রঘুনাথ তখন থ’ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
বনহুর হাসি থামিয়ে বললো–রঘু, বাঘা কোথায় আছে?
কান্দাই আস্তানা থেকে জম্বু নিয়ে আসা হয়েছে। তাকে আপনার নির্দেশমতই একটি আধো অন্ধকার কক্ষে রাখা হয় এবং তাকে শুধু টাটকা মাংস খেতে দেয়া হয়।
হাঁ, ঠিকমতই কাজ করেছ তোমরা।
সর্দার, শুধু আপনি ছাড়া বাঘা কাউকে সহ্য করতে পারে না। আপনি তাকে এনেছিলেন, তাই সে আপনার অনুগত দাস হয়েই আছে–
রঘুর কথা শুনে হাসলো বনহুর, তারপর বললো– তুমি চলে যাও, আজই বাঘাকে নিয়ে এসো। সাবধানে নিয়ে আসবে যেন কেউ টের না পায়। জম্বু থেকে যে সুড়ঙ্গপথ চলে এসেছে, সে পথেই বাঘাকে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করবে।
আচ্ছা সর্দার।
বেরিয়ে গেল রঘু।
আশা বললো– বাঘা কে এবং কি সে মানুষ না জানোয়ার?
বাঘার পরিচয় জানতে চাও?
হাঁ বনহুর।
বাঘা কুকুর। তাকে আমি পেয়েছিলাম শত্রুর কাছ থেকে। অসীম শক্তিশালী এই কুকুরটি এবং তার বুদ্ধিও আছে প্রচুর। আমার বিশ্বাস হিন্দল পুলিশ বাহিনীর বুলডগগুলোকে বাঘা একাই কাবু করে ছাড়বে।
এখানে যখন আশা আর বনহুরের কথা হচ্ছিলো তখন হিন্দল জঙ্গলে হিন্দল পুলিশ বাহিনী আর তাদের শিকারী কুকুর মিলে বনহুরের অশ্বের পদচিহ্ন লক্ষ্য করে এগুচ্ছে। পুলিশ বাহিনীর হাতে আগ্নেয়াস্ত্র আর শিকারী কুকুরগুলোর গলায় চামড়ার বেল্ট।
ভীষণ চেহারার কুকুরগুলো মাটি শুঁকে এঁকে অগ্রসর হচ্ছিল। পুলিশ বাহিনী কুকুরগুলোকে অনুসরণ করে চলেছে।
ওগুলো যেন কুকুর নয়, এক একটা হিংস্র ভয়ঙ্কর জীব। ক্ষুদে ক্ষুদে চোখগুলোতে শ্যেন দৃষ্টি, লকলক করছে জিভ তাদের। সূতীক্ষ্ণ দাঁতগুলো জিভের ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে, যেন এক একটি ধারালো অস্ত্র।
ভীষণ ভয়াল কুকুরগুলোর সম্মুখে শত্রু এলে তাদের আর রক্ষা নেই, মাংস ছিঁড়ে নাড়িভুড়ি বের করে খাবে।
সমস্ত দিন ধরে হিন্দল পুলিশ বাহিনী চষে ফিরলো হিন্দলের নির্জন বনভূমি। শিকারী কুকুরগুলোও হিমসিম খেয়ে গেল যেন, ওরা অবসন্ন হয়ে পড়ল এক সময়।
হিন্দল পুলিশ বাহিনী যখন সন্ধ্যার অন্ধকারে ফিরে চললো শহর অভিমুখে, তখন ভীষণ ঝড়বৃষ্টি শুরু হলো।
পুলিশ বাহিনীর সঙ্গে দিশেহারা হয়ে ছিল শিকারী কুকুরগুলো।
ঝড়ের মধ্যে ভীষণ অন্ধকারে আচ্ছন্ন হলো বনভূমি। কেউ কাউকে দেখতে পাচ্ছে না, রাশি, রাশি ধূলোবালি ছড়িয়ে পড়ছে তাদের চোখেমুখে।
ও হাতড়ে হাতড়ে পথ চলতে লাগল।
ঠিক ঐ মুহূর্তে হিন্দল পুলিশ বাহিনী শুনতে পেল একটা ভীষণ গর্জন, যেন মেঘ ডাকার শব্দ হচ্ছে।
হিন্দল পুলিশ বাহিনী প্রধান মিঃ হিংহু চমকে উঠলেন সে শব্দে, বললেন– এ শব্দ মেঘের গর্জন নয়, হিংস্র জন্তুর গলা আওয়াজ।
বিশেষ করে শিকারী কুকুরগুলো কেমন যেন শব্দ করে পিছু দৌড়াতে শুরু করলো।
মিঃ হিংহু পুলিশ বাহিনীকে লক্ষ্য করে বললেন আমাদের কুকুরগুলো অত্যন্ত ভয় পেয়ে গেছে।
একজন পুলিশ অফিসার বললেন– স্যার, আমরা বহু ঝড়বৃষ্টি অতিক্রম করে কাজ করেছি, কোনদিন শিকারী কুকুরগুলোকে এমনভাবে ভীতু হয়ে পিছু হটতে দেখিনি।
ঝড়ের বেগে কথাগুলো টুকর টুকর হয়ে গেল। কে কোন্দিকে ছুটছে তার দিশা নেই।
মিঃ হিংহু বললেন– এ ঝড় প্রাকৃতিক ঝড় নয়।
আশ্চর্য হলেন পুলিশ অফিসার মিঃ নিশা, ছুটতে ছুটতে তিনি বললেন– এ ঝড় প্রাকৃতিক নয়, এ কথা কে বললো স্যার?
