গোলাপী একটা দীর্ঘশ্বাস গোপনে চেপে বললো–কিছু না।
মিথ্যা কথা বলছো–কিছু ভাবছো তুমি।
মালেক ভাই!
বলো?
একটা কথা বলবো?
বলো।
হাজরায় গেলে আমার সেই বন্ধু এসে যদি ফিরে যায়। আমি যে তাকে ছাড়া বাঁচব না।
গোলাপী, তোমার সেইবন্ধু আমারও বন্ধু বটে। তাই আমি জানি সে আর ঐ গ্রামে যাবে না।
কেন যাবে না সে?
সে জানতে পারবে তুমি নেই সেখানে তাই।
জানতে পারবে?
হাঁ, পারবো।
তবে কোথায় তার দেখা পাবো?
তুমি যেখানেই থাকো না কেন, সেখানেই আসবে সে।
সত্যি বলছো মালেক ভাই?
হাঁ, সত্যি।
এতক্ষণে গোলাপীর মুখখানা প্রসন্ন হয়ে উঠলো, সে বললো–তুমি তাকে বলে দিও মালেক ভাই, আমি হাজরায় ফিরে এসেছি।
আচ্ছা বলবো।
একটু থেমে বললো গোলাপী–মালেক ভাই, কবে কখন তার তোমার দেখা হয়েছিল?
ঠিক স্মরণ নেই, তবে দেখা হয়েছিল–আবার হবে।
সত্যি অবার তোমার সঙ্গে দেখা হবে তার?
হবে।
তাকে বলল মালেক ভাই, সে যেন হাজরায় এসে আমার সঙ্গে সঙ্গে দেখা করে যায়।
বেশ, বলবো।
আচ্ছা মালেক ভাই?
বলো?
তার বাড়ি কোথায় তুমি জান? কোথায় থাকে সে আর কোথা থেকে সে আসে যায়, বলতে পার মালেক ভাই?
তা ঠিক জানি না, তুমি তাকে যেমন চেনো আমিও তাকে ঠিক তেমনি চিনি, তার বেশি তাকে জানি না।
মালেক ভাই, বড় অদ্ভুত সে–যেমন তার হাসি, তেমনি তার কণ্ঠস্বর, তেমনি তার চোখ দুটো–আমি কিছুতেই তার কথা ভুলতে পারি না। সেদিন যদি ঐ মুহূর্তে সে গিয়ে হাজির না হতো তাহলে বড় সাহেব আমার সবকিছু ছিনিয়ে নিতো, আমি সর্বস্ব হারাতাম। আমি তার কাছে চিরকৃতজ্ঞ মালেক ভাই।
মালেক মিয়া কোন কথা বলে না, সে নীরবে তাকিয়ে থাকে সম্মুখের দিকে।
গরুগাড়ি এগিয়ে চলেছে।
হাজরা গ্রামে পৌঁছে গাড়ি ছেড়ে দিল মালেক মিয়া। গোলাপীকে বললো–চলো বোন, এবার হেঁটেই চলে।
গোলাপী তাতে কোন আপত্তি করলো না।
চলতে চলতে বললো গোলাপী–মালেক ভাই, আমার শ্বশুর শাশুড়ি জানে ডাকাত আমাকে নিয়ে গেছে, আমি ঘরের বার হয়েছি–তারা আমাকে ঘরে তুলে নেবে তো?
সে ভাবনা তোমাকে করতে হবে না। তোমার শ্বশুর–শাশুড়ি তোমাকে পেলে ধন্য হবে বোন, বুঝলে? তবে তুমি যদি তাদের ক্ষমা কর….
এ তুমি কি বলছো মালেক ভাই!
হাঁ, এসো আমার সঙ্গে।
মালেক মিয়া আর গোলাপী কিছুক্ষণের মধ্যেই এসে পৌঁছলো ইকরাম আলীর বাড়ির অদূরে। বাড়ির নিকটে পৌঁছতেই গোলাপীর চক্ষুস্থির হলো। বিস্ময়ভরা কণ্ঠে বললো–একি সে বাড়ি কোথায়?
বললো মালেক মিয়া–সব গ্রাস করেছে অন্যায় অনাচারের আগুনের শিখা। আরও সরে এসো, দেখবে আরও কিছু….।
বাড়ির কাছে এগুতেই গোলাপী দেখলো এক অন্ধ বৃদ্ধ লাঠি হাতে ভিক্ষার ঝুলি কাঁধে এগিয়ে আসছে।
গোলাপী ভাল করে লক্ষ্য করতেই অস্ফুট ধ্বনি করে উঠলো–একি, এ যে আমার শ্বশুর!
