশিন অফ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ছুটে এলো রঘু আর রামসিং।
উভয়ে এসে কুর্ণিশ জানিয়ে দাঁড়ালো।
বললো রামসিং সর্দার, মেশিন অফ করে দিয়ে ভাল করলেন কি?
রঘু বললো– সর্দার, হিন্দল পুলিশ বাহিনী আর শিকারী কুকুরগুলো এখনও বনভূমির বাইরে বেরিয়ে যায়নি, তারা আবার এগুতে পারে।
বনহুর নিশ্চিন্ত মনে সিগারেটে অগ্নিসংযোগ করে বললো– তারা আজ রাতে আর এগুতে সক্ষম হবে না রঘু, যদি এগোয় তবে তখন দেখা যাবে। আজ বাঘাকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা কর।
কুর্ণিশ জানিয়ে বেরিয়ে গেল রামসিং আর রঘু।
*
হিন্দল পুলিশ বাহিনী ভীষণভাবে নাকানি চুবানি খেয়ে ফিরে এলো হিন্দল জঙ্গল থেকে। শিকারী কুকুরগুলোর অবস্থাও কাহিল হয়ে পড়েছে। সবাই ভিজে নেকড়ে বাঘের মত অবস্থা।
শিকারী কুকুরগুলোর কয়েকটি জীবন হারিয়েছে। শক্তিশালী বাঘার কবল থেকে তারা নিস্তার পায়নি। বাঘার কাছে ওরা একেবারে ভিজে বিড়ালের মত অবস্থা হয়ে পড়েছিল।
হিন্দল পুলিশ প্রধান এবং মিঃ হিংহুর আলোচনা চলছিল। অফিসরুমে আরও অনেক পুলিশ অফিসার বসে আছেন। সবার চোখেমুখেই চিন্তিত ভাব ফুটে উঠেছে।
গত ঘটনা তাদেরকে অত্যন্ত ভাবিয়ে তুলেছে। জীবনে তারা এমনভাবে নাকানি চুবানি খাননি কোনদিন।
বললো– হিংহু– স্যার, হঠাৎ এমন ঝড়বৃষ্টি আসবে, এ যেন কল্পনার বাইরে। সম্পূর্ণ আকাশ স্বচ্ছ ছিল, আকাশে ছিল অগণিত তারকা। এমন কি আকাশে একখণ্ড মেঘও ছিল না।
হিন্দল পুলিশ প্রধান বললেন– বিস্ময়কর ঘটনা বটে। আপনি কি বলতে চান কালকের ঝড়বৃষ্টির সঙ্গে প্রকৃতির কোন যোগাযোগ ছিল না?