আমি বলছি। বললেন মিঃ হিংহু।
চোখেমুখে এসে পড়ছে ঝড়ের ঝাপটা। শুকনো লতাগুল আর আগাছা এসে পথ রোধ করে ফেলছে ওদের।
গাছপালা ভেঙে পড়ছে ঝড়ের মুখে, সেকি ভীষণ কাণ্ড। এমন ঝড় তারা কোনদিন দেখেনি।
মিঃ হিংহু তাকালেন আকাশের দিকে, বিস্ময় জাগলো তার মনে, কারণ এমন ঝড়বৃষ্টির মধ্যেও আকাশে তারকারাজি চক চক করছে। আকাশ পরিষ্কার বলে মনে হচ্ছে।
হিন্দল পুলিশ বাহিনীর বিস্ময় জাগছে– একি কাণ্ড, হঠাৎ এমন প্রাকৃতিক দুর্যোগ শুরু হলো কেমন করে। আকাশে মেঘ জমেনি বা তেমন কোন ঝড় হাওয়াও দেখা যায়নি, হঠাৎ ঝড় এবং সেই সঙ্গে প্রবল বৃষ্টিপাত।
এমন ভীষণ ঝড়ো হাওয়ায় ছুটতে ছুটতে হাঁপিয়ে পড়ল সবাই।
সে অদ্ভুত গর্জনের শব্দ আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে।
গর্জন যতই নিকটবর্তী হচ্ছে ততই কুকুরগুলো ছত্রভঙ্গ হয়ে এলোপাতাড়ি দৌড়াচ্ছে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই হিন্দল পুলিশ বাহিনী ক্লান্ত হয়ে মাটিতে হামাগুড়ি দিয়ে বসে পড়ল।
এখানে যখন হিন্দল পুলিশ বাহিনী সামনে এগুনোর জন্য একেবারে মরিয়া হয়ে উঠেছে, তখন বনহুরের হিন্দল আস্তানার ভূগর্ভে একটি গহ্বরে বিরাট একটি মেশিনের সম্মুখে দাঁড়িয়ে আছে বনহুর। সুইচ অন করে মেশিনের চাকা ঘুরাচ্ছে বনহুর, সম্মুখে একটি যন্ত্রের দিকে তার দৃষ্টি, মুখমণ্ডল কঠিন।
আশা এসে দাঁড়ালো তার পাশে।
বললো আশা— কি করছো বনহুর
কোনো জবাব দিল না সে আশার প্রশ্নের। আশা বুঝতে পারল বনহুর অত্যন্ত ব্যস্ত। হয়তো বা আশার কথা তার কানেই পৌঁছলো না।
আশা নির্বাক দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে আছে বনহুরের দিকে, ওর মুখখানায় ফুটে উঠেছে বলিষ্ঠতার ছাপ।
ভূগর্ভে লাল বাল্ব জ্বলছিল।
বনহুরের মুখে লাল আলোর আভা এসে পড়ায় ওকে আরও সুন্দর দেখাচ্ছে। আশা দৃষ্টি ফিরিয়ে নিতে পারল না।
বনহুর কিছুক্ষণ একটানা মেশিন চালালো, তারপর ফিরে তাকালো আশার দিকে।
