পথের ধারে একটা জলচৌকি নিয়ে বসে থাকে ইকরাম আলী। কোন পথচারী পথ দিয়ে হেঁটে গেলে ডাকতে থাকে–কে যাও বাবা, একবার শুনে যাও আমার কাছে….
কেউ ডাক শুনে আসে, কেউ অবহেলা করে চলে যায়।
ইকরাম আলী তাদের ডেকে বলে–বাবা, তোরা হাটে যাচ্ছিস বুঝি? আমার কাছে তো পয়সা নেই, যদি মনে করে চার আনা পয়সার তামাক আনতিস তাহলে বড় উপকার হতো। আনি বাবা মনে করে।
হাটুরে পথিক বলতো আনবো কিন্তু একটু সরে গিয়েই বলতো, তামাক না ছাই আনবো। চোখ থাকতে কম জ্বালিয়ে খাওনি।
এমনি করে সবাই চলে যায়, কেউ তার কথা শোনে না বা ফিরে চায় না।
পাগল ছেলে হাবলু কিছু বোঝে না, সে শুধু দিনরাত পথে পথে ঘুরে বেড়ায়। কেউ দিলে খায়, না দিলে উপোস পড়ে, পথের ধারে ঘাসের উপর শুয়ে শুয়ে ঘুমায়।
ইকরাম গৃহিনী সম্পত্তির শোকে পাগলিনীপ্রায় হয়ে পড়েছে। একদিকে স্বামী অন্ধ তারপর ছেলে পাগল, ঘরদোর কিছু নেই। দিনে দিনে ঋণের বোঝা বেড়ে যায়, একদিন জমি–জমা যা ছিল তাও নিলাম হয়ে যায়।
সেদিন অন্ধ ইকরাম আলী ভিক্ষার ঝুলি কাঁধে গ্রামবাসীদের দরজায় দরজায় ভিক্ষার জন্য হাত পেতে বেড়ায়।
বেশিদিন নয়, সামান্য কমাসের মধ্যেই ইকরাম আলীর জীবনে নেমে আসে চরম পরিবর্তন। একদিন যে ছিল গ্রামের মাতব্বর আজ সে পথের ভিখারি! এরই নাম অদৃষ্টের পরিহাস।
*
হঠাৎ চমকে উঠে গোলাপী, ফিরে তাকাতেই চোখ দুটো তার আনন্দে দীপ্ত হয়ে উঠে–মালেক ভাই তুমি!
হাঁ আমি, কিন্তু তুমি এখানে?
সে অনেক কথা–পরে শুনো, এখন বসো দেখি। গোলাপী একটা মাদুর বিছিয়ে দেয় দাওয়ায়।
বৃদ্ধ মালেকের সঙ্গেই উঠানে প্রবেশ করেছিল। বৃদ্ধ বললো–মা গোলাপী, মালেক অনেকদিন পর বাড়ি এসেছে, ওকে ভালমত রান্না করে খেতে দাও। বৃদ্ধ কথাটা বলে বেরিয়ে যায় তার কাজে।
গোলাপী বলে–মালেক ভাই, সেই যে তুমি আসবে বলে চলে গেলে, আর এলে না। জান, তুমি চলে যাবার পর হাজরা গ্রামে কত অঘটন ঘটেছে। কিছু তুমি জান না। জানলে অমন নীরব থাকতে পারত না। গ্রামের যারা ভাল ছেলে তারা আজ কেউ নেই। আমার শ্বশুরের চক্রান্তে তারা আজ জেলে। রাজু ভাই আর শাজাহান ভাইকে ওরা মেরে ফেলেছে….. কষ্ঠ ধরে আসে গোলাপীর।
মালেক একটা দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করে বলে–সব আমি শুনেছি এবং তার প্রতিকারও আমি করেছি।
প্রতিকার তুমি করেছ।
হাঁ তাইতো এতদিন আসতে পারিনি। দেখাও করতে পারিনি তোমার সঙ্গে। রাজু আর শাজাহান বুকের রক্ত দিয়ে সিক্ত করেছে দেশের মাটি! তারা চেয়েছিল অন্যায় রোধ করতে…. তারা বিফল হয়নি–জীবন দিয়ে মানুষকে শিক্ষা দিয়ে অন্যায়কে ধ্বংস করতে হলে জীবন দিতে হয়। আর যারা জেলে আটক আছে, তারা অচিরেই বেরিয়ে আসবে। গোলাপী, আমি বসেছিলাম না, এতদিন আমার সেই ভাইদের জেল থেকে বের করে আনার ব্যবস্থাই করলাম।
সত্যি, মোখলেছুর ভাই আর তার সঙ্গীরা মুক্তি পাবে?
