গ্রামবাসীদের অনেকেই যেতো ভয়ে আর কিছুসংখ্যক যেতো স্বার্থ নিয়ে।
হাতখানা তার দেহ থেকে বিছিন্ন করার পর দু’দিন সম্পূর্ণ সংজ্ঞাহীন রইলো ইকরাম আলী।
তৃতীয় দিনে জ্ঞান ফিরে এলো তার।
রাত তখন গভীর।
প্রথম কিছু বুঝতে পারল না, বুঝলো যখন ভালভাবে সংজ্ঞা হলো, দেখলো ডান হাতখানা তার নেই। চিৎকার করে ডাকলো–নার্স…. নার্স…..
ছুটে এলো নার্স, সে পাশেই কোথাও ছিল।
ইকরাম আলী ক্রুদ্ধকণ্ঠে বললো–আমার ডান হাত কি হলো?
নার্স বললো–ডাক্তার পরীক্ষা করে আপনার হাতখানা বাদ দিয়েছেন।
কেন আমার হাতখানা বাদ দিল তিনি? আমি সুস্থ হয়ে ডাক্তারের দেহ থেকে তার মাথাখানাকে বাদ দেব।
ইকরাম আলীর রাগ দেখে নার্সগণ ভয় পেয়ে গেল, তারা বহু রোগী দেখেছে কিন্তু এমন বদরাগী রোগী তারা দেখেনি।
ডাক্তার সব শুনে হাসলো মাত্র।
একদিন ইকরাম আলী সুস্থ হয়ে ফিরে এলো হাজরা গ্রামে। পূর্বের চেয়ে আরও জঘন্য মনোবৃত্তি হলো তার। কি করে পরের ধন–সম্পদ নিজের করে নেবে, সদা হলো তার এই চিন্তা।
হবু মোল্লা এখন সব সময় তার ডান হাতের কাজ করে।
ইকরাম আলী যখন গ্রামের মধ্যে যায় তখন হবু মোল্লা থাকে তার পিছনে পিছনে।
আবার চলে ইকরাম আলীর শয়তানী বরং পূর্বের চেয়ে দশ গুণ বেশি হয় তার অনাচার অবিচার।
বড় সাহেব মারা পড়ার পর বেশ কিছুদিন শহর থেকে গন্যমান্য ব্যক্তির আনাগোনা কমে যায়, তারা কোন কাজে এলেও এখন আর রাত্রি বাস করে না ইকরাম আলীর বাড়িতে, কাজ সেরে ঐদিনই ফিরে যায় শহরে।
বেশ কিছুদিন কেটে গেল।
আবার শুরু হয়েছে ইকরাম আলীর শোষণের পালা। আসছে প্রচুর টাকা, আসছে সম্পদ। ইকরাম আলী স্ত্রীকে বলে–একখানা হাত না হয় গেছে তাতে কি আসে যায়! এখন আমার ধন–সম্পদ আরও বাড়ছে। লোকজন এখন আরও বেশি ভয়, সম্মান করে।
ইকরাম গৃহিণী তবু মাঝে মাঝে পুত্রবধুর কথা স্মরণ করে কিন্তু ইকরাম আলী ভুলেও গোলাপী নামটা মুখে আনে না কোনদিন। গোলাপী গেছে তার জন্য কোন আফসোস নেই তার, তবে কোন কোন সময় ভাবে যে টোপ ফেলে সাহেব–সুহাবদের সে হাত করত, সেই টোপ তার হাত ফসকে চলে গেছে।
একদিন গভীর রাতে কোন এক চোরাকারবারীর সঙ্গে কথাবার্তা শেষ করে ফিরছিল ইকরাম আলী হঠাৎ তার পথ রোধ করে দাঁড়ালো সেই জমকালো মূর্তি যে বড় সাহেবকে হত্যা করেছিল, আহত করেছিল ইকরাম আলীকে।
অশ্বপৃষ্ঠে জমকালো মূর্তিটিকে লক্ষ্য করে শিউরে উঠলো ইকরাম আলী। সঙ্গে তার দ্বিতীয় প্রাণী কেউ ছিল না, একাই ছড়ি হাতে ফিরছিল বাড়ি অভিমুখে।
জমকালো মূর্তি ইকরাম আলীর সম্মুখে নেমে দাঁড়ালো, দক্ষিণ হাতে তার রিভলভার। অন্ধকারে রিভলভার চকচক করে উঠলো।
ইকরাম আলীর মুখখানা কালো হয়ে উঠলো প্রথমে, তারপর রক্ত শূন্য হয়ে ফ্যাকাশে আকার ধারণ করলো। বললো ইকরাম আলী, আবার তুমি এসেছো?
