হাঁ নিয়েছিলাম, আর বিলিয়ে দিয়েছিলাম তোমারই দুঃস্থ প্রতিবেশীদের মধ্যে।
তুমি–তুমিই বড় সাহেবকে হত্যা করেছ?
হাঁ, আমি তাকে হত্যা করে আমার বোন গোলাপীকে তার পাপ বাসনা থেকে উদ্ধার করেছিলাম।
দাঁতে দাঁত পিষে বলে ইকরাম আলী–তুমি–তুমি আমার ডান হাতখানা নষ্ট করে দিয়েছো?
শুধু তোমার ডান হাতখানায়, তোমার চোখ দুটোও আমি উপড়ে নিয়েছি, কারণ যে হাত দিয়ে তুমি পরের অন্যায় করেছ, যে চোখ দিয়ে তুমি দুঃস্থ অসহায় মানুষের সর্বনাশ করেছ সেই অঙ্গগুলো তোমার দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে তোমাকে আমি পাপমুক্ত করেছি। ইকরাম আলী সাহেব, আপনার ধনসম্পদ সবই পাপের উপার্জিত ছিল, তাই অগ্নিশিখা আপনার ধনসম্পদ গ্রাস করেছে। এখন আপনি সম্পূর্ণ পাপমুক্ত হয়েছেন। স্ত্রী, পুত্র, পুত্রবধু এবং আপনার দুঃস্থ প্রতিবেশীদের নিয়ে সুখে সংসার করুন। অনুভব করুন দুঃস্থ জনগণের অবস্থা কেমন! বনহুর শেষ কথাগুলো বলার সময় ইকরাম আলীকে আপনি বলে সম্বোধন করলো।
ইকরাম আলী নিশ্চুপ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এবার তার রাগ ক্রমে শিথিল হয়ে এলো, হয়তো তার পূর্বের অপকর্মের জন্যে অনুশোচনা জাগলো মনে কিছু বলতে গেলে ইকরাম আলী কিন্তু পারল না। কষ্ঠ বাষ্পরুদ্ধ হয়ে এলো। চোখ দুটো ভিজে উঠলো, গণ্ড বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। বললো সে–আমার কর্মের জন্য আমি অনুতপ্ত, দুঃখিত। মা বৌমা, আমাকে তুমি মাফ করে দিয়েছে? বলো, বলো মা?
গোলাপী দু’হাত বাড়িয়ে ধরে ফেলে ইকরাম আলীকে। তারপর ফিরে তাকিয়ে দেখে মালেক ভাই কখন উধাও হয়েছে, আশেপাশে কোথাও তাকে দেখা যায় না।
*
বানরী কন্যা আজ মানুষ্য কন্যা শাপলা বনে গেছে। আজ তাকে দেখলে কেউ বলতেই পারবে না সে একদিন সম্পূর্ণ উলঙ্গ অবস্থায় চার পায়ে ভর করে হাটতো। কথা সে বলতে পারত না, বানরের মতই অদ্ভুত ধরনের শব্দ করত। আজ শাপলা সুন্দর কথা বলতে শিখেছে। ডাগর ডাগর দুটি চোখে অপূর্ব মায়াভরা চাহনি।
সব সময় শাপলা আশার কাছে কাছে থকে! আশাকে ও বোন বলে ডাকে, ওর কাছেই ঘুমায় শাপলা এখন।
আশা ওকে শিখিয়েছে কে ওর বাবা কে ওর মা ছিল। বানরী ওকে কেমনভাবে মানুষ করেছে, সব রাতে শুয়ে শুয়ে বলতে আশা–বনহুর তাকে উদ্ধার করেছে, সে না হলে তাকে আজ আশা মানুষ রূপে গড়ে তুলতে পারত না।
একদিন বনহুর শাপলার বাবাকে নিয়ে এলো সঙ্গে করে, প্রথমে শাপলা তাকে কিছুতেই বাবা বলে মেনে নিতে চাইলো না, বনহুর নিজে অনেক করে বোঝালো ওকে। আশাও বোঝালো, তার মার মৃত্যু হবার পর তাকে বুকে করে বাঁচতে চেয়েছিল বৃদ্ধ কিন্তু বানরী তাকে চুরি করে নিয়ে যাওয়ায় তার বৃদ্ধ বাবা কেঁদে কেঁদে পাগল বনে গিয়েছে।
শাপলা এক সময় বুঝলো এবং বাবা বলে বৃদ্ধের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ল।
বনহুর আর আশার মন ভরে উঠলো আনন্দে। বানরী কন্যা শাপলা আজ তার পিতাকে আনন্দে গ্রহণ করতে পেরেছে বলে খুশি হলো তারা ভীষণ।
বনহুর বললো এক সময়—আশা, তুমি আমার কাছে কি চাও বলো? যা চাইবে তা আমি তোমাকে দেব। তুমি একটা অস্বাভাবিক মেয়েকে স্বাভাবিক করেছ, আজ আমি তোমার অতুলনীয় গুণে মুগ্ধ হয়েছি।
আশা নীরবে দাঁড়িয়ে ছিল, বনহুরের কথাগুলো তার হৃদয় স্পর্শ করলো। চোখ তুলে তাকালো আশা, কোন কথা সে বললো না।
বনহুর সরে এলো আরও কাছে, বললো–কথা বলছো না কেন আশা?