হাঁ, এই তোমার শ্বশুর ইকরাম আলী….
কিন্তু….
অদৃশ্য দুটি হাতের ইংগিতে সব ওর নিঃশেষ হয়ে গেছে, আজ ও ভিখারি।
মালেক মিয়া আর গোলাপীর কথাগুলো শুনতে পেল অন্ধ ইকরাম আলী সে বললো–কে কে কথা বলে।
মালেক মিয়া বললো–আমি আপনার পুরোন ভূত্য মালেক মিয়া।
লাঠিসহ বাম হাতখানা প্রসারিত করে দেয় ইকরাম আলী–মালেক, বাবা মালেক, তুই এসেছিস আমার দুঃখ দেখতে? কে তোর পাশে কথা বললো আর একজন? যার গলার স্বর আমার মনে অনাবিল শান্তির দোলা জাগালোর কে কে–আমার বৌ মা?
হাঁ মালিক, আপনার সেই বৌমা যাকে একদিন ডাকাত ধরে নিয়ে গিয়েছিল, যাকে আপনি বাড়িতে আশ্রয় দেব না বলে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, সেই গোলাপী।
বৌমা…. এসেছে বৌমা…. ইকরাম আলী সম্মুখে এগুতে লাগল–কোথায় তুমি মা, দেখ আমার দুর্দশা দেখ মা। আজ আমি পথের ফকিরে পরিণত হয়েছি। সব গেছে আমার বাড়ি–ঘর, ধন–সম্পদ সব গেছে–আজ আমি নিঃস্ব অসহায়… মা, মাগো ঐ যে সামনে কুঁড়েঘর দেখছো, এখন ওটাই আমার আশ্রয়স্থল ঐ ঘরে তোমার শাশুড়ি মা আছেন, সেও অসুস্থ। যাও মা তোমার শাশুড়ি মায়ের কাছে যাও। মাফ করে দাও আমাদের সব অপরাধ।
গোলাপী তাকালো তার মালেক ভাইয়ের মুখের দিকে, মালেক মিয়া বললো–গোলাপী, বোন আমার–মানুষ বলে, ক্ষমা সমান গুণ নেই। যাও, ক্ষমা করে দাও তোমার শ্বশুর-শাশুড়িকে।
গোলাপী অন্ধ শ্বশুরের হাত চেপে ধরলো, গণ্ড বেয়ে গড়িয়ে পড়ল তার দু’ফোঁটা অশ্রু।
মালেক মিয়া যখন কথা বলছিল তখন সেস্থানে অপর ব্যক্তি কেউ ছিল না, শুধু ইকরাম আলী আর গোলাপী ছিল।
মালেক মিয়া বললো–ইকরাম আলী, তোমার কর্মফল তুমি ভোগ করেছ। এরপর যদি গোলাপীর উপর কোন, অন্যায় অনাচার হয় তাহলে ক্ষমা নেই তোমার….
মালেক মিয়ার কথা শুনে গোলাপী বিস্ময় নিয়ে তাকালো তার মুখের দিকে, এ কণ্ঠস্বর তো তার মালেক ভাইয়ের নয়–এ যে তার বন্ধুর গলা।
ইকরাম আলীও চমকে উঠে ভীষণভাবে, বলে উঠে সে–কে কে তুমি?
মালেক মিয়া তার মুখ থেকে দাড়িগোঁফ খুলে ফেলে, সঙ্গে সঙ্গে অস্ফুট ধ্বনি করে উঠে গোলাপী–মালেক ভাই তুমি…
হাঁ, আমিই তোমার সেই অজানা অচেনা বন্ধু।
ইকরাম আলী বলে উঠে–ডাকাত। তুমিই ডাকাত?
হাঁ।
তুমিই আমার সর্বনাশ করেছ?
হাঁ। আমার বাড়িতে আমারই চাকর মালেকের বেশে বাস করে আমার বাড়িতে বারবার হানা দিয়েছো।
হাঁ দিয়েছি।
তুমিই মহাজনের নৌকায় হানা দিয়ে তার সর্বস্ব লুটে নিয়েছিলে?