হাঁ, তারা নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছে। গোলাপী তোমাকে একবার নিয়ে যাবো হাজরা গ্রামে।
না না, আমি আর সেই হাজরা গ্রামে ফিরে যেতে চাই না। আমি দেখতে চাই না আমার শ্বশুর শাশুড়ির মুখ….।
একটু হেসে বললো মালেক মিয়া–এখন গেলে আর তারা তোমাকে অবহেলা করবে না। তোমাকে পেলে তারা ধন্য হবে।
বলো কি মালেক ভাই।
হাঁ। যাবে তুমি সেই গ্রামে?
একবার যেতে ইচ্ছে হয়, আবার ভয়ও হয় আমার।
কোনো ভয় নেই, আমি কালই তোমাকে নিয়ে যাবে সেখানে।
আচ্ছা তাই যেও কিন্তু আমি সেখানে থাকবো না বেশিক্ষণ।
পরদিন মালেক মিয়া গোলাপীকে নিয়ে রওনা দিল হাজরা গ্রাম অভিমুখে।
গরুগাড়ি চেপে চলেছে ওরা।
গাড়ির মধ্যে বসেছে গোলাপী আর গাড়ির সম্মুখভাগে গাড়োয়ানের পাশে বসেছে মালেক মিয়া।
যখন গোলাপী আর মালেক মিয়া বৃদ্ধের কাছে বিদায় নিল তখন বৃদ্ধের চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল কতদিন গোলাপী ছিল তার কাছে। নিজ কন্যার মতই বৃদ্ধ ওকে স্নেহ করত, ভালবাসতো। অবশ্য গোলাপীও বৃদ্ধটিকে ভালবেসেছিল, নিজের পিতার মত তাকে ভক্তি করত।
গোলাপী তার বাড়িতে আসার পর কোন অভাব ছিল না। সেই জমকালো পোশাকপরা লোকটা তাকে প্রচুর অর্থ দিয়েছিল যা সে সারাটা জীবন বসে খেলেও ফুরাবে না।
গরিব বৃদ্ধ গোলাপীকে তাই লক্ষ্মী মা বলেই মনে করত, আজ বিদায় মুহূর্তে সে না কেঁদে পারল না। গোলাপীও কেঁদে বুক ভাসিয়ে ফেললো, বড় মায়া বসে গিয়েছিল তারও।
গাড়িতে বসেও মন খারাপ লাগছিল গোলাপীর। এখানে আসার পর সে বেশ সুখেই ছিল, ছিল না কোন গালমন্দ বা মারপিট। যা মনে করত তাই সে করে আনন্দ উপভোগ করত। মাঝে মাঝে আসতো তার সেই অজানা অচেনা বন্ধু। গোলাপী তারই প্রতীক্ষায় প্রহর গুণতে যেন। মাসে একটিবার আসা চাই–ই তার, নাহলে গোলাপী কেঁদে বুক ভাসিয়ে দিত।
হেসে বলতো বন্ধু–পাগলী মেয়ে, আমি কি চিরদিন এমনি করে তোমার পাশে আসতে পারি। যখন দূরে চলে যাবো, অনেক দূরে তখন কেমন করে আসবো, বলো?
বলেছিল গোলাপী–তুমি দুরে চলে যাবে এ কথা আমি ভাবতে পারি না বন্ধু। তোমার মায়া আমাকে বেস্টন করে ফেলেছে। তুমি না এলে আমি মরে যাবো….।
গাড়িতে বসে গোলাপী সে কথাই ভাবছিল। মুখখানা তার গম্ভীর থমথমে, চোখ দুটো কেমন ছলছল করছিল।
মালেক মিয়া বললো–বোন, কি ভাবছো?