বললো জমকালো মূর্তি–হাঁ।
ইকরাম আলী বললো–কি চাও? আমার হাতখানা তো তুমি নিয়েছে আর নিয়েছে আমার ছেলের বৌকে।
একটু হাসির শব্দ হলো, বললো জমকালো মূর্তি তোমার হাত নিয়েছি–এবার তোমার চোখ দুটো উপড়ে নেবো বলে এসেছি।
চোখ দুটো উপড়ে নেবে, বলো কি?
হাঁ, ভেবেছিলাম দক্ষিণ হাত হারিয়ে তুমি কিছুটা সৎ হবে কিন্তু তা তুমি হওনি, বরং তোমার অসৎ ব্যবসা আরও জোরদার হয়েছে, তা ছাড়াও তুমি তোমার সন্তান সমতুল্য কয়েকটি ছেলের প্রতি যে অন্যায় করেছ তার ক্ষমা নেই–হত্যা করেছ দু’জনকে আর বাকি সবাইকে দুষ্কৃতিকারী বলে জেলে পাঠিয়েছে।
তুমি, তুমিই তাহলে ঐ ডাকাত দলের সর্দার?
সর্দার নই, তাদের হিতাকাঙ্খি বন্ধু আমি।
আর?
আর তোমার আজরাইল, যাকে বলে যমদূত।
কে? কে তুমি?
হয়তো আমার নাম তুমি শুনে থাকবে–দস্যু বনহুর। দস্যু বনহুর বলেই সবাই আমাকে ডাকে।
তুমিই সেই দস্যু বনহুর?
হাঁ।
জল্লাদ। তুমি জল্লাদ। জল্লাদ বলেই আমার সর্বনাশ করেছ, আমি তোমাকে পুলিশে ধরিয়ে দেব।
ইকরাম আলীর কথা শেষ হয় না, বনহুর বজ্রমুষ্ঠিতে চেপে ধরে ইকরাম আলীর গলা প্রচণ্ড এক ঘষি বসিয়ে দেয় তার চোয়ালে।
এক ঘুষি খেয়ে সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলে ইকরাম আলী।
তারপর যখন জ্ঞান ফিরে এলো তার তখন সে দু’চোখে আর পৃথিবীর আলো দেখতে পায় না। চোখ দুটো ইকরাম আলীর উপড়ে নিয়েছে দস্যু বনহুর।
অন্ধ ইকরাম আলী যেদিন বাড়ি ফিরে এলো, সেদিন তার বাড়ি বলে কিছু ছিল না। লেলিহান অগ্নিশিখা তার সবকিছু গ্রাস করে ফেলেছিল। অকস্মাৎ একদিন বাড়ির কোন এক চাকরাণীর ল্যাম্প থেকে পাক ঘরে আগুন ধরে যায় সে আগুন ছড়িয়ে পড়ে গোটা বাড়িতে। ইকরাম আলীর সমস্ত বাড়িখানা ভষ্মীভূত হয়ে যায়, গ্রামবাসীরা সেদিন কেউ এগিয়ে আসে না বাড়ির আগুন নেভাতে।
আজ ইকরাম আলী অন্ধ।
হসপিটাল থেকে ফিরে এসে সে আর তার সহকারীদের দেখা পায়নি, তারা এখন আর আসে না তার পাশে তাকে সহানুভূতি জানাতে।
তারা জানে, এখন যে ইকরাম আলীর পাশে আসবে তাকেই কিছু না কিছু সাহায্য করতে হবে, কারণ আজ ইকরাম আলীর কিছু নেই–বাড়ি–ঘর, গরু–বাছুর, ধন–সম্পদ এমনকি এক মুঠো ধানও নেই তার সম্বল।
গ্রামবাসী দু’চারজন ছাড়া সবাই বিমুখ ছিল ইকরাম আলীর উপর, তাই কেউ তার দুর্দিনে এগিয়ে এলো না তাকে সাহায্য করতে। বরং সবাই খুশি হয়েছে নরপশু ইকরাম অলীর দুর্দশা দেখে।