কি বলবো বলো?
তুমি কি চাও আমার কাছে বলো?
এ কথা আরও একবার তুমি বলেছিলে।
হাঁ কিন্তু তুমি কিছুই চাওনি।
কিইবা চাইবো তোমার কাছে! তোমার ভালবাসাই আমার সবচেয়ে বড় সম্পদ।
আশা!
বনহুর, এবার আমি বিদায় নিতে চাই?
চলে যাবে আশা?
হাঁ, ছুটি দাও আমাকে।
বেশ, এবার তোমার ছুটি।
তুমি আমাকে রায়হান পৌঁছে দেবে না?
যদি বলি দেব।
হাজরার কাজ তোমার শেষ হয়েছে?
হয়েছে।
তোমার সেই গোলাপীর কি করলে?
তাকে শ্বশুর–শাশুড়ির কাছে পৌঁছে দিয়েছি।
বেশ করেছ।
বৃদ্ধ শ্বশুর আর বৃদ্ধা শাশুড়ির সেবাযত্ন করে গোলাপী জীবন কাটিয়ে দেবে।
স্বামীর সেবা ওর ভাগ্যে হলো না। বললো আশা।
বনহুর একটা সিগারেট ধরালো, তারপর একমুখ ধোয়া ছুঁড়ে বললো শুনেছি হাবলু নাকি এখন পূর্বের মত পাগলামি করে না। সে অনেকটা সভ্য হয়েছে, গোলাপী যদি তাকে গ্রহণ করে মন্দ হবে না। সত্যি আশা, কি বলবো তোমাকে, বেচারী গোলাপীর জন্য বড় মায়া হয়। খোদা ওর মঙ্গল করুন। এই কামনা করি।
আশার মুখখানা করুণ হয়ে উঠলো, সে বললো গোলাপীর জন্য আমারও মায়া হয়। পৃথিবীতে কত অসহায় নারী আছে যাদের অদৃষ্ট এমনি মর্মান্তিক।
এর জন্য দায়ী আমাদের সমাজব্যবস্থা। বনহুর কথাটা বলে উঠে দাঁড়ায়।
এমন সময় রঘুনাথ প্রবেশ করে কুর্ণিশ জানায়।
বনহুর বলে–কি সংবাদ রঘু?
হিন্দল পুলিশ বাহিনী জানতে পেরেছে আপনি হিন্দল এসেছেন। তাজের খুরের আওয়াজ তারা শুনতে পেয়েছি শিকারী কুকুর লেলিয়ে দিয়েছে।
হাঁ, সর্দার।
হিন্দল পর্বত এলাকা এবং বনাঞ্চল তন্ন তন্ন করে সন্ধান করে চলেছে।
তাজের খুরের চিহ্ন ধরে কুকুরগুলো এগিয়ে আসছে, পিছনে এগুচ্ছে হিন্দল পুলিশ বাহিনী।
বনহুর হাতের অর্ধদগ্ধ সিগারেট দূরে নিক্ষেপ করে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল।
আশা বিস্ময়ভরা দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়েছিল বনহুরের মুখের দিকে। বনহুরকে হাসতে দেখে আশার মুখেও হাসির আভাস ফুটে উঠলো, সে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ে তাকালো রঘুর দিকে।
